বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের ট্রাম্প-শি বৈঠকে সবচেয়ে তীব্র ও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তাটি এসেছে তাইওয়ান ইস্যুতে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, তাইওয়ান প্রশ্নটি সঠিকভাবে সামলানো না হলে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র এমন এক বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যেতে পারে, যেখানে সরাসরি সংঘাত এমনকি বৃহত্তর যুদ্ধের আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে। বৈঠকে শি জিনপিং এই ইস্যুকে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’ হিসেবে তুলে ধরেন।
প্রায় ৯ বছর পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের চীন সফরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে আগে থেকেই ব্যাপক আগ্রহ ছিল। বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক গ্রেট হল অব দ্য পিপল- এ দুই নেতার বৈঠক শুরু হয় জাঁকজমকপূর্ণ রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে।
লালগালিচা, সামরিক কুচকাওয়াজ, দুই দেশের জাতীয় সংগীত এবং ২১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে ট্রাম্পকে স্বাগত জানান শি জিনপিং। তিয়ানআমেন স্কয়ারের পাশের এই কূটনৈতিক মঞ্চে কেবল প্রটোকলই নয়, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নিয়েও বার্তা ছিল স্পষ্ট।
বৈঠকের সূচনাতেই শি জিনপিং তাইওয়ান প্রসঙ্গ সামনে আনেন। তিনি বলেন, তাইওয়ান প্রশ্ন চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এরপর তিনি আরও স্পষ্ট ভাষায় ট্রাম্পকে সতর্ক করেন, যদি এই ইস্যু যথাযথভাবে সামাল দেওয়া না হয়, তা হলে দুই দেশ সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে, এমনকি বৃহত্তর সামরিক সংঘাতও তৈরি হতে পারে। তার ভাষায়, এমন পরিস্থিতি পুরো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থায়’ ঠেলে দেবে।
বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে আয়োজিত এই বৈঠককে আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শি জিনপিং তার বক্তব্যে পরিষ্কার করে দেন যে, বেইজিংয়ের কাছে তাইওয়ান কেবল একটি আঞ্চলিক প্রশ্ন নয়, বরং দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের কেন্দ্রীয় ইস্যু।
তিনি বলেন, বিষয়টি যদি ঠিকভাবে সামলানো যায়, তবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সামগ্রিক স্থিতিশীলতা পাবে; আর ভুলভাবে সামলালে সংঘাতের পথ খুলে যাবে।
শি জিনপিংয়ের ভাষায়, তাইওয়ানের ‘স্বাধীনতা’ এবং দুই প্রান্তের শান্তির প্রশ্নটি পানি ও আগুনের মতো পরস্পরবিরোধী। এই মন্তব্যে চীনের দীর্ঘদিনের অবস্থানই আবারও উঠে আসে।
তাইওয়ানকে তারা নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে এবং দ্বীপটির বিষয়ে যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপকে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখে। তাইওয়ান ইস্যুতে শি জিনপিংয়ের এই কঠোর অবস্থান ছিল বৈঠকের মূল রাজনৈতিক সুর, যা বোঝায় যে বেইজিং এই বিষয়ে কোনো আপসের জায়গা রাখছে না।
শুধু তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তাই নয়, শি জিনপিং বৈঠকে বৃহত্তর কৌশলগত প্রেক্ষাপটও টেনেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ককে ইতিহাসের আলোকে দেখার চেষ্টা করে প্রশ্ন তোলেন, দুই দেশ কি তথাকথিত ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ এড়িয়ে একটি নতুন ধরনের বৃহৎ শক্তির সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবে কি না।
এই ধারণা অনুযায়ী একটি উদীয়মান শক্তি যখন প্রতিষ্ঠিত শক্তির জায়গা নেওয়ার চেষ্টা করে, তখন যুদ্ধের ঝুঁকি বেড়ে যায়। শি জিনপিংয়ের বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, চীন চাইছে নিজেদের উত্থানকে সংঘাতের নয়, বরং সহাবস্থানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করতে।
থুসিডাইডিস ট্র্যাপ হলো একটি ভয়ের পরিস্থিতি। যখন পুরোনো কোনো শক্তিশালী দেশ দেখে যে নতুন আরেকটি দেশ দ্রুত উন্নতি করে সক্ষমতায় বা শক্তিতে তাদের সমান হয়ে যাচ্ছে, তখন পুরোনো দেশটি ভয় পেয়ে যায়। এই ভয় থেকে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত বা যুদ্ধ লেগে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বৈঠকের আগে ও পরে প্রকাশিত তথ্যগুলোও দেখাচ্ছে, তাইওয়ানকে ঘিরে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সন্দেহ ও চাপা উত্তেজনা মোটেও কমেনি। তাইওয়ানও এই শীর্ষ বৈঠক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
তাদের আশঙ্কা, ট্রাম্প প্রশাসন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নরম করতে গিয়ে তাইওয়ানের স্বার্থে কোনো ধরনের ছাড় দিতে পারে। তাইওয়ানের কেবিনেট মুখপাত্র মিশেল লি বলেছেন, অঞ্চলের নিরাপত্তাহীনতার মূল উৎস চীনের সামরিক হুমকি।
যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ওয়ান চায়না’ নীতিকে স্বীকার করলেও তাইওয়ানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বহাল রেখেছে। দশকের পর দশক ধরে ওয়াশিংটন তাইওয়ানের কাছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বিক্রি করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বরং গত ডিসেম্বরে তারা ১১ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন করে।
তবে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প-শি বৈঠকের আগে আরও বড় একটি সম্ভাব্য ১৩ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছিল। এতে বোঝা যায়, শীর্ষ বৈঠকের আগেই তাইওয়ান প্রশ্নে একটি সূক্ষ্ম কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ চলছিল।
তবে বৈঠকের কূটনৈতিক আবহ যে পুরোপুরি শীতল ছিল তাও নয়। বরং আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা, রেড কার্পেট, সামরিক বাদ্য, ২১ বার তোপধ্বনি, শিশুদের পতাকা নাড়ানো এবং চীনা সামরিক বাহিনীর গুজ-স্টেপ কুচকাওয়াজ- সব মিলিয়ে আয়োজন ছিল অত্যন্ত বর্ণাঢ্য।
ট্রাম্পের বিশেষ গাড়ি ‘দ্য বিস্ট’ থেকে নেমে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে করমর্দন এবং এরপর উভয় দেশের জাতীয় সংগীত বাজানোর দৃশ্য বৈঠকের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তোলে। এই দৃশ্যপট অনেকটাই ইঙ্গিত দেয় যে, প্রকাশ্য উত্তেজনার মধ্যেও দুই দেশ সম্পর্কের দরজা পুরোপুরি বন্ধ করতে চাইছে না।
শি জিনপিং তার সূচনা বক্তব্যে আরও বলেন, বর্তমান বিশ্ব এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শতাব্দীতে একবার ঘটে এমন পরিবর্তনগুলো দ্রুত ঘটছে। তার মতে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কি একসঙ্গে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে স্থিতিশীলতা আনতে পারবে, সেটিই আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
বক্তব্যে তিনি সহযোগিতার ওপর জোর দিয়ে বলেন, দুই দেশের মধ্যে মতভেদের চেয়ে অভিন্ন স্বার্থই বেশি, আর পারস্পরিক সহযোগিতায় উভয় পক্ষই লাভবান হতে পারে। তার এই কথাগুলোকে একদিকে সফট ডিপ্লোমেসি, অন্যদিকে কড়া ভূরাজনৈতিক বার্তার সঙ্গে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা হিসেবে দেখা যায়।
ট্রাম্পও বৈঠকে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক সুরে কথা বলেন। তিনি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎকে সম্মানের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন এবং দুই নেতার মধ্যে ভালো বোঝাপড়ার কথা তুলে ধরেন। ট্রাম্প বলেন, সমস্যা হলে তারা দ্রুত সমাধান করতে পারেন।
তিনি শি জিনপিংকে ‘মহান নেতা’ বলেও প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে জানান, তিনি এই সফরে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে এনেছেন এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও ভালো করার আশা রাখেন।
বৈঠকের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ট্রাম্পের পক্ষ থেকে শি জিনপিং ও তার স্ত্রী পেং লিয়ুয়ানকে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানো।
বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ভেতরে এই আমন্ত্রণকে কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, দুই দেশের মধ্যে কঠোর প্রতিযোগিতা চললেও আলোচনা ও শীর্ষ পর্যায়ের যোগাযোগের পথ খোলা রাখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বেইজিংয়ে ট্রাম্প-শি বৈঠক ছিল এক জটিল বার্তা-সমষ্টি। একদিকে সৌজন্য, আনুষ্ঠানিকতা ও পারস্পরিক প্রশংসা; অন্যদিকে তাইওয়ানকে ঘিরে সরাসরি হুঁশিয়ারি। শি জিনপিংয়ের বক্তব্যে সবচেয়ে জোরালো বার্তা ছিল এই যে, তাইওয়ান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের ভুল পদক্ষেপ চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে বিপজ্জনক মোড়ে ঠেলে দিতে পারে।
ফলে এই বৈঠক শুধু দুই নেতার সাক্ষাৎ নয়, বরং আগামী দিনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় রাজনীতির গতিপথ কোন দিকে যাবে তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হয়ে রইল।