নীলার নীল

শামসুল বারী উৎপল

সাহিত্য

আজ আবার এলো সে। সুদৃশ্য মখমল আকাশ গায়ে দিয়ে নীলার দরজায় কড়া নাড়ল সে বহুদিন পর। নীলারা এমনই হয়, বলতে

2026-08-07T16:04:07+00:00
2026-08-07T16:04:07+00:00
 
  শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬,
২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬
সাহিত্য
নীলার নীল
শামসুল বারী উৎপল
প্রকাশ: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:০৪ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
আজ আবার এলো সে। সুদৃশ্য মখমল আকাশ গায়ে দিয়ে নীলার দরজায় কড়া নাড়ল সে বহুদিন পর। নীলারা এমনই হয়, বলতে পারে না অথচ অপেক্ষায় থাকে। ওকে প্রথম যেদিন দেখেছিল সেদিন থেকেই ঘোরের মধ্যে আটকে গেছে নীলা। অপেক্ষা আর অপেক্ষা, অথচ ভীষণ রকমের বাণিজ্যিক মানসিকতার চরিত্র ছিল নীলা, অর্থ উপার্জনের সামান্যতম সুযোগও হাতছাড়া করেনি কখনো। সতেরো-আঠারো বছরের ধূসর চোখ ছেলেটার নাম অনিন্দ্য। নীলা সুলতানা চল্লিশ ছুঁইছুঁই। 

অসাধারণ সুন্দরীর টানা টানা ধূসর চোখের জাদুতে হারাতে চায় পৃথিবী। প্রেমে পড়া তার স্বভাব সেই নবম শ্রেণি থেকেই, তখন রিপন ভট্টাচার্য খুব করে চেয়েছিল তাকে, চেয়েছিল নীলাও। ধর্ম বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। রিপন ভট্টাচার্য ধর্মান্তরিত হয়ে লুকিয়ে বিয়েও করেছিল, তারপর চুরি করে দেখা করা, পালিয়ে এদিক-ওদিক রাত কাটানো। ফলশ্রুতিতে যা হওয়ার তাই, 

একসময় প্রেগন্যান্ট হয় নীলা। কত ঘটনা-দুর্ঘটনা, কত কি। কিন্তু ওই যে স্বভাব, বেশি দিন ভালো লাগেনি রিপনকে। বাদ দিয়েছিল তাকে। শুরু করে নতুন অধ্যায় জামিলের সঙ্গে। জামিল কৃপণ স্বভাবের তাই নীলার চোখ ঘুরতে সময় লাগেনি, অর্থই যে নীলার জীবনের সর্বোচ্চ চাওয়া সেটিই প্রমাণিত হয়েছে বারবার। অনেকটা উল্টো পথে হেঁটেছিল তাই। রিপন আপ্রাণ চেষ্টা করে চলছিল আগের মতোই, কখনোই নীলাকে ছাড়তে চায়নি সে।

সাহেদ, সোহেল, বাবু, সাজ্জাদ। বহুঘাট পার হয়ে নীলা থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।  কেন? কারণ ওই একটাই, কাউকেই বেশি দিন ভালো না লাগা। অনেকেই ততদিনে জেনে গেছে নীলার অবাধ বিচরণের রসালো গল্প। যদিও সত্যির সঙ্গে রং লাগানোও ছিল সেই গল্পের অনেকখানি, ফলশ্রুতিতে কেউই আর নীলার সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে রাজি হয়নি। রাজি হয়েছিল রায়হান। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে রায়হানের হাত ধরে ঠিকানা হয় নীলার এখানে। এই কালো একটা তিন তলা বাড়িতে। দিনভর চুপচাপ সন্ধ্যা নামলেই জমে ওঠে অন্দরের ঝলমলে আলো। নীলা হয়ে যায় ছন্দা। এই ছন্দাও একসময় স্বাভাবিক হয়ে যায় এই জীবনে। তার যেমন পরিবর্তন পছন্দ, এখানে চলে পরিবর্তনের বিকিকিনি। আজ একজন আর কাল আরেকজন। অর্থলোভী রায়হান এখানকার একজন। নীলার মতো তার কয়েকজন স্ত্রী আছে। তার উপার্জনের মাধ্যম।

অনিন্দ্য আজও এলো। নীলার কাছেই আশ্রয় খোঁজে সে। ও এলে নীলা কেমন হয়ে যায়। একেবারেই অন্যরকম কেউ। নীলা শুনেছে অনিন্দ্য কোনো এক ধনী ব্যবসায়ীর একমাত্র পুত্র। পড়াশোনা করে কানাডায়। এর বেশি কিছু জানে না সে। অনিন্দ্য চুপচাপ বসে থাকে নীলার সামনে দুয়েকটা কথা বলে অথবা বলেও না। শুনতে চায় নীলার গল্প তারপর একসময় বড় একটা খাম দিয়ে চলে যায় অনিন্দ্য।

তারপর নীলা অপেক্ষায় থাকে। আবার কবে আসবে সে! যে কয়টা দিন এসেছিল সে প্রতিদিন একই রুটিন, একই চুপচাপ বসে থাকা। কিন্তু নীলা অনুভব করে ছেলেটা এসে বসে থাকলেও তার ভালোলাগে অন্যরকম লাগে। যে প্রেমে সে অভ্যস্ত তেমন প্রেম নয়। সবকিছু কেমন স্নিগ্ধ কোমল মনে হয়, এই অনুভূতির নাম কী তা সে জানে না। একে কী বলে? সে প্রশ্নের উত্তরও পায় না। কেমন এক বিষণ্ন চোখে তাকিয়ে থাকে নীলার দিকে, অপলক। 

নীলা এটুকু কেবল বোঝে এ এক ঐশ্বরিক সম্পর্ক যে সম্পর্কের নাম সে জানে না। এক দিন কী মনে করে নীলাকে বলেছিল, আমাকে একটু আদর করবেন? নীলা মাথায় হাত দিয়ে আদর করেছিল অনিন্দ্যকে, কপালে একটা চুমু দিয়েছিল আলতো করে। মুহূর্তের মধ্যে ঘটে গেল ঘটনাটা, অনিন্দ্য সব শক্তি দিয়ে ঠাস করে একটা চড় মারল নীলার গালে। একজন অতি বাণিজ্যিক মহিলা এক কিশোরের সামনে স্তব্ধ হয়ে যায়, অনেক প্রশ্ন থাকলেও জানা হয় না কিছুই। কেন এমন দুর্ব্যবহার জানা গেল না আর, দ্রুত বেরিয়ে গেল অনিন্দ্য।

নীলার গালে লেগে আছে অনিন্দ্যর হাতের স্পর্শ। নীলা স্থবির হয়ে হাত দিয়ে অনুভব করে অনিন্দ্যর হাতের স্পর্শ। রাগ-ক্ষোভ, কান্না-ভালোবাসা সব একাকার।কিছু কিছু অপেক্ষা স্মৃতিকে ঝাপসা করে দেয় সময়ের সঙ্গে আর কিছু কিছু অপেক্ষা স্মৃতিকে আরও বেশি উজ্জ্বল করে, আরও বেশি পোড়াতে থাকে অন্তহীন বালুচরে। এমনই অপেক্ষায় জ্বলতে থাকে নীলা কেন এই অপেক্ষা! অনিন্দ্য এমন দুর্ব্যবহার করার পরও নীলা অপেক্ষায় থাকে। অনিন্দ্যর জন্য খুব করে কাঁদতে ইচ্ছে করে তার। ঘরের দরজা বন্ধ করে প্রায়ই আজকাল চোখের জল ফেলে। কেন ফেলে! উত্তর মেলে না। সারাক্ষণ সুযোগের সন্ধানে থাকা, অর্থের ধান্দায় ঘোরা প্রাণবন্ত মানুষটির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এমন হবে কেউ ভাবেনি। নীলা এখন সারা দিন একাকী থাকে, নিজের আঙিনায় নিজস্ব পৃথিবীতে বিচরণ তার রাত থেকে দিন। তার দরজা আজকাল বন্ধ থাকে সবসময়। খরিদ্দার আসা নিষেধ একেবারেই।

তারপর এক দিন সত্যি সত্যি নীলার দরজায় টোকা দিল অনিন্দ্য সঙ্গে আর একজন। আলো আঁধারের রংচটা সন্ধ্যায় চোখের জল মুছে নীলা আবিষ্কার করল অনিন্দ্যর বাবা হারিয়ে যাওয়া রিপনকে। মধ্যবয়সি রিপন চেয়ে থাকে তার প্রথম এবং একমাত্র পৃথিবীর চোখের দিকে। রিপন অপেক্ষায় ছিল, এখনও আছে। 

আপন সন্তানের সামনে কীভাবে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয় তা নীলা বুঝতে পারে না, বুঝতে পারে না রিপনও। দরজা খোলা দেখে উঁকি দেয় কথিত স্বামী রায়হান। নীলা ঢেকুর গিলে আত্মস্থ করতে চেষ্টা করে কঠিন সময়কে। তার কাছে সময় আর অবস্থা দুটি অসম্ভব কঠিন বিষয় বলে মনে হয়, যে সময়কে অতিক্রম করা তারপরে অসম্ভব। অন্যদিকে এই ত্রিমুখী অবস্থায় তার কী করার আছে! তার কাছে মনে হয় সময় আর অবস্থা দুটি বিপ্রতীপ বিষয়। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে অবস্থা পরিবর্তিত হয়। সময়টা যদি পিছিয়ে যেত বছর বিশেক। সেই পরিবর্তনটা কি ধণাত্মক নাকি ঋণাত্মক, এই ভাবনা তাকে বিক্ষিপ্ত করে তোলে। বিকট এক চিৎকার দিয়ে সে ছুটে বের হয়ে যায়। সময়কে অতিক্রম করাই এখন তার একমাত্র কাজ, তাই ছুটতে থাকে, ছুটতে থাকে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে সময় এবং দুজন...।

একটি দু’কুল ভাঙা নদী। নদীর ধারে বাঁশঝাড়ের ওপর মøান একটা চাঁদ পৃথিবীকে আলোকিত করতে ব্যর্থ। পাড়ে বাঁধা একটা ডিঙি নৌকা। বর্ষাকাল। খরস্রোতা নদী। ছুটতে ছুটতে নীলা এসে দাঁড়ায় নদীর ভাঙা পাড়ে, যে পাড় ভেঙে পড়ছে প্রতিনিয়ত, কী করবে সে! সাঁতার জানে না। 

নদীর জলেই তার কি ঠিকানা নির্ধারিত! অথচ নদীর ওপারে অন্য এক পৃথিবী, অন্য এক আলোকিত জগৎ, এপারে ঘন অন্ধকার। নীলা অনুভব করে তার পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে, ভেঙে পড়ছে পাড়, বিলীন হয়ে যাচ্ছে নদীর জলে। বিলীন হচ্ছে অনেক কিছুই। তাকে অনুসরণ করে ছুটে আসা একটি পরিচিত চিৎকারই তার কান অবধি পৌঁছালো, ‘মা’...।



  বিষয়:   সাহিত্য  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: