স্যাঁতসেঁতে দেয়াল থেকে কল্পনায় নানামুখী বিচিত্র আবহের চিত্র দেখছিল সৌরভ। চারুকলায় পড়ালেখা করায় তার দৃষ্টিভঙ্গিও যেন চিত্রকর হয়ে গেছে। সুযোগ পেলেই ঘুরে বেড়ানোটা সৌরভের ছোটকালের শখ। এই ঘুরে বেড়ানোর সময় প্রকৃতিগতভাবে সৃষ্ট বেশ কিছু শৈল্পিক গঠনশৈলী তাকে প্রভাবিত করে। এরপর থেকেই সৌরভ সবকিছুতেই শিল্প খুঁজে বেড়ায়।
বৈশাখ এলেই তার ভেতরে যেন সৃষ্টির ফুল ফুটে। বৈশাখের তপ্ত রোদ আর ঝড় বৃষ্টির মাঝে দেশ বেড়ানো তার মজার শখ। ঝড় বৃষ্টিতে তার বেড়ানোর শখের পেছনেও রয়েছে অদ্ভুত কারণ। এই সময় লোকজন সাধারণত বেড়াতে বের হয় না। আর তাই সৌরভ এ সময়টাকে বেছে নিয়েছে। এই সময় পর্যটক থাকেই না। আর সেই সুযোগে সময় নিয়ে দৃশ্য এবং ইতিহাস উপভোগ করা যায়। বেড়াতে বের হওয়ার আগের রাতে রাত জেগে শুরু হয় শিল্পকর্ম। সেই সঙ্গে নতুন নতুন শিল্পকর্ম এবং পুরাকীর্তির খোঁজ। আর এই শিল্পকর্ম এবং পুরাকীর্তি দেখতে ঘুরে বেড়ানো তার আনন্দ।
এই বৈশাখে তার লক্ষ্য ছিল চাঁদপুর। চাঁদপুর ফরিদগঞ্জের লোহাগড় মঠের স্যাঁতসেঁতে দেয়ালের শ্যাওলার আস্তর তাকে অভিভূত করে তুলল। বৈশাখের প্রচণ্ড রোদে ঘামলেও সে মঠের ওপরের দিকে উঠে গেল। দুদিন আগেও কালবৈশাখী ও ঝড় বৃষ্টি ছিল। সে কারণেই দেয়ালের শ্যাওলাগুলো সতেজ হয়ে আছে। এই শ্যাওলার ওপর রোদের কিরণ পড়ে পুরো দেয়ালটাকে যেন সালভাদর ডালির চিত্রকর্ম করে গড়ে তুলেছে। তার বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘সময়ের স্থায়িত্ব’ যেন এই শ্যাওলাপূর্ণ দেয়ালে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এখানে এসে সৌরভ চলে যায় পাঁচশ বছর পূর্বের বৈশাখের এই বাড়িতে। সময়ের গলে যাওয়া ঘড়ি যেন তাকে ব্যঙ্গ করছে প্রচণ্ড সূর্যের তেজ নিয়ে।
শ্যাওলার সবুজ থমকে যায় সময়ের সবুজে! জীবন ঝড়ের তাণ্ডবে সৌরভও যেন অনেকটা নুইয়ে থাকা রোদ ছায়া। বৈশাখ এলেই বিচিত্র এক অনুভূতিতে ছেয়ে যায় সৌরভের পুরোটা অস্তিত্বে। নিগারের কথা বারবার ঘুরে ফিরে ওকে অস্থির করে তোলে। এই বৈশাখেই মুখোমুখি হয়েছিল দুজনে। চারুকলা থেকে হুড়মুড় করে বেরিয়ে আসছিল সৌরভ, আর নিগার চারুকলার দরজায় দাঁড়িয়ে বৈশাখী উত্তপ্ততায় খুব সুখে আইসক্রিমের মজা নিচ্ছিল। তখনই দুজনে ধাক্কাটা খায়। সুখের জিনিসটা হাত থেকে পড়ে যাওয়ায় নিগারের মেজাজটা বিগড়ে যায়। জিদে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে ওঠে। দাঁড়িয়েই দুচোখ বন্ধ করে ঘুসি চালাতে শুরু করে। হতভম্ব সৌরভ প্রথমে নিজেকে আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। নরম হাতের ঘুসি তাকে ব্যথার চেয়ে আনন্দ দেয় বেশি। চোখ বন্ধ করে ঘুষি চালানো নিগার হঠাৎ উপলব্ধি করে যে সে কোনোরকম বাধার সম্মুখীন হচ্ছে না। তার কাছে বিষয়টি আশ্চর্যের মনে হয়। থেমে গিয়ে চোখ খোলে।
‘এটা কী হলো।’ প্রশ্ন করে সৌরভ-
‘কী হলো মানে! আর তুমি যা করলে সেটা কী?’ পাল্টা প্রশ্ন ছিল নিগারের।
‘আমি কি ইচ্ছে করে ধাক্কা দিয়েছি নাকি।’
‘আমারতো তাই মনে হয়। এই বৈশাখী গরমে একটু মজা করে আইসক্রিম খাচ্ছিলাম, তোর কারণে সেই মজাও নষ্ট হলো।’ জিদে একেবারে তুমি থেকে তুই-তে নেমে আসে নিগার।
‘দেখো, ব্যবহারটা ভালো করো।’ কিছুটা জোরে অনেকটা ধমকের স্বরেই বলে সৌরভ।
‘ব্যবহার খারাপ করলাম কোথায়? ঠিক আছে এবার দেখবে আমি কী করতে পারি।’
‘বরং তুমি দেখো আমি কী করি।’
‘তুমি আমার কচুটা করবে।’ নিগার কথাটা পুরোপুরি শেষ করতে পারেনি, হঠাৎ তখনই সৌরভ এক অভাবনীয় কাণ্ড করে বসে। প্রকাশ্যেই নিগারকে টেনে নিয়ে তার ঠোঁটে টুক করে চুমু দিয়ে দৌড়ে বৈশাখী মেলার ভিড়ে নিজেকে লুকিয়ে ফেলে।
হতভম্ব নিগার সেখানেই বসে পড়ে। তার চোখ বিস্ফোরিত, হাত-পা থরথর করে কাঁপছিল। দূর থেকে তা দেখে সৌরভ ভয় পেয়ে যায়। সাহস করে আবার এগিয়ে আসে। ততক্ষণে নিগারকে ঘিরে মেয়েদের ছোটখাটো একটা জটলা তৈরি হয়ে গেছে। সৌরভ সাহস নিয়ে এগিয়ে যায়। মেয়েদের ভিড় ঠেলে বসে থাকা নিগারের দিকে ‘সরি’ বলে হাত বাড়িয়ে দেয়। নিগার কিছুক্ষণ সৌরভের দিকে তাকিয়ে থেকে ওর হাত ধরেই উঠে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েদের মাঝে গুঞ্জন ওঠে ‘ও আচ্ছা ওদের নিজেদের মামলা, তোরা চলে আয়, আমাদের এখানে আর কাজ কী।’ ওরা চলে গেলে এবার নিগার সরাসরি সৌরভের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘ফিরে আসায় বেঁচে গেলা। তবে এমনিতে তোমাকে ছাড়ছি না। চলো আমার আইসক্রিমের ক্ষতিপূরণ দাও।’ শুরুটা এভাবেই হয়েছিল।
লোহাগড় মঠের স্যাঁতসেঁতে দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে সৌরভ টের পেল তার ভেতরের শূন্যতা। শ্যাওলার সবুজে জমাট বেঁধে আছে এক অনন্ত অপেক্ষা। সে আলতোভাবে ছুঁয়ে দেখল দেয়ালের কচি সবুজ ভেজা স্তর, তার মনে হলো, এই আর্দ্রতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে তার না বলা কথাগুলো।
তখনই নিগারের মুখটা ভেসে উঠল। আইসক্রিম হাতে দাঁড়িয়ে থাকা, রাগে ফুঁসতে থাকা, আবার হঠাৎই সেই অদ্ভুত রহস্যময় হাসি। রং লেগেছিল তাদের দিনগুলোয়, কখনো উজ্জ্বল, কখনো ম্লান, কখনো ঝড়ের মতো বিশৃঙ্খল। কিন্তু শেষটা সে কোনোদিন আঁকতে পারেনি।
সৌরভের সঙ্গে থাকতে থাকতেই বৈশাখ নিগারের সঙ্গেও জোট বেঁধেছিল। নদীর পাড়ে ঝড়ের বিকাল দেখতে চেয়েছিল নিগার। আবদার করেছিল, ‘চলো না, আজ ঝড়টা কাছ থেকে দেখি।’
সৌরভ ইতস্তত করলেও নিগারের জেদের কাছে হার মানে সে। দুজনেই বেরিয়ে পড়ে নদীর ধারে। টিমটিমে বৃষ্টি হঠাৎই ঝড়ে রূপ নেয়। খুব দ্রুত শুরু হয়ে, প্রচণ্ড রাগি হাওয়া, গাছের কুড়া, তারপর মুষলধারে বৃষ্টি। সেই বৃষ্টির ভেতরেই হঠাৎ এক অযাচিত বিপর্যয়। ঝড়ের তীব্রতায় একটি ভাঙা ডাল কোত্থেকে ছিটকে এসে আঘাত করে নিগারের মাথায়। মুহূর্তেই ওদের সবকিছু বদলে যায়।
নিগারকে হাসপাতালে নেওয়া থেকে, প্রার্থনা- চেষ্টা কোনোটাই কম হয়নি। কিন্তু নিগার আর ফিরে আসেনি। তারপর থেকে বৈশাখ সৌরভের কাছে শুধু ঋতু নয়, ওর জীবনের একটি অসমাপ্ত ক্যানভাস হয়ে উঠে।
মঠের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ তার মনে হয়, এই শ্যাওলার ভেতরে, সালভাদর ডালির ‘সময়ের স্থায়িত্ব’ যেন স্বপ্ন ভাঙার প্রতিফলন। সেই মোমের মতো গলে যাওয়া সময়ের বিভ্রমে নিগারের অস্তিত্ব হয়তো আছে। অথবা থেকেও নেই।
সৌরভ ব্যাগ থেকে তার স্কেচবুকটা বের করে। অনেক দিন পর কাঁপা হাতে সে আঁকতে শুরু করে। দেয়ালের শ্যাওলা, গলে যাওয়া সময়, আর তার মাঝখানে এক মেয়ে। তার হাতে আইসক্রিম, চোখে রাগ আর হাসির অদ্ভুত মিশ্রণ। আঁকতে আঁকতে তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, কিন্তু সে থামে না।
শেষ আঁচড়টা টানার পর সে একটু পেছনে সরে দাঁড়ায়। ছবিটা নিখুঁত এবং অদ্ভুতভাবে সম্পূর্ণ। নিগার তাকে দেখে হাসছে, তাকে কাছে ডাকছে। বৈশাখের তপ্ত রোদ তখন বিকালের নরম ছায়ার আদরে আবিস্ট। সৌরভ একটা ঘোরের মধ্যে নিগারের দিকে হাত বাড়ায়। হঠাৎ সে নিজেকে শূন্যে অনুভব করে, তার নাকে
ভেসে আসে নিগারের চুলের মেথির সুভাস। সৌরভের মনে হয় কতকাল ধরে সে নিগারের হাত ধরে অনন্তে উড়ে যাচ্ছে।
শেষ বিকালে বেড়াতে আসা লোকজন ‘নিগার’ বলে একটি চিৎকার শুনতে পায়। তারপর প্রতি বৈশাখেই ওরা ফিরে আসে। ঝড়ের আগে, রোদের মাঝে, সেই একই জায়গায়। কারণ কিছু ভালোবাসা চলে যায় না, শুধু রূপ বদলায়।
সময়ের আলো/জেডআই