পেশাগত দায়িত্ব পালন শেষে সময় আজকাল খুব কমই পাই। তারপরও নেশা বলে কথা। তাই লিখতে হয়, পড়তেও হয়। আর আমার অভ্যাস কবিতার চেয়ে বেশি গদ্য পড়ার, সেই ধারাবাহিকতায় বেশ কয়েকটি বই গত দুই-তিন মাসে পড়েছি। এর মধ্যে একটি বই নতুন করে আবার পড়লাম। সেই বইটি হচ্ছে বিখ্যাত ব্রিটিশ আমলা উনিশ শতকে ঢাকার সিভিল সার্জন জেমস টেলরের লেখা ‘এ স্কেচ অব দি টপোগ্রাফি অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস অব ঢাকা’ গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ ‘কোম্পানি আমলে ঢাকা’ বইটি। জনপ্রশাসনে স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক প্রফেসর মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান এই বইটির অনুবাদ করেছেন বহু বছর আগে।
সচেতন পাঠক মাত্রই জানেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে ১৮২৫ থেকে ১৮৩৫ সালের মধ্যে ব্রিটিশ নাগরিক জেমস টেলর ঢাকায় অবস্থান করেন। তিনি ছিলেন তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সরকারের অধীনে ঢাকার সিভিল সার্জন। ব্রিটিশ সরকার তৎকালীন সিভিল সার্জনদের তাদের নিজ নিজ জেলা ও কর্মস্থলের ভূপ্রকৃতি, নদ-নদীর জলাশয়, সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা, স্থানীয় রোগব্যাধিসহ হাসপাতালের অবস্থা এবং লোকসংখ্যা, বাসস্থান, পোশাক পরিচ্ছদ, বিছানা, জ্বালানি, খাদ্য, রীতিনীতি, শিশুপালন, মেডিকেল টপোগ্রাফি সম্বন্ধে বিস্তারিত রিপোর্ট পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। জেমস টেলরের বইটি মূলত ঢাকা জেলার তৎকালীন সমাজব্যবস্থার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ সংবলিত একটি দীর্ঘ রিপোর্ট। মূল বইটি বেরিয়েছিল ১৮৪০ সালে, কোম্পানির শাসনের শেষ দিকে।
রিপোর্ট পাঠাতে গিয়ে ফোর্ট উইলিয়ামের মেডিকেল বোর্ডের সচিব বরাবর যে পত্র লিখেছিলেন জেমস টেলর একটি অংশের উদ্ধৃতি দিলে বোঝা যাবে কত গুরুত্বপূর্ণ এ বই। ওপরে যেসব বিষয়ের কথা উল্লেখ করা হলো তার তালিকা দিয়ে টেলর লিখেছেন : ‘এগুলোর অধিকাংশ বিষয়ে আমার মন্তব্য ছাড়াও আমি জেলার ইতিহাস স্থানীয় শিল্প দ্রব্যাদি, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজস্ব ও শিক্ষার অবস্থার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়েছি। অধিকন্তু বলতে পারি আমি যেসব তথ্য পরিবেশন করতে সক্ষম হয়েছে তা এ স্থানে আমার অবস্থানকালের ব্যক্তিগত জ্ঞান থেকে অর্জিত বিভিন্ন সরকারি অফিস-আদালতের নথিপত্র পাঠ করে এবং শহর ও গ্রামে বসবাসকারী লোকজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করেও আমি এর তথ্যাদি সংগ্রহ করেছি। শহরের লোক গণনার কাজ সম্পন্ন করার ব্যাপারে আমি ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার গ্রান্টের কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ...’
প্রথম অধ্যায় ঢাকা জেলার অবস্থান, ভূপ্রকৃতি, নদ-নদীর জলবায়ু ইত্যাদি বিবরণ দেওয়া হয়েছে। মোট ১২টি অধ্যায়ের দুই শতাধিক পৃষ্ঠার এই বইটি কোম্পানি আমলের ঢাকার দলিল বললেও বেশি বলা হবে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমাজ-সংস্কৃতি, জলবায়ু থেকে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, লোকসমাজের নানা আচার অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে ঢাকার প্রাচীন ইতিহাসের এমন কোনো অংশ নেই যা এই রিপোর্টে স্পর্শ করেননি টেলর। এক কথায় উনিশ শতকের ঢাকাকে জানার জন্য এ বই এক আকর গ্রন্থ। বইটি পড়ে মুগ্ধ হয়েছি যে একজন সিভিল সার্জন তার পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কীভাবে একজন সমাজ বিশ্লেষকের মতো, ঐতিহাসিকের মতো একটি বৃষ্টির জনপদের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি লোটাচার জীবনযাত্রা জীবন্ত চিত্র এমন বিশ্বস্ত দলিল আকারে তুলে ধরতে পারেন।
আরেকটি বই পড়েছি কয়েক মাস আগে, আমাদের সমসময়ের এক কবির আত্মজীবনী। বইটির নাম ‘আবুলকান্দাঢেউ’। আত্মজীবনীকার সত্তরের দশকের কবি দুখু বাঙাল। পঞ্চাশের দশকে দক্ষিণ বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলে জন্মগ্রহণকারী এই কবির ছেলেবেলা থেকে শুরু করে সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ পর্যন্ত বিচিত্র ঘটনা প্রবাহ তুলে ধরেছেন প্রাঞ্জল ভাষায়।
এই আত্মজৈবনিক রচনায় কেবল নিজের কথা তিনি বলেননি তার পরিপাশের কথা বলেছেন, ষাট-সত্তর দশকের বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি এবং বিচিত্র মানুষের ছবি প্রতিফলিত হয়েছে কবি দুখু বাঙালের আত্মজৈবনিক এই রচনায়। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে কয়েকটি এপিসোড বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। সম্ভবত কিশোর মাসিক নবারুণে একটি এপিসোড আগেই পড়েছিলাম। পরবর্তীকালে তিনি বিস্তারিত করেছেন তার স্মৃতি। ‘আমার মা’ অধ্যায়টি কবির অস্তিত্ব বিকাশের উৎসের সন্ধান দেয় পাঠকদের। শৈশবে ভাষা আন্দোলনের যে স্মৃতি গ্রামে বসে অর্জন করেছেন তার ওপরে একটি অধ্যায় লিখেছেন ‘ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি ও আমার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত শহিদ মিনার’। ১৯৬৯ সালে গ্রামের স্কুলে শহিদ মিনার প্রতিষ্ঠার স্মৃতিচারণ করেছেন তিনি। আমার স্মৃতিতে বাউফলের মুক্তিযুদ্ধ শিরোনামের অংশটিতে একাত্তরের বাউফল জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
আমার কলেজ জীবন, ঢাকা গমন ও সরকারি পদে যোগদান, প্রশিক্ষণের যাত্রা, পুলিশ একাডেমিতে এক বছরের বন্দিত্ব, চাটগাঁপর্ব থেকে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পূর্ণ হলো ভালো মানুষ আর ভালো ওসি দেখার সাধ, চট্টগ্রাম গণহত্যা ও শেখ হাসিনা, লোমহর্ষক চট্টগ্রাম গণহত্যা, পথের কাহিনি ও খুলনায় আগমন এভাবে একের পর এক ছোট ছোট অধ্যায় সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, সন্দ্বীপ, নড়াইল, মাগুরা ইত্যাদি জেলায় এবং থানায় দায়িত্ব পালনের স্মৃতির মধ্য দিয়ে তিনি আসলে যত না বলেছেন নিজের কথা, তার চেয়ে বেশি বলেছেন সময়ের কথা। অবসর জীবন এবং হজ পর্ব নিয়ে কিছু কথা বলেছেন দুটি অধ্যায়ে। গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে পুলিশের প্রতিবাদ দিক নিয়ে কিছু কথা শিরোনামে ৩০৪ পৃষ্ঠায় যে অধ্যায়টি শুরু এখান থেকে গ্রহণীয় অনেক কিছু আছে আমাদের পুলিশ বিভাগের। শেষ অধ্যায়টি খুলনার তপোবনে।
দুখু বাঙাল নিজের কবিসত্তার কথা বিক্ষিপ্তভাবে বলেছেন। কবি-সাহিত্যিকদের সান্নিধ্যের কথা কিছু কিছু এসেছে। কিন্তু একজন কবির আত্মজীবনীর চেয়ে তিনি যেন তার কর্মজীবন বর্ণনাতেই বেশি সময় দিয়েছেন। সব মিলিয়ে বইটি আমার ভালো লেগেছে।
প্রায় দুই বছর আগে বইটি হাতে পেয়েছি। আলোচনা অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করেছিলাম। খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বই। ‘উপনিবেশবাদ ও বাঙালির সংস্কৃতি’ এই বইটির লেখক হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন। যিনি একজন সংস্কৃতিবান মানুষ এবং বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সিনিয়র সচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে অবসরে গিয়েছেন বেশ কয়েক বছর আগে। বইটি আলোচনার জন্য সে সময়ে চোখ বুলিয়েছিলাম মাত্র। সম্প্রতি বইটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়া শুরু করেছি। অসাধারণ একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ হিসেবে এটি পিএইচডি থিসিস বলেও বিবেচিত হতে পারত, যদি তিনি এ বিষয়ে পিএইচডি গ্রহণের ইচ্ছা করতেন।
সংস্কৃতি ও বাঙালির বিশ্বজনীন সংস্কৃতি, বাঙালির সংস্কৃতি মানবিকতার আবহমান ধারা, উপনিবেশবাদ: বাংলা-ভারতে উপনিবেশের প্রতিষ্ঠা, উপনিবেশের লুণ্ঠন ও রাষ্ট্রীয় দুর্বৃত্তায়নের সংস্কৃতি, মন্বন্তরের উপনিবেশ রাষ্ট্রযন্ত্রের দায়িত্বহীনতার সংস্কৃতি, হেস্টিংসের অভিশংসন-মেট্রোপল লন্ডনে বিবেক চর্চার সংস্কৃতি, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত: আর্থ-সামাজিক দুর্বৃত্ত আইনের সংস্কৃতি, নীল-আফিম : অনৈতিক বাণিজ্যের সংস্কৃতি, সংগঠিত সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ইংরেজি ভাষার অধিষ্ঠান দেশীয় ভাষার অধস্তনতার সংস্কৃতি ইত্যাদি বিচিত্র শিরোনামে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন আলোচনা করেছেন উপনিবেশবাদ এবং বাঙালির সংস্কৃতির নানা দিক নিয়ে। সঙ্গে প্রাসঙ্গিক দলিল পত্র ছবি মানচিত্র বইটিকে অসাধারণ প্রামাণ্যতা দিয়েছে। জার্নিম্যান বুকস থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ৪০০ পৃষ্ঠার। এই বইটি এক অসামান্য সংগ্রহ বলে বিবেচনা করি আমি।
এই বইটি পড়া শুরু করেছি। শেষ হলে বিস্তারিত আলোচনা লেখার কথা ভাবছি। এসব পড়ালেখার বাইরে সম্প্রতি কিছু ছড়া লিখেছি, একটি গল্পের খসড়া তৈরি করেছি এবং কবিতা তো আহার-নিদ্রার মতোই নিয়মিত কাজ। মোটামুটি মাসে চার-পাঁচটি কবিতা লেখা হচ্ছে।
সময়ের আলো/আআ