ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর রাজ্যজুড়ে ভয়াবহ সহিংসতা, ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা এবং সংখ্যালঘু মুসলিমদের ভীতি প্রদর্শনের অন্তত ৩৪টি সুনির্দিষ্ট ঘটনা নথিভুক্ত করেছে ভারতীয় মানবাধিকার সংস্থা ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অফ সিভিল রাইটস’ (এপিসিআর)।
গত ৯ মে প্রকাশিত সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৬ সালের ৪ মে থেকে ৭ মে-এর মধ্যে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরপরই এই হামলাগুলো সংঘটিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সংবাদ পরিবেশনের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকায় স্থানীয় সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, যেখানে অন্তত দুজন মানুষের মৃত্যু এবং অসংখ্য ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের চিত্র ফুটে উঠেছে।
এপিসিআর-এর তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতার ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কোচবিহার এবং উত্তর ২৪ পরগনা জেলা, যেখানে উভয় জেলাতেই ৭টি করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া কলকাতা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৫টি করে এবং হাওড়া, মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও বীরভূমেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সহিংসতা রেকর্ড করা হয়েছে।
সংঘাতের ধরণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৭টি মুসলিম পরিবার ও ১০টি মসজিদে সরাসরি আক্রমণ চালানো হয়েছে। বিশেষ করে কোচবিহারের গোসানিমারি মসজিদে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিয়ে চালানো হামলা ঠেকাতে গিয়ে একজন মুসলিম ব্যক্তি নিহত হন। এ ছাড়া বীরভূমের সিউড়ি এবং উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাতে মুসলিম মালিকানাধীন হোটেল ও দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিবেদনে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনায় ‘সিরাজউদ্দৌলা উদ্যান’ ও ‘এন পাড়া মসজিদ বাড়ি রোড’-এর মতো ঐতিহাসিক নাম পরিবর্তন করে যথাক্রমে ‘শিবাজী উদ্যান’ ও ‘নেতাজি পল্লী রোড’ করার খবর পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া হাওড়ার ডোমজুড়ে মুসলিম ছাত্রীদের হিজাব পরতে বাধা প্রদান এবং বিভিন্ন জেলায় গবাদি পশুর বাজার জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়ার ১৪টি ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছে। কলকাতার বিভিন্ন স্থানে তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যালয় দখল এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হিসেবে দলটির নেতাকর্মীদের বাড়িঘর লক্ষ্য করে বুলডোজার দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাটির মতে, এই সহিংসতার মূল লক্ষ্য ছিল নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়কে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা এবং ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা। মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে ঈদগাহের ব্যারিকেড ভেঙে দেওয়া এবং জামায়াতে ইসলামীর পরিচালনাধীন মসজিদে হামলার ঘটনাগুলো ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক পুরোনো ভিডিও ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে, তবে এপিসিআর-এর এই প্রতিবেদনটি মাঠপর্যায়ের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অন্তত ৫০ জন মুসলিম এই কয়েক দিনে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং ৫৪টি সম্পত্তিতে হামলা চালানো হয়েছে।
সূত্র: দ্য ডিসেন্ট।
সময়ের আলো/টিএইচ