আপনার অনেক গল্প আমার কাছে জমা আছে

মাহবুব রেজা

সাহিত্য

১দৈনিক আজাদের শিশুদের পাতা মুকুলের মাহফিল দেখতেন বাগবান নামের বৃদ্ধ ভদ্রলোক। তার লেখক নাম ছিল আবু নসরত রহমতউল্লাহ। আমরা শুক্রবারে

2026-09-18T11:11:02+00:00
2026-09-18T11:11:02+00:00
 
  শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৩ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সাহিত্য
আমীরুল ভাই
আপনার অনেক গল্প আমার কাছে জমা আছে
মাহবুব রেজা
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:১১ এএম 
সময়ের আলো গ্রাফিক

দৈনিক আজাদের শিশুদের পাতা মুকুলের মাহফিল দেখতেন বাগবান নামের বৃদ্ধ ভদ্রলোক। তার লেখক নাম ছিল আবু নসরত রহমতউল্লাহ। আমরা শুক্রবারে লালবাগের ঢাকেশ্বরী মন্দিরের কাছে বিশাল টিনশেডের দৈনিক আজাদ পত্রিকায় লেখা দিতে গেলে তিনি বিহারি পিয়ন দিয়ে পাশের হোটেল থেকে গরম শিঙাড়া আর চা এনে খাওয়াতেন।

সেখানে আমীরুল ভাইয়ের সঙ্গে প্রথম দেখা। মোটাসোটা গড়ন, মাথায় ঝাঁকড়া চুল। ইন্ডিয়ান পাতলা বাটিকের লুঙ্গি, ফুলহাতা শার্ট— শার্টের পকেট ফুঁড়ে লাল কালারের গোল্ডলিফ সিগারেট দেখা যাচ্ছে। মুখে সিগারেট।

কলেজপড়ুয়া আমি, এবরার হোসেন, মাসুদুল হাসান রনি, শাহ নিসতার জাহান, লিয়াকত আমিনিসহ আরও দুয়েকজন ছিলাম— নাম মনে পড়ছে না। কোথাও লেখা ছাপা না হওয়া আমি তখনও আনাড়ি। আমরা বাগবান ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছি।

আমাদের বসে থাকতে দেখে তিনি পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে একজনকে বললেন, সানী ভাই, পিয়ন-মিয়ন দিয়া পোলাপাইনের লাইগা শিঙাড়া, চা আননের ব্যবস্থা করেন।

তারপর যতক্ষণ আড্ডা হলো প্রায় সারাক্ষণই তিনি লেখা নিয়ে, লেখক নিয়ে কথা বললেন। কে কী বই পড়ছে— কী বই পড়তে হবে। লেখক বেছে বেছে লেখা পড়া উচিত। তার কথাবার্তা শুনলে তার শত্রুকেও স্বীকার করতে হবে, শিল্পসাহিত্যসহ এমন কোনো বিষয় নেই যা তার পড়া নেই।


তিনি থাকতেন ১৯৬ নম্বর জগন্নাথ সাহা রোডে। তার কথায় উৎসাহিত হয়ে সেই রাতে কলোনির বারান্দার ছোট্ট বেলকনির ঘরে বসে গল্প লিখে ফেললাম। সেই গল্প দেখাতে তার বাসায় যাওয়া। গল্পটা পড়ে তিনি একটা নাম দিয়ে বললেন, ‘গল্পটা নিয়ে সোজা ইত্তেফাকের দোতলায় গিয়া দাদাভাইয়ের হাতে দিবা।’
আমিও কথামতো তাই করলাম। দাদাভাইয়ের রুমে ঢুকে দেখি এক অসম্ভব গম্ভীর টাইপের মানুষ চেয়ারে বসে আছেন। তার টেবিলের সামনে থাকা ফাইল, দুনিয়ার কাগজপত্র। তার কথা শুনে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল, ‘কী চাই এখানে?’

আমার মুখ দিয়ে কথা বের হতে চায় না। মিন মিন করে বলেছিলাম, গ-গ-গ- ল্প— আমার কথায় মুহূর্তে তার চোখ করমচার মতো লাল হয়ে গেল।
দুদিন পর, ১৯৮৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসরে আমার গল্প ছাপা হলো। মনে আছে, গল্প ছাপা হওয়ার পরের শুক্রবারে আমীরুল ভাই আজাদে এসে হাসতে হাসতে সবাইকে বলেছিলেন, ইত্তেফাকে লেখা ছাপা হওন অনেক ভাগ্যের ব্যাপার। তোমাগো মইধ্যে মাহবুবের লেখাই সবার আগে ইত্তেফাকে ছাপা হইছে। তোমাদের মধ্যে ও হইল সিএসপি লেখক।

আমাদের সময়ে শিশুপাতা বলতে বোঝাত আফলাতুন ভাই সম্পাদিত দৈনিক বাংলার ‘সাত ভাই চম্পা’ আর রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই সম্পাদিত ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসর। এই দুটো পাতা ছিল প্রেস্টিজিয়াস পাতা। তখন সাহিত্য মহলে প্রচার ছিল, এই দুটো পাতায় লেখা ছাপা হলে লেখক স্বীকৃতি মেলে।


আজিমপুর কলোনিতে থাকার কারণে প্রায় সময়ই তার সঙ্গে দেখা হতো। শেখ সাহেব বাজারে ছিল খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক আলী ইমামের বাসা। ইমাম ভাইয়ের বাসায় মাঝেমধ্যে আসতেন লুৎফর রহমান রিটন। অনেক আড্ডা হতো। পরে ১৯৯৩ সালের দিকে রিটন ভাই ইমাম ভাইয়ের বাসার পাশে বাসা নিয়েছিলেন।

রিটন ভাই আমীরুল ভাইকে নিজ মায়ের পেটের ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন। আমীরুল ভাইয়ের আম্মা আনজিরা খাতুন ছিলেন অসম্ভব সাদাসিধে মানুষ। খালাম্মার হাতের রান্নাও ছিল অতুলনীয়। খালাম্মার ছয় ছেলে। মেয়ে না থাকায় রিটন ভাইয়ের স্ত্রী শার্লি আপাকে তিনি নিজের মেয়ের মতো দেখতেন।

১৯৯০ সালে শান্তিনগরের দৈনিক খবর হাউস থেকে দেশের প্রথম মেয়েদের সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘মনোরমা’র নির্বাহী সম্পাদক হলে আমাকে আর আমীরুল ভাইকে রিপোর্টার হিসেবে কাজ করতে বলেন। আমি আর আমীরুল ভাই শেখ সাহেব বাজার থেকে রিকশায় করে শান্তিনগর যাই। কয়েক দিন আগে একদিন আমীরুল ভাই আমাকে কল দিয়ে বললেন, তোমারে লয়া একটা দীর্ঘ লেখা লিখছি মিয়া— পইড়া দেইখো। আমীরুল ভাই সেই লেখায় লিখছেন, ‘রিটন ভাইয়ের তত্ত্বাবধানে খবর গ্রুপের একটা মহিলা পত্রিকা ছিল ‘মনোরমা’ নামে। সেই পত্রিকায় আমরা কাজ করতাম। আমি অনর্গল ভালো-মন্দ লিখে যেতে পারতাম। তরুণ বন্ধুদের মধ্যে এই গুণাবলি আমার চেয়েও বেশি ছিল মাহবুব রেজার মধ্যে। পত্রিকার নিউজপ্রিন্ট প্যাডে সে একটানা লিখে যেত। কোনো কোনো সপ্তাহে মনোরম পত্রিকায় অর্ধেক হয়তো সে লিখে ফেলল একাই। পরেও সাংবাদিক জীবনে অনেক ভালো ভালো প্রতিষ্ঠানে মাহবুব কাজ করেছে।’


অনেক দিন ধরে আমীরুল ভাইয়ের শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। নানা রকম রোগ তার শরীরে বাসা বেঁধেছিল। তিনি খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে ছিলেন ভীষণ উচ্চাভিলাষী। যখন যা মন চাইত তাই খেতেন এবং আশপাশের সবাইকে খাওয়াতেন। রান্নাও করতে পারতেন সে রকম। তার রান্নার রেসিপি শুনলে জিভে জল আসত আমাদের। শেষের দিনগুলোতে তিনি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়লেও কাউকে বলতেন না। অদম্য প্রাণশক্তিতে ভরপুর আমীরুল ভাই তার অনেক গল্প, অনেক কথা, অনেক স্মৃতি আমার কাছে গচ্ছিত রেখে গেছেন।

টুলু ভাই, আপনার সঙ্গে এই জীবনে আর দেখা হবে না কিন্তু আপনার অনেক স্মৃতি, আপনার অনেক কথা, অনেক গল্প আমার মনে পড়বে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে

  বিষয়:   আমীরুল ভাই  আপনার অনেক গল্প  আমার কাছে জমা আছে  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: