মানুষের জীবন ঘিরে থাকে পরিবার, সমাজ, ধর্ম, ভাষা, জাতি ও দেশের নানা পরিচয়। এসব পরিচয় তাকে শিকড় ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করে। সংকট দেখা দেয় তখনই, যখন কোনো একটি পরিচয়ের প্রাধান্যে মানুষ হিসেবে তার সহজ পরিচয়টি আড়ালে চলে যায়। ধর্ম যখন বিশ্বাসের ব্যক্তিগত পরিসর পেরিয়ে মানুষে মানুষে দূরত্ব তৈরি করে, তখন গড়ে ওঠে বিভাজনের দেয়াল। রবীন্দ্রনাথ তার সময়েই সেই দেয়ালের ক্রমশ উঁচু হয়ে ওঠা প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
ঔপনিবেশিক শাসন, বঙ্গভঙ্গ, স্বদেশি আন্দোলন, জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের টানাপোড়েন তার জীবদ্দশায় ভারতবর্ষকে বারবার আলোড়িত করেছে। তিনি কখনো ঘটনাগুলো থেকে দূরে সরে দাঁড়াননি। বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে পথে নেমেছেন, রাখি বন্ধনের আয়োজন করেছেন, স্বদেশি গান লিখেছেন। আবার আন্দোলনের ভেতরে উগ্রতা ও সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যের ছায়া দেখে নিজের অবস্থানও পুনর্বিবেচনা করেছেন। এই আত্মসমালোচনার সাহসই তার সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী ভাবনাকে বিশেষ গভীরতা দিয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ভারতবর্ষকে কোনো একক জাতি, ধর্ম বা সংস্কৃতির নির্মাণ হিসেবে দেখেননি। তার দৃষ্টিতে এই ভূখণ্ডের সভ্যতা গড়ে উঠেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নানা জনগোষ্ঠীর আগমন, পারস্পরিক সংযোগ, দ্বন্দ্ব ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে। আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, শক, হুন, পাঠান, মোগল- অসংখ্য জাতি ও জনগোষ্ঠী এই সভ্যতার নির্মাণে অংশ নিয়েছে। কেউ কাউকে পুরোপুরি বিলীন করতে পারেনি, আবার কেউ নিজেও অপরিবর্তিত থাকেনি।
‘ভারততীর্থ’-এ তিনি লিখেছেন-
‘হেথায় আর্য, হেথা অনার্য,
হেথায় দ্রাবিড় চীন-
শক-হুন-দল পাঠান-মোগল
এক দেহে হল লীন।’
এই ‘এক দেহ’ একরঙা কোনো সত্তা নয়। তার ভেতরে বহু ভাষা, বহু স্মৃতি, বহু বিশ্বাস, বহু সংস্কৃতির প্রবাহ। নদী যেমন অসংখ্য উপনদীর জল নিয়ে এগিয়ে চলে, সভ্যতাও তেমনি গ্রহণ ও বিনিময়ের ভেতর দিয়ে বিস্তৃত হয়। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি যেখানে অতীতকে বিশুদ্ধ ও একক করে তুলতে চায়, রবীন্দ্রনাথ সেখানে বহুত্বের মধ্যেই ভারতবর্ষের প্রাণ খুঁজেছেন।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ তার রাজনৈতিক চিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ বাঁক তৈরি করে। ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি সক্রিয় হন। রাখিবন্ধনের মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমানের সামাজিক আত্মীয়তার প্রতীক গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। সেই সময় তার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়-
‘বাংলার মাটি, বাংলার জল,
বাংলার বায়ু, বাংলার ফল-’
এই বাংলায় কোনো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের একক মালিকানা নেই। মাটি সবার, নদী সবার, বাতাস সবার।
কিন্তু স্বদেশি আন্দোলনের মধ্যেই তিনি এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের দেশপ্রেমের সঙ্গে গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের বাস্তবতা সবসময় মেলেনি। বিদেশি পণ্য বর্জনের আহ্বান অনেকের কাছে রাজনৈতিক আদর্শ, কিন্তু দরিদ্র মানুষের কাছে কম দামে কাপড় কেনা ছিল জীবিকার প্রশ্ন। দেশপ্রেমের নামে সেই মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি রবীন্দ্রনাথ মেনে নিতে পারেননি। তিনি দ্রুত বুঝেছিলেন, হিন্দু-মুসলমান বিরোধের সব দায় শুধু ঔপনিবেশিক শাসকের ওপর চাপিয়ে দিলে সমাজের নিজস্ব ব্যর্থতা আড়ালে থেকে যায়। ব্রিটিশ শাসন বিভেদের সুযোগ নিয়েছে, কিন্তু সেই সুযোগ তৈরি হয়েছিল সমাজের ভেতরে আগে থেকেই জমে থাকা দূরত্বের কারণে।
‘ব্যাধি ও প্রতিকার’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ নিজের সমাজের দিকে কঠিন চোখে তাকিয়েছেন। হিন্দু সমাজের জাতিভেদ, সামাজিক অহংকার, মুসলমান প্রতিবেশীর সঙ্গে দূরত্ব- এসব নিয়ে তিনি কোনো সৌজন্যমূলক নীরবতা পালন করেননি। শতাব্দীর পর শতাব্দী পাশাপাশি বাস করেও যদি মানুষের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক তৈরি না হয়, তা হলে রাজনৈতিক প্রয়োজনে হঠাৎ ‘ভাই ভাই’ বললে সেই সম্পর্ক টেকে না। এই আত্মসমালোচনা তার চিন্তার বড় শক্তি। সাম্প্রদায়িক মন সবসময় দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপাতে চায়। রবীন্দ্রনাথ সেই সহজ পথ বেছে নেননি। তিনি জানতে চেয়েছেন, নিজের সমাজ অন্য সম্প্রদায়কে কতখানি মানুষ হিসেবে দেখেছে।
তার উপন্যাস ‘গোরা’ পরিচয়ের এই সংকটকে গভীর সাহিত্যিক রূপ দিয়েছে। গোরা প্রবল হিন্দু জাতীয়তাবাদী। তার কাছে হিন্দুত্ব ও ভারতবর্ষ প্রায় একই অর্থ বহন করে। ধর্মীয় আচার, সামাজিক পরিচয় এবং জাতিগত গৌরবের ওপর দাঁড়িয়ে সে নিজের অস্তিত্ব নির্মাণ করেছে। কিন্তু উপন্যাসের শেষে জানতে পারে, জন্মসূত্রে সে হিন্দু পরিবারে জন্মায়নি। মুহূর্তেই তার পরিচয়ের দুর্গ ভেঙে পড়ে। তখন গোরা কহিল, ‘আমার কথা কি আপনি ঠিক বুঝতে পারছেন? আমি যা দিন-রাত্রি হতে চাচ্ছিলুম অথচ হতে পারছিলুম না, আজ আমি তাই হয়েছি। আমি আজ ভারতবর্ষীয়। আমার মধ্যে হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান কোনো সমাজের কোনো বিরোধ নেই।’
একটি পরিচয় ভেঙে যাওয়ার পর তার সামনে বৃহত্তর দেশ খুলে যায়। এতদিন ভারতবর্ষকে সে নিজের ধর্মীয় বৃত্তের ভেতর থেকে দেখছিল। সেই বৃত্ত সরে গেলে মানুষ সামনে আসে। গোরা যেন তখন প্রথমবার বুঝতে পারে, জন্মপরিচয় কোনো মানুষের অর্জন নয়; কেউ নিজের ধর্ম, জাতি কিংবা পরিবার নির্বাচন করে পৃথিবীতে আসে না। রবীন্দ্রনাথ মানুষের পরিচয় মুছে ফেলতে চাননি। বরং পরিচয়ের ভেতরে থেকেও বৃহত্তর মানবিক পরিসর দেখতে চেয়েছেন।
‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে এই প্রশ্ন আরও রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। সন্দ্বীপের দেশপ্রেম আবেগময়, তীব্র, উত্তেজনাপূর্ণ। সে দেশকে দেবতার আসনে বসিয়ে মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেও দ্বিধা করে না। নিখিলেশের দেশপ্রেম অন্য রকম। সে স্বদেশকে ভালোবাসে, কিন্তু সেই ভালোবাসার নামে দরিদ্র মুসলমান ব্যবসায়ী কিংবা কৃষকের জীবিকার ওপর আঘাত সমর্থন করে না। এই দুই চরিত্রের দ্বন্দ্বে রবীন্দ্রনাথ উগ্র জাতীয়তাবাদের বিপদ তুলে ধরেছেন। দেশ, ধর্ম, জাতি কিংবা ঐতিহ্যের নামে রাজনীতি যখন শত্রু তৈরি করে, তখন ঘৃণা ও অবিচারও ক্রমে সামাজিক বৈধতা পেতে শুরু করে।
রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন, দেশপ্রেম যখন মানুষের প্রতি দায়বোধ হারায়, তখন তা সহজেই বিদ্বেষে রূপ নিতে পারে। নিজের পতাকাকে উঁচুতে তুলতে যদি অন্যের ঘর পোড়াতে হয়, সেই দেশপ্রেমের ভেতরেই অসুখ বাস করছে। তার ধর্মভাবনাও সাম্প্রদায়িকতার বিপরীতে এক মুক্ত পরিসর তৈরি করে। উপনিষদ, ব্রাহ্মধর্মীয় পরিবেশ, বাউল ও সুফি ভাবধারা তার চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। লালনের গান তাকে আকৃষ্ট করেছিল মানুষের মধ্যে অসীমকে খোঁজার আকাক্সক্ষায়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বাইরে মানুষের অন্তর্জগতের যে অনুসন্ধান বাউল ধারায় দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথ তার সঙ্গে আত্মীয়তা অনুভব করেছিলেন। তার কাছে ধর্মের গভীরতা মানুষের হৃদয়কে প্রসারিত করার মধ্যে। যে বিশ্বাস মানুষকে অহংকারী করে, অন্যকে তুচ্ছ করে কিংবা প্রাচীর তোলে, সেখানে আত্মিক মুক্তির পথ সংকুচিত হয়ে আসে।
শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরের গ্রামীণ জীবনও তার উপলব্ধিকে সমৃদ্ধ করেছিল। সেখানে কৃষকের দারিদ্র্য ধর্ম দেখে আসে না, নদীভাঙন ধর্ম দেখে ঘর ভাঙে না, খরা কিংবা বন্যা মানুষের পরিচয় দেখে আঘাত হানে না। একই মাঠে কাজ করা, একই নদী পাড়ি দেওয়া, একই বাজারে পণ্য বিক্রি করা মানুষের বাস্তব জীবন ধর্মীয় বিভেদের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও গভীর। এই অভিজ্ঞতা রবীন্দ্রনাথকে বুঝিয়েছিল, রাজনীতি মানুষকে দুটি সম্প্রদায়ে ভাগ করলেও জীবন সবসময় সেই রেখা মানে না।
শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীর ভাবনায়ও তাই পৃথিবীর নানা সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয়ের আকাক্সক্ষা ছিল। ভারতীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি চীন, জাপান, পারস্য ও পাশ্চাত্যের জ্ঞানচর্চার জন্যও সেখানে দরজা খোলা হয়েছিল। অন্যকে জানা, তার সংস্কৃতি ও জীবন সম্পর্কে পরিচিত হওয়া- এসব দূরত্ব কমায়। অজ্ঞতা ভয় তৈরি করে, ভয় থেকে সন্দেহ জন্মায়, আর সন্দেহের জমিতেই সাম্প্রদায়িকতা দ্রুত বাড়ে। রবীন্দ্রনাথের গভীরতা এখানেই যে তিনি সাম্প্রদায়িকতাকে শুধু দাঙ্গা বা সহিংসতার মধ্যে দেখেননি। তার নীরব রূপও তিনি অনুভব করেছিলেন। একজন মানুষকে ধর্মের কারণে ঘৃণা করা, প্রতিবেশীকে সন্দেহ করা, কোনো ব্যক্তির অপরাধ থেকে গোটা সম্প্রদায় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া, সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষমতাকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া- এসবও একই মানসিকতার অংশ। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা অনেক সময় সেই দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসের বিস্ফোরণমাত্র।
আজকের পৃথিবীতে তার এই ভাবনা আরও তীব্রভাবে ফিরে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মিথ্যা ছবি বা বিকৃত ভিডিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজার মানুষের মনে ধর্মীয় উত্তেজনা ছড়াতে পারে। খবর যাচাইয়ের আগেই মানুষ নিজের সম্প্রদায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে যায়। একজনের অপরাধ মুহূর্তে পুরো জনগোষ্ঠীর অপরাধে পরিণত হয়।
প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু ‘আমি’ ও ‘অপর’-এর পুরোনো বিভাজন পুরোপুরি বদলায়নি। এই সময়ে ‘গোরা’ আবার পড়লে প্রশ্ন জাগেÑ আমি কে? শুধু হিন্দু বা মুসলমান? শুধু বাঙালি? শুধু কোনো রাষ্ট্রের নাগরিক? নাকি এসব পরিচয় ধারণ করেও আরও বড় মানবিক পরিসরের অংশ? রবীন্দ্রনাথ শেষ প্রশ্নটির দিকে নিয়ে যান। নিজের ধর্মকে ভালোবাসা যাবে, সংস্কৃতিকে ধারণ করা যাবে, মাতৃভূমিকেও ভালোবাসা যাবে। কিন্তু সেই ভালোবাসা যদি অন্যের প্রতি বিদ্বেষের ওপর দাঁড়ায়, তার ভেতরেই অন্ধকার জন্ম নেয়।
একটি প্রদীপ জ্বালাতে পাশের প্রদীপটি নেভাতে হয় না। সাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গিকে এই ছোট ছবির মধ্যেও বোঝা যায়। তার কাছে মানুষের মর্যাদা ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে বড়। কোনো দেশ তার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর একার ঘর হতে পারে না। কোনো সভ্যতা একটি ধর্মের একার সম্পত্তি হতে পারে না। শতাব্দীর পর শতাব্দী পাশাপাশি বসবাস, খাদ্য, সংগীত, ভাষা, প্রেম, বন্ধুত্ব ও সংস্কৃতির যে জটিল বুনন তৈরি করে, তাকে কয়েকটি ঘৃণার সেøাগান দিয়ে আলাদা করা যায় না।
রবীন্দ্রনাথ তাই মানুষের কাছে ফিরে যেতে চেয়েছেন। সেই মানুষ গোরার মতো নিজের পরিচয়ের দেয়াল পেরিয়ে বেরিয়ে আসে, নিখিলেশের মতো উন্মত্ত জনতার বিপরীতে বিবেক নিয়ে দাঁড়ায়, বাউলের গানে মনের মানুষ খোঁজে, আবার বাংলার কৃষকের জীবনে ধর্মের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে শ্রম, ক্ষুধা, ভালোবাসা ও বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষা। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তার সবচেয়ে গভীর উচ্চারণ এখানেই- মানুষকে তার ধর্ম দিয়ে বিচার করার আগে মানুষ হিসেবে দেখা। মানুষের এই মুখটি হারিয়ে গেলে সাম্প্রদায়িকতা জয়ী হয়। আর সেই মুখটির কাছে ফিরে আসার পথ খুঁজে পাওয়াই রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও চিন্তার অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী মানবিক আহ্বান।
সময়ের আলো/জেডআই