সবুজ-শ্যামলে ঘেরা, পাখির কলতানে মুখরিত এক ছোট্ট গ্রামে থাকতেন এক হৃদয়বান গেরস্ত। তার বাড়ির শেষ প্রান্তে ছিল এক ছায়াঘেরা আমগাছ। প্রতি বছর এই আমগাছ ভরে উঠত টসটসে মিষ্টি আমে। গেরস্ত আর তার পরিবার সেই আম খেয়ে খুশি থাকত, আর গ্রামের শিশুরা গাছের নিচে খেলা করে খুশি হতো।
একদিন হঠাৎ করে বাতাসের ভেলায় এক খুদে বীজ এসে আমগাছের কাণ্ডে পড়ে। বীজটি ছিল স্বর্ণলতার একটা পাতাহীন, হালকা হলুদ লতার বীজ। সে এতই ক্ষুদ্র আর হালকা ছিল যে গাছের চোখে পড়তই না প্রায়।
আমগাছ ধীরকণ্ঠে বলল, ‘কে তুমি, ছোট্ট বীজ? এত কাঁপছো কেন? ভয় পেয়েছো নাকি?’
ছোট্ট বীজটি কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল, ‘আমি স্বর্ণলতা। আমার নিজের পাতা নেই, না মূল, না ডালপালা। আমি কারও না কারও গায়ে জড়িয়ে বাঁচি। ঝড় এলে মাটিতে পড়ে মরে যাবো- তাই ভয় পাই খুব।’
আরও পড়ুন
আমগাছ খুবই দয়ালু ছিল। সে বলল, ‘এই যে ছোট্ট বীজ, ভয় পেয়ো না। আমি তোমাকে আগলে রাখবো।’
কিছুদিন পর বীজটি অঙ্কুরিত হয়ে ছোট্ট নরম লতায় পরিণত হলো। আমগাছ খুশি হয়ে বলল, ‘তুমি তো বেশ মিষ্টি! তোমার নাম কী?’
‘আমার নাম স্বর্ণলতা,’ লাজুকভাবে উত্তর দিল লতাটি, ‘আমি পরজীবী উদ্ভিদ। আমার নিজের কিছু নেই- না পাতা, না মূল। আমি অন্যদের সাহায্য ছাড়া বাঁচতে পারি না।’
আমগাছ মৃদু হেসে বলল, ‘তাতে কী হয়েছে! তুমি আমার বন্ধু। আমি যত্ন নেবো তোমার।’
স্বর্ণলতা খুশি হয়ে নিজের কোমল ডালপালা দিয়ে আমগাছকে জড়িয়ে ধরল মায়াভরে।
ওরা প্রতিদিন গল্প করত, রোদেলা দুপুরে আর চাঁদনি রাতে।
স্বর্ণলতা আমগাছের কোলে বড় হচ্ছে একটা শিশুর মতো। কিন্তু দিন যেতে থাকে, স্বর্ণলতার শাখা গজাতে থাকে, চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। তার ডালপালা গাছকে এতটা জড়িয়ে ধরে যে সূর্যের আলো ঢুকতেই পারে না।
আমগাছ একদিন ক্লান্তকণ্ঠে বলল, ‘স্বর্ণলতা, আমার ফুল হচ্ছে না ঠিকমতো। এবার যদি ফল না হয়, গেরস্ত আমাকে কেটে ফেলবে।’
স্বর্ণলতা রাগ করে বলল, ‘তুমি কি আমার ভালো দেখতে পারো না? আমি অনেক বড় হয়েছি, আমার চারপাশে সবাই আমাকে দেখে মুগ্ধ! তুমি হয়তো হিংসে করছো!’
আমগাছ চুপ করে গেল। সে দুঃখ পেল, কিন্তু কিছু বলল না। পরের বছর যখন গেরস্ত দেখল গাছে তেমন ফল নেই। তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি বললেন, ‘এ গাছে এবার ফলই ধরেনি! বৃথা জায়গা দখল করে আছে। কাঠুরিয়াকে খবর দিতে হবে, গাছটা কেটে ফেলতে হবে।’
এ কথা শুনে আমগাছ কেঁদে ফেলল।
সে বলল, ‘স্বর্ণলতা, তোমাকে আশ্রয় দিয়েছিলাম- বন্ধু ভেবেছিলাম। কিন্তু তুমি আমার অস্তিত্বটাই কেড়ে নিলে। এখন আমরা দুজনই হারিয়ে যাবো।’
স্বর্ণলতা কিছুক্ষণ চুপ থেকে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘তুমি ঠিক বলেছো, বন্ধু। আমার ভুল হয়েছে বন্ধু। আমি শুধু নিজের সুখ চেয়েছিলাম। আমি শুধু নিজেকে বড় করতে চেয়েছিলাম, তোমার কষ্ট বুঝিনি।’
পরদিন কাঠুরিয়া এসে গাছটি কেটে ফেলল। গাছটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, গাছের সঙ্গে সঙ্গে স্বর্ণলতাও মাটিতে আছড়ে পড়ল। কাঠুরিয়া গাছটি কেটে সমিলে নিয়ে গেল তক্তা বানানোর জন্য। আর স্বর্ণলতা জড়ানো ডালপালাগুলো রোদে শুকাতে দিল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করার জন্য।
গাঁয়ের শিশুরা আর সেখানে খেলা করতে এলো না। আমগাছের ছায়া হারিয়ে সেই জায়গাটা হয়ে উঠল নীরব ও শূন্য। বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগল এক নিঃশব্দ একটা কান্না, যেন কেউ হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর গল্প বলছে আস্তে আস্তে।
এএডি/