আমীরুল ইসলামের সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৮৬ সালে। যতদূর মনে পড়ে, বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে ছড়াকার সুজন বড়ুয়ার অফিস ঘরেই তার সঙ্গে প্রথম দেখা। তখনই তিনি ছড়াকার হিসেবে বেশ পরিচিত ও জনপ্রিয়। তার ছড়া যেন সারা শহর মাতিয়ে বেড়াত। প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্ব, তীক্ষ্ণ রসবোধ আর ছন্দের সহজাত দখল তাকে সমসাময়িক ছড়াকারদের মধ্যে স্বতন্ত্র করে তুলেছিল।
পরবর্তী সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আড্ডাও ছিল আমাদের সাহিত্যজীবনের এক আকর্ষণীয় অধ্যায়। আমীরুল ইসলাম সেখানে নিয়মিত আসতেন। কেন্দ্রের সমন্বয়কারী ছিলেন ছড়াকার ও প্রাবন্ধিক আহমাদ মাযহার। আড্ডায় আসতেন লুৎফর রহমান রিটন, আসলাম সানীসহ আরও অনেক তরুণ লেখক। সাহিত্য, ছড়া, কবিতা, সমাজ ও সমকাল— কত বিষয় নিয়েই না চলত প্রাণবন্ত আলোচনা! সেই আড্ডার উচ্ছ্বাস, বন্ধুত্ব ও সৃষ্টিশীলতার আবহ আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল।
সময়ের ব্যবধানে আমাদের সাহিত্যজীবন নানা পথে এগিয়েছে, কিন্তু ছিয়াশির সেই প্রথম পরিচয় এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আমীরুল ইসলামের প্রাণবন্ত মুখটি আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
আমীরুল ইসলাম শুধু ছড়াকার নন— ছড়া, গল্প ও প্রবন্ধ সাহিত্যের নানা শাখায় দুই হাতে লিখতেন। তার লেখার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল বিষয় নির্বাচনের বৈচিত্র্য। যেকোনো বিষয় তার হাতে ছড়ার উপাদান হয়ে উঠত। সামান্য একটি ঘটনা, সামাজিক অসংগতি, সমকালীন কোনো প্রসঙ্গ কিংবা একেবারে দৈনন্দিন জীবনের তুচ্ছ কোনো অনুষঙ্গ— সবকিছুকেই তিনি ছন্দ, রস ও কৌতুকের মিশেলে প্রাণবন্ত করে তুলতে পারতেন। তার ছড়ায় যেমন ছিল হাস্যরস, তেমনি ছিল তীক্ষè পর্যবেক্ষণ ও সময়ের প্রতি দায়বদ্ধতা। ফলে তার লেখা পাঠকের মনে সহজেই জায়গা করে নিত। আড্ডায়ও তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত। মুহূর্তের মধ্যে কোনো প্রসঙ্গ ধরে ছড়া বানিয়ে ফেলার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তার। মনে হতো, ছন্দ যেন তার ভেতরেই স্বাভাবিকভাবে প্রবহমান। আমীরুলের এই বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীলতা এবং তাৎক্ষণিক ছড়া রচনার ক্ষমতা তাকে আমাদের সময়ের একজন স্মরণীয় ছড়াকার করে তুলেছে।
আমীরুল ইসলাম ছিলেন অসম্ভব পরিশ্রমী ও বহুমাত্রিক লেখক। তিন শতাধিক বই লিখেছেন তিনি। ছড়া, গল্প, প্রবন্ধের পাশাপাশি রূপকথার অনুবাদ, সংকলনসহ শিশু-কিশোর সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তার ছিল অবাধ বিচরণ। তার এই বিপুল সৃষ্টির পেছনে ছিল গভীর পাঠাভ্যাস। তিনি প্রচুর বই পড়তেন এবং নতুন বই ও লেখকদের খোঁজ রাখতেন। বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাস, ঐতিহ্য, চরিত্র ও প্রবণতা ছিল যেন তার নখদর্পণে। দেশি-বিদেশি শিশুসাহিত্যের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল বিস্তৃত ও নিবিড়। ফলে তার লেখায় যেমন বিষয়বৈচিত্র্য এসেছে, তেমনি এসেছে ভাষার স্বচ্ছতা, কল্পনার উচ্ছ্বাস ও শিশুমনের প্রতি গভীর মমতা। তার সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যেত, শিশুসাহিত্য তার কাছে নিছক লেখার বিষয় নয়— এটি ছিল তার দীর্ঘ পাঠ, সাধনা ও ভালোবাসার এক বিশাল জগৎ।
আমীরুল ইসলাম মাত্র ৬২ বছর বয়সে চলে গেলেন— এ মৃত্যু নিঃসন্দেহে অকালমৃত্যু। তার চলে যাওয়ায় বাংলা শিশুসাহিত্য ও ছড়ার জগতে তৈরি হলো এক গভীর শূন্যতা। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি অসংখ্য ছড়া লিখেছেন, আর সেই ছড়াগুলোতে ফুটে উঠেছে তার কল্পনাশক্তি, রসবোধ, ছন্দজ্ঞান ও সময়কে দেখার নিজস্ব চোখ। অনেক ছড়ার রাজ্যে তিনি ছিলেন যেন ছড়ার রাজা। শিশু-কিশোরের আনন্দ, বিস্ময় ও কৌতূহলকে তিনি ছন্দের জাদুতে রূপ দিয়েছেন। তার বিপুল সৃষ্টিসম্ভার শুধু আমাদের সময়ের সম্পদ নয়, আগামী প্রজন্মেরও পাঠসঙ্গী হয়ে থাকবে। মানুষ চলে যায়, কিন্তু সৃষ্টিশীল মানুষের কণ্ঠস্বর থেকে যায় তার লেখায়। আমীরুল ইসলামও তার অসংখ্য ছড়া, গল্প, প্রবন্ধ ও গ্রন্থের মধ্য দিয়ে আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন। তার অকালপ্রয়াণ গভীর বেদনার; কিন্তু তার সাহিত্য তাকে অমর করে রাখবে।
আমীরুল ইসলাম বাংলাদেশের বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক। তাকে আধুনিক শিশুসাহিত্যের রূপকারও বলা হয়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ছোটদের জন্য লিখে চলেছেন। রূপকথা তার খুবই প্রিয়, তাই রূপকথা নিয়ে লিখেছেন অসংখ্য বই। প্রতিটি লেখায় রয়েছে নতুনত্বের স্বাদ। পুরোনো রূপকথা নতুন রূপে লেখার ক্ষেত্রেও তার বিকল্প বাংলা সাহিত্যে আর একজনও নেই। তিনি সবচেয়ে বেশি খ্যাতি অর্জন করেছেন ছড়া লিখে। বিষয়বৈচিত্র্য ও সংখ্যা বিচারে বাংলা ছড়াসাহিত্যেও তার সমকক্ষ কেউ নেই।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে