শিশুরা জন্মের পর থেকেই চারপাশের পরিবেশ, আচরণ এবং পারিবারিক সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করে শিখতে শুরু করে। তাই বড়দের প্রতিটি আচরণ, কথাবার্তা এবং মানসিক অবস্থা শিশুর ব্যক্তিত্ব, চিন্তাভাবনা ও আবেগীয় বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলে। এমন অনেক আচরণ আছে, যা নষ্ট করতে পারে শিশুর মানসিক বিকাশ।
অনেক সময় অভিভাবকরা অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন কিছু আচরণ করেন, যা তাদের কাছে সাধারণ মনে হলেও শিশুর মানসিক জগতে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যের নামে বদনাম বা নেতিবাচক আলোচনা করা
অনেক পরিবারে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, সহকর্মী বা পরিচিতদের নিয়ে নেতিবাচক আলোচনা কিংবা বদনাম করা যেন দৈনন্দিন অভ্যাস। শিশুর সামনে এসব আলোচনা অনেক সময় সাধারণ কথা মনে হলেও বাস্তবে এর প্রভাব অনেক গভীর।
যখন শিশু দেখে বড়রা অন্যের অনুপস্থিতিতে তাদের নিয়ে খারাপ কথা বলছে, তখন সে এটিকে স্বাভাবিক সামাজিক আচরণ হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে। শিশু ধীরে ধীরে মানুষের ভালো দিকের চেয়ে খারাপ দিক খুঁজতে অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারে। এমনকি অন্যের অনুভূতি বোঝার বদলে সমালোচনা করা সহজ মনে হতে থাকে।
শিশুর সামনে মা বা বাবাকে ছোট বা অপমান করা
মা ও বাবা শিশুর কাছে নিরাপত্তা, ভালোবাসা এবং স্থিতিশীলতার প্রতীক। যখন একজন অভিভাবক অন্যজনকে শিশুর সামনে ছোট করেন, অপমান করেন বা নিয়মিত সমালোচনা করেন, তখন শিশুর মানসিক নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মা-বাবার দ্বন্দ্ব বা অপমান তাকে মানসিকভাবে অস্থির করে তোলে। শিশু বুঝতে পারে না, কার পক্ষ নেবে। এতে তার মধ্যে অপরাধবোধ, চাপ এবং বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সে মনে করতে শিখে, সম্পর্ক মানেই ঝগড়া, অসম্মান বা দোষারোপ।
শিশু নিজেকে মা-বাবার যৌথ অংশ হিসেবে দেখে। তাই একজনকে অপমান করা হলে শিশুও পরোক্ষভাবে নিজেকে ছোট মনে করতে পারে।
টাকা, মানসিক চাপ বা জীবন নিয়ে ভয় দেখানো
‘আমাদের টাকা নেই’, ‘এভাবে চললে রাস্তায় বসতে হবে’, ‘জীবন খুব কঠিন’, ‘তোমার জন্যই এত সমস্যা’—এ ধরনের কথা অনেক অভিভাবক মানসিক চাপের মুহূর্তে বলে ফেলেন।
কিন্তু শিশুর মানসিক পরিপক্বতা প্রাপ্তবয়স্কদের মতো নয়। ফলে সে এসব কথাকে বাস্তব সংকট হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।
এতে শিশুর ভেতর অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা তৈরি হয়। শিশু ছোট বয়সেই ভবিষ্যত, নিরাপত্তা ও পরিবার নিয়ে অস্বাভাবিক উদ্বেগে ভুগতে পারে।
শিশু ভাবতে শুরু করতে পারে- ‘আমি হয়তো পরিবারের জন্য বোঝা।’
সে সবসময় ভয় নিয়ে বড় হতে পারে— কিছু হারিয়ে যাবে, সব শেষ হয়ে যাবে, জীবন নিরাপদ নয়।
জীবনকে সুযোগের জায়গা হিসেবে না দেখে হুমকি ও অনিশ্চয়তার জায়গা হিসেবে দেখতে শেখে।
তাহলে শিশুর সামনে কী করবেন?
শুধু কী করবেন না, তা জানাই যথেষ্ট নয়; বরং ইতিবাচক আচরণ গড়ে তোলাও জরুরি।
শিশুর সামনে সম্মানজনক ভাষায় কথা বলতে, মতবিরোধ হলেও শান্তভাবে সমাধান করতে, অন্যের ভালো দিক নিয়ে আলোচনা করতে, পরিবারে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বার্তা দিতে, অর্থ বা মানসিক চাপ নিয়ে কথা বললেও বয়স-উপযোগীভাবে বলতে চেষ্টা করুন।
শিশুর মন অনেকটা কাঁচের মতো— স্বচ্ছ, সংবেদনশীল এবং সহজেই প্রভাবিত হয়। বড়দের কাছে যা সামান্য বিরক্তি, হতাশা বা অভ্যাসগত কথা, শিশুর মনে তা স্থায়ী বিশ্বাসে পরিণত হতে পারে। একটি সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী ও মানসিকভাবে শক্তিশালী শিশু গড়ে তুলতে চাইলে পরিবারে শুধু ভালোবাসা নয়, প্রয়োজন সচেতন আচরণও।
/মহু