ছোট্ট বন্ধুরা! তোমরা কি কখনো বড়শি দিয়ে মাছ ধরেছ? যদি ধরে থাকো, তা হলে নিশ্চয়ই জানো- বড়শি দিয়ে মাছ ধরার মধ্যে কী দারুণ আনন্দ! আর যদি এখনও বড়শি হাতে নিয়ে পুকুর বা নদীর ধারে বসে মাছ না ধরে থাকো, তা হলে আজকের গল্পটি পড়ার পর হয়তো তোমাদেরও এক দিন ভোরবেলা বড়শি হাতে পানির ধারে বসে মাছ ধরার ইচ্ছে করবে।
রাফি ছিল গ্রামের এক কৌতূহলী ছেলে। নতুন কিছু দেখলেই তার মনে নানা প্রশ্ন জাগত। পাখি কেন আকাশে ওড়ে, মাছ কীভাবে পানির নিচে সাঁতার কাটে, বৃষ্টির পর মাটির গন্ধ কেন এত সুন্দর- এসব জানার আগ্রহ ছিল তার। তবে সবকিছুর চেয়ে তার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগত দাদুর সঙ্গে সময় কাটাতে।
ছুটির দিন মানেই রাফির কাছে আনন্দের দিন। সেদিনও ছিল ছুটির সকাল। ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। চারদিকে হালকা কুয়াশার চাদর। দূরের বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে সূর্যের মøান আলো উঁকি দিচ্ছিল। তালগাছের মাথায় বসে শালিক ডাকছিল। কোথাও কোথাও মোরগের ডাক শোনা যাচ্ছিল। ভেজা ঘাসের ওপর শিশিরের বিন্দুগুলো সকালের আলোয় চিকচিক করছিল।
রাফি ঘুম থেকে উঠেই দেখল, দাদু উঠানে বসে বড়শি গোছাচ্ছেন।
রাফি ছুটে গিয়ে বলল, দাদু, কোথায় যাচ্ছ?
দাদু মুচকি হেসে বললেন, আজ তোমাকে একটা মজার জিনিস শেখাব।
কী?
আজ আমরা মাছ ধরতে যাব।
রাফির চোখ আনন্দে বড় হয়ে গেল।
সত্যি দাদু? আমি মাছ ধরব?
হ্যাঁ, তবে মাছ ধরতে হলে আগে ধৈর্য ধরতে শিখতে হবে।
রাফি সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়ে গেল। দাদু একটি ছোট বড়শি, সুতো, ফাতনা আর টোপ নিয়ে নিলেন। দুজন হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের বড় পুকুরটির দিকে রওনা হলেন।
পুকুরটি ছিল গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে। চারপাশে কচুরিপানা, কলাগাছ, বাঁশঝাড় আর বড় বড় গাছ। পুকুরের পানিতে কয়েকটি পদ্মপাতা ভেসে ছিল। কোথাও কোথাও ছোট মাছ পানির ওপর এসে আবার দ্রুত নিচে চলে যাচ্ছিল। পাড়ের কাদামাটিতে ছোট ছোট পায়ের ছাপ- মনে হচ্ছিল, ভোরে অনেক পাখি আর ছোট প্রাণী এখানে পানি খেতে এসেছে।
পুকুরের ধারে গিয়ে দাদু একটি ছায়াময় জায়গা বেছে নিলেন। এই জায়গাটাই ভালো, দাদু? রাফি জানতে চাইল।
হ্যাঁ। মাছ কোথায় থাকতে পারে, সেটিও কিন্তু বুঝতে হয়। শুধু বড়শি ফেললেই মাছ ধরা যায় না।
দাদু খুব যত্ন করে বড়শিতে টোপ লাগালেন। তারপর রাফির হাতে বড়শিটি দিয়ে বললেন, এই নাও। এবার পানিতে টোপ ফেল। তবে মনে রেখো, বড়শি ধরে ধৈর্য নিয়ে বসে থাকতে হবে।
রাফি সাবধানে বড়শি পানিতে ফেলল। ফাতনাটি পানির ওপর ভেসে রইল। তারপর শুরু হলো অপেক্ষা। এক মিনিট গেল। দুই মিনিট গেল। পাঁচ মিনিট গেল। কিন্তু মাছের কোনো খবর নেই।
রাফি একবার ফাতনার দিকে তাকায়, একবার দাদুর দিকে তাকায়। তারপর একটু পরপরই জিজ্ঞেস করে, দাদু, মাছ কি আসবে? দাদু হাসলেন। আসবে।
কিছুক্ষণ পর আবার রাফি বলল, এখন?
এখনও না।
আরও কিছুক্ষণ পর- এবার?
দাদু এবার হেসে বললেন, রাফি, মাছ ধরতে হলে শুধু পানির দিকে তাকিয়ে থাকলেই হবে না। মনকেও শান্ত রাখতে হবে।
রাফি চুপ করে গেল। সে পুকুরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চারপাশের শব্দ শুনতে পেল। দূরে একটি কোকিল ডাকছে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে বাতাস বয়ে যাচ্ছে। পানিতে ছোট ছোট ঢেউ উঠছে। হঠাৎ কোথা থেকে একটি ফড়িং এসে তার বড়শির কাছে বসে আবার উড়ে গেল।
রাফির মনে হলো, এতদিন সে শুধু মাছের কথাই ভেবেছে। কিন্তু পুকুরের চারপাশে যে কত প্রাণী আর কত রকমের জীবন আছে, তা সে কখনো খেয়াল করেনি। ঠিক তখনই পানিতে ছোট ছোট ঢেউ উঠল।
দাদু! দাদু! রাফি ফিসফিস করে বলল, ওটা কী? দাদু পানির দিকে তাকিয়ে বললেন, সম্ভবত মাছ এসেছে। চুপ করে দেখো।
একটি ছোট্ট রুপালি মাছ টোপের কাছে এসে একটু ঘুরল। তারপর আবার দ্রুত সরে গেল। রাফি উত্তেজনায় বড়শি টেনে তুলতে যাচ্ছিল। দাদু তার হাত ধরে বললেন, না, এখনই নয়। মাছ টোপটি পরীক্ষা করছে।
মাছও কি পরীক্ষা করে?
অবশ্যই! মাছ কিন্তু বোকা নয়।
রাফি মুচকি হাসল।
দাদু বললেন, মনে রেখো, জীবনে অনেক কাজেই ধৈর্য দরকার। তাড়াহুড়ো করলে অনেক সময় ভালো সুযোগও হাতছাড়া হয়ে যায়।
রাফি মাথা নেড়ে আবার অপেক্ষা করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ ফাতনাটি একটু নড়ল। রাফির বুক ধক করে উঠল। তারপর ফাতনাটি আবার স্থির। রাফি দাদুর দিকে তাকাল। দাদু আঙুল তুলে চুপ থাকতে বললেন। কিছুক্ষণ পর আবার ফাতনাটি নড়ল। এবার একটু বেশি জোরে।
দাদু!
শান্ত হও। এবার প্রস্তুত হও।
ফাতনাটি হঠাৎ পানির নিচে ডুবে গেল।
দাদু বললেন, এবার আস্তে করে বড়শি টান!
রাফি দুই হাতে বড়শি ধরে টান দিল। পানির ছিটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পানির ওপর উঠে এলো একটি ছোট্ট পুঁটি মাছ। পেয়েছি! পেয়েছি! রাফি আনন্দে চিৎকার করে উঠল। তার চোখ আনন্দে জ্বলজ্বল করছিল। সে মাছটিকে হাতে নিতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল। মাছটির ছোট্ট শরীর ছটফট করছিল। তার চোখ দুটো যেন ভয়ে বড় হয়ে গেছে। রাফির আনন্দটা একটু কমে গেল।
দাদু, মাছটা ভয় পেয়েছে?
হ্যাঁ। ও তো পানির প্রাণী। পানি থেকে উঠে গেলে ওর কষ্ট হয়।
রাফি কিছুক্ষণ মাছটির দিকে তাকিয়ে রইল।
দাদু বললেন, আর দেখো, মাছটাও খুব ছোট। এখনই যদি আমরা এটিকে রেখে দিই, বড় হয়ে এক দিন হয়তো আবার এই পুকুরেই সাঁতার কাটবে।
রাফি বলল, তা হলে এটাকে ছেড়ে দিই, দাদু?
তোমার কী মনে হয়?
রাফি সাবধানে মাছটি বড়শি থেকে ছাড়িয়ে পানিতে ছেড়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যেই ছোট্ট মাছটি লেজ নেড়ে গভীর পানির দিকে চলে গেল। পানির ওপর ছোট ছোট বৃত্ত তৈরি হলো। কিছুক্ষণ পর সেগুলোও মিলিয়ে গেল। রাফির মনে হলো, পুকুরটি যেন হাসছে।
দাদু তার মাথায় হাত রেখে বললেন, দেখলে? মাছ ধরার আনন্দ যেমন আছে, তেমনি একটি প্রাণকে বাঁচিয়ে দেওয়ার আনন্দও কম নয়। রাফি মুগ্ধ হয়ে পানির দিকে তাকিয়ে রইল। তবে মাছ ধরার ইচ্ছেটা তার একটুও কমেনি।
দাদু, আবার বড়শি ফেলব?
অবশ্যই। তবে এবার আরও মন দিয়ে বসবে।
রাফি আবার টোপ লাগিয়ে বড়শি পানিতে ফেলল। এবার সে আর বারবার প্রশ্ন করল না। চুপচাপ বসে রইল। মাঝেমধ্যে পানির ঢেউ দেখল, পাখির ডাক শুনল, ফড়িংয়ের উড়ে যাওয়া দেখল। হঠাৎ কিছুক্ষণ পর বড়শির ফাতনাটি নড়ে উঠল। একবার। দুবার। তারপর জোরে জোরে দুলতে লাগল।
রাফি অবাক হয়ে বলল, দাদু! এবার মনে হচ্ছে বড় মাছ!
দাদু হেসে বললেন, মনে হচ্ছে ঠিকই। এবার শক্ত করে ধরো।
হঠাৎ বড়শির সুতো টানটান হয়ে গেল। মনে হলো, পানির নিচে কেউ যেন বড়শিটি নিয়ে পালাতে চাইছে।
দাদু, মাছটা আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে!
ভয় পেয়ো না। বড়শি শক্ত করে ধরো। আস্তে আস্তে টানো।
রাফি দুই হাতে বড়শি ধরে সব শক্তি দিয়ে টানতে লাগল। মাছটিও পানির নিচে প্রাণপণে ছুটছে। একবার ডানে, একবার বাঁয়ে। রাফির হাত ব্যথা হয়ে গেল। তবু সে ছাড়ল না। আমি পারছি না দাদু!
পারবে। একটু ধৈর্য ধরো।
শেষ পর্যন্ত রাফি জোরে টান দিতেই পানির ওপর বড় একটা ছিটা উঠল।
ওয়াও!
বড়শিতে ঝুলছে একটি বেশ বড় টেংরা মাছ! রাফি আনন্দে লাফিয়ে উঠল। দাদু! দেখো! দেখো! আমি বড় মাছ ধরেছি!
দাদুও হেসে উঠলেন।
দেখেছ রাফি? ধৈর্য ধরলে তার ফল পাওয়া যায়।
রাফি মাছটির দিকে তাকিয়ে বলল, আজকের দিনটা আমার জীবনের সবচেয়ে মজার দিন!
দাদু বললেন, মাছ ধরার আনন্দ আছে ঠিকই। তবে মনে রেখো, মাছ, পাখি, ব্যাঙ, ফড়িং- সবাই আমাদের চারপাশের প্রকৃতির অংশ। তাদেরও বাঁচার অধিকার আছে। যতটা প্রয়োজন, ততটাই নেবে; অকারণে কোনো প্রাণীকে কষ্ট দেবে না। রাফি মাথা নেড়ে বলল, ঠিক আছে দাদু। আজ থেকে আমি এটা মনে রাখব।
সূর্য তখন অনেকটা ওপরে উঠে গেছে। সকালের কুয়াশা কেটে গেছে। পুকুরের পানি রোদে ঝিকমিক করছে। পাড়ের ঘাসে বসে থাকা ফড়িংগুলো উড়ে বেড়াচ্ছে। দূরে কয়েকটি বক খাবারের সন্ধানে পানির ধারে দাঁড়িয়ে আছে। দাদু বড়শি গুছিয়ে নিলেন। রাফি হাতে তার ধরা টেংরা মাছটি নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতে সে বারবার পেছন ফিরে পুকুরটির দিকে তাকাচ্ছিল।
তার মনে হচ্ছিল, আজ সে শুধু একটি মাছই ধরেনি- শিখেছে ধৈর্য ধরতে, প্রকৃতিকে দেখতে এবং ছোট ছোট প্রাণের প্রতি মায়া করতে।
বাড়ি ফেরার সময় রাফি দাদুকে বলল, দাদু, আমি যখনই সময় পাব, তোমার সঙ্গে মাছ ধরতে আসব।
দাদু মৃদু হেসে বললেন, আসবে। তবে মাছ ধরার পাশাপাশি প্রকৃতিকে ভালোবাসতেও শিখবে।
রাফি বলল, শিখব দাদু। কথা দিলাম।
ছোট্ট বন্ধুরা, শুনলে তো? রাফি কীভাবে বড়শি দিয়ে মাছ ধরার আনন্দ পেল, আবার একটি ছোট্ট মাছকে পানিতে ছেড়ে দিয়ে তাকে বেঁচে থাকার সুযোগও দিল।
তোমরাও যদি কোনো দিন বড়শি হাতে পুকুর বা নদীর ধারে বসো, তা হলে মাছ ধরার আনন্দ নিতে পারো। তবে মনে রেখো- নদী, পুকুর আর প্রকৃতি শুধু আমাদের আনন্দের জন্য নয়। সেখানে ছোট-বড় অসংখ্য প্রাণীর বাস। তাদেরও নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার আছে।
তাই প্রকৃতিকে ভালোবাসো, প্রাণীদের প্রতি মমতা দেখাও আর ধৈর্য ধরতে শেখো। কারণ কখনো কখনো একটি মাছ ধরার অপেক্ষাই আমাদের জীবনের বড় একটি শিক্ষা দিয়ে যেতে পারে!