পাতি শেয়ালের পণ্ডিতি

এম আব্দুল হালীম বাচ্চু

সাহিত্য

বনের নাম শালবন। সেখানে নানা জাতের পশুপাখি মিলেমিশে বাস করত। বনের মাঝখানে ছিল একটি বিশাল বটগাছ। সেই গাছের ছায়ায় বসেই

2026-09-19T08:47:18+00:00
2026-09-19T08:47:18+00:00
 
  শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৪ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সাহিত্য
পাতি শেয়ালের পণ্ডিতি
এম আব্দুল হালীম বাচ্চু
প্রকাশ: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৪৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বনের নাম শালবন। সেখানে নানা জাতের পশুপাখি মিলেমিশে বাস করত। বনের মাঝখানে ছিল একটি বিশাল বটগাছ। সেই গাছের ছায়ায় বসেই পশুপাখিরা নানা বিষয়ে আলোচনা করত, বিচার-সালিশ করত এবং বিপদের সময় পরামর্শ নিত। একদিন বনে গুজব ছড়িয়ে পড়ল, পাতি শেয়াল নাকি খুব বড় পণ্ডিত হয়েছে। সে নাকি দূরদেশের জ্ঞানী প্রাণীদের কাছ থেকে অনেক বিদ্যা শিখে এসেছে। শেয়াল নিজেও সুযোগ পেলেই নিজের পাণ্ডিত্য জাহির করত।

পাতি শেয়াল গম্ভীর মুখে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলত, ‘বৃষ্টির ব্যাপারটি অত্যন্ত জটিল। তবে আমার গবেষণা বলছে, আজ বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা আছে, আবার নাও হতে পারে।’

পশুরা তার কথা শুনে মাথা নাড়ত। পাতি শেয়াল মনে মনে ভাবত, সবাই তাকে কত জ্ঞানী মনে করে!

একদিন বনের রাজা সিংহ ঘোষণা করলেন, ‘আগামী পূর্ণিমায় বনে জ্ঞান পরীক্ষা হবে। যে সবচেয়ে ভালো পরামর্শ দিতে পারবে, তাকে বনের প্রধান উপদেষ্টা করা হবে।’ এই ঘোষণা শুনে পাতি শেয়ালের চোখ চকচক করে উঠল। সে ভাবল, এবার তার পণ্ডিতির আসল পরিচয় পাওয়া যাবে।

পরীক্ষার দিন বটগাছের নিচে সব পশুপাখি জড়ো হলো। সিংহ প্রথম প্রশ্ন করলেন, ‘বনে পানির অভাব দেখা দিয়েছে। কীভাবে আমরা সবাই মিলে পানির ব্যবস্থা করতে পারি?’

পাতি শেয়াল চোখ কুঁচকে বলল, ‘এটি একটি গভীর প্রশ্ন। এর উত্তর নিয়ে আমি শিগগিরই একটি বিশদ গবেষণা প্রকাশ করব।’

এবার হাতি বলল, ‘আমার জানা মতে, বনের উত্তর দিকে একটি পুরোনো জলাশয় আছে। আমরা যদি সবাই মিলে সেটি পরিষ্কার করি, তবে পানি পাওয়া যেতে পারে।’

সিংহ হাতির প্রস্তাব পছন্দ করলেন। কিন্তু পাতি শেয়াল তৎক্ষণাৎ বলল, ‘হাতির প্রস্তাব অত্যন্ত সাধারণ। বড় সমস্যার সমাধান এত সহজ হতে পারে না।’

পরদিন হাতির নেতৃত্বে সবাই জলাশয় পরিষ্কার করতে গেল। বানর ডালপালা সরাল, হরিণরা শুকনো পাতা কুড়াল, হাতি কাদামাটি সরিয়ে দিল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জলাশয়ের তলায় জমে থাকা পানি দেখা গেল।


পাতি শেয়াল দূর থেকে সব দেখছিল। সে ভাবল, ‘এ তো খুব সহজ কাজ! আমিও পারতাম।’

কিন্তু সে কাজে যোগ দিল না। বরং সন্ধ্যায় বটগাছের নিচে বসে সবাইকে বলল, ‘তোমরা যে কাজ করেছ, তা আমার পরিকল্পনারই বাস্তব প্রয়োগ। আমি যদি আগে পানির গুরুত্ব ব্যাখ্যা না করতাম, তোমরা কি কাজটি করতে পারতে?’
বানর হেসে বলল, ‘তোমার কথা শুনে তো আমরা শুধু বসেই ছিলাম। কাজ শুরু করেছিল হাতি।’

কয়েক দিন পর বনে বড় বিপদ দেখা দিল। এক রাতে ঝড় এসে বহু গাছ ভেঙে ফেলল। কয়েকটি প্রাণীর বাসা নষ্ট হলো। সিংহ সবাইকে ডেকে বললেন, ‘এবার আমাদের দ্রুত আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।’

পাতি শেয়াল আবার পণ্ডিতি দেখিয়ে বলল, ‘ঝড় প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ঝড়ের ক্ষতি মোকাবিলায় আমাদের ঝড়ের প্রকৃতি বুঝতে হবে।’

হাতি বলল, ‘এখন বক্তৃতার সময় নয়। আগে আহতদের নিরাপদ জায়গায় নিতে হবে।’

সবাই কাজে লেগে গেল। পাখিরা ছোট প্রাণীদের খবর দিল, হাতি গাছ সরিয়ে পথ খুলল, বানর উঁচু গাছে উঠে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে দিল। অল্প সময়ের মধ্যেই বেশিরভাগ প্রাণী নিরাপদে চলে গেল। পাতি শেয়াল তখনও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দিচ্ছিল। হঠাৎ একটি ভাঙা ডাল তার সামনে পড়ে গেল। সে ভয় পেয়ে দৌড় দিল। কিন্তু দৌড়াতে গিয়ে কাদায় পা আটকে পড়ে গেল।

এবার পাতি শেয়াল লজ্জায় মাথা নিচু করল। সে বুঝল, শুধু বড় বড় কথা বললে বিপদের সময় কেউ কাজে আসে না। জ্ঞান তখনই মূল্যবান, যখন তা কাজে লাগানো যায়।

সিংহ বললেন, ‘পাণ্ডিত্য মুখের কথায় নয়, মানুষের— অথবা প্রাণীর— কাজে প্রকাশ পায়। যে জ্ঞান অন্যের উপকারে আসে, সেই জ্ঞানই সত্যিকারের জ্ঞান।’

সেদিন থেকে পাতিখ্যাত শেয়াল আর অহেতুক পণ্ডিতি দেখাত না। সে অন্যদের কথা মন দিয়ে শুনত, প্রয়োজন হলে কাজে সাহায্য করত এবং নিজের ভুল স্বীকার করতে শিখল।

বড় বড় কথা নয়, বাস্তব কাজ ও উপকার করার জ্ঞানই হলো প্রকৃত পাণ্ডিত্যের পরিচয়।


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে
  বিষয়:   পাতি শেয়াল  পণ্ডিত 


Advertisement
Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: