প্রিন্সেস ডায়ানা, যিনি বিশ্বজুড়ে জনগণের রাজকুমারী নামে পরিচিত ছিলেন। এ ছাড়াও তিনি ছিলেন বিশ শতকের অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী নারী। তার পুরো নাম ছিল ডায়ানা ফ্রান্সিস স্পেন্সার। ১৯৬১ সালে ১ জুলাই ইংল্যান্ডের নরফোকের স্যান্ড্রিং হামে এক অভিজাত পরিবারে তার জন্ম।
১৯৭৫ সালে তার বাবা জন স্পেন্সার ‘আর্ল স্পেন্সার’ উপাধি পাওয়ার পর ডায়ানা ‘লেডি ডায়ানা স্পেন্সার’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। মাত্র ৭ বছর বয়সে ডায়ানার মা-বাবার বিয়ে বিচ্ছেদ হয়, যা তার শৈশবজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। পড়াশোনা শেষ করে লন্ডনে আসেন। সেখানে একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষিকার সহকারী হিসেবে কাজ করেন।
১৯৮১ সালে ২৯ জুলাই সেন্ট পলস ক্যাথেড্রালে ব্রিটেনের যুবরাজ প্রিন্স চার্লসের সঙ্গে বিয়ে হয়। সে সময় ৭৫ কোটি মানুষ টিভিতে এই বিয়ের অনুষ্ঠান সরাসরি দেখতে পান। রাজপরিবারের সদস্যদের রাজকীয় গহনা সাধারণত বিশেষভাবে তৈরি করা হয়। কিন্তু ডায়ানা ক্যাটালগ থেকে একটি রেডিমেড নীলা আংটি পছন্দ করেছিলেন। বিয়ের শপথের প্রথা তিনিই ভাঙেন। প্রিন্স চার্লস-ডায়ানা দম্পতির দুটি সন্তান। রাজপরিবারের প্রথা ভেঙে সাধারণ মানুষের খুব কাছাকাছি চলে আসেন তিনি। মনোনিবেশ করেন জনকল্যাণমূলক ও সামাজিক কাজে।
আশির দশকে যখন সংক্রামক ও মারাত্মক মরণব্যাধি এইডস স্পর্শে ছড়ায় বলে ভুল ধারণা ছিল, তখন ডায়ানা গ্লাভস ছাড়াই এইডস রোগীদের হাত ধরে জড়িয়ে ধরেন। আর এভাবেই তিনি তখন মানুষের ভুল ধারণা দূর করে দেন। তিনি অ্যাঙ্গোলা ও বসনিয়ার মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় গিয়ে ল্যান্ড মাইন নিষিদ্ধ করার পক্ষে সোচ্চার হন।
ছদ্মবেশে নাইটক্লাবে যাওয়া ছিল ডায়ানার এক ধরনের হবি। ব্রিটিশ রক ব্যান্ড কুইনের বিখ্যাত গায়ক ফ্রেডি মারকিউরির সঙ্গে ডায়ানার দারুণ বন্ধৃত্ব ছিল। পাপারাজ্জিদের (ফ্রিল্যান্স ফটোসাংবাদিক) চোখ ফাঁকি দিয়ে ডায়ানা পুরুষের ছদ্মবেশে জ্যাকেট ও টুপি পরে ফ্রেডির সঙ্গে এক নাইট ক্লাবে ঘুরে এসেছিলেন। ডায়ানা পপ ও রক মিউজিকের ভক্ত ছিলেন। বিশেষ করে ডুরান ডুরান ও এলটন জন ছিলেন তার প্রিয় শিল্পী।
১৯৯৭ সালে ৩১ আগস্ট রাতে প্যারিসের পন্ট ডি এল আলমা টানেলে এক ভয়াবহ গাড়ি দুর্ঘটনায় মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মৃত্যু হয় ডায়ানার। পাপারাজ্জিদের তাড়া ও গাড়িচালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটে। এ দুর্ঘটনায় গাড়িতে থাকা তার বন্ধু ডোডি আল ফায়াদও মারা যান।
ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রয়াত সদস্য প্রিন্সেস ডায়ানাকে নিয়ে আগামীকাল একটি বই প্রকাশ করতে যাচ্ছেন তার ছোট ভাই চার্লস স্পেন্সার। ডায়ানার জীবন, তার সঙ্গে ভাইয়ের সম্পর্ক ও মৃত্যুর আগের শেষ সপ্তাহের নানা স্মৃতি তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে। বইটির নাম দেওয়া হয়েছে— ‘সোয়ান সং : ডায়ানা মাই সিস্টার’। প্রকাশক মাইকেল জোসেফ। দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে প্রকাশক বলেছেন, এই বইয়ের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ডায়ানাকে নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নিজের স্মৃতি ও ভাবনা তুলে ধরেছেন তার ভাই।
বইটির প্রকাশের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানা গেছে, মূলত ডায়ানার মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই বই আগামীকাল প্রকাশ করা হচ্ছে। ১৯৯৭ সালে ৩১ আগস্ট প্যারিসে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান প্রিন্সেস ডায়ানা। তার মৃত্যুর পর ওয়েস্ট মিনস্টার আবেতে অনুষ্ঠিত শেষকৃত্যে ভাই চালর্স স্পেন্সার আবেগঘন বক্তব্য দিয়েছিলেন।
বইটি প্রকাশের কারণ সম্পর্কে স্পেন্সার নিজেই উল্লেখ করেছেন, ডায়ানার ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকীকে সামনে রেখে তাকে তার বোন নিয়ে সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য অনেক অনুরোধ করা হয়েছে। এই অনুরোধ বিষয়টি তাকে নিজের স্মৃতি ও ভাবনাগুলো একেবারে লিখে যাওয়ার জন্য দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, সময়ের সঙ্গে ডায়ানাকে নিয়ে অনেক মতামত ও বক্তব্য প্রচলিত রয়েছে, যার অনেক কিছু সত্য নয়। তাই এই ধরনের অস্বস্তি কাটাতে নিজের দেখা ও জানা ডায়ানার গল্প নিজেই বলতে চেয়েছি। সর্বোপরি ভাইয়ের দৃষ্টিতে ডায়ানার সত্যিকারের পরিচয় তুলে ধরা। তিনি আশা করছেন, যারা ডায়ানাকে জীবিত অবস্থায় দেখেছেন ও তার স্মৃতি ধরে রেখেছেন তারাই বইটি উপভোগ করবেন। পাশাপাশি যেসব তরুণ ডায়ানার জনপ্রিয়তার সময়টি দেখেননি, বইটির পড়ে তারাও যেন বুঝতে পারেন, ডায়ানা আসলে কেমন মানুষ ছিলেন।
এদিকে আগামীকাল বইটির প্রকাশের আগে প্রকাশক বলেছেন, বইটিতে এমন কিছু তথ্য ও স্মৃতি রয়েছে যা পাঠকদের মধ্যে যথেষ্ট আগ্রহ তৈরি করবে। একই সঙ্গে এটি প্রিন্সেস ডায়ানার প্রতি একটি আবেগঘন শ্রদ্ধাও জেগে উঠবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি