আধুনিক কথাসাহিত্যে ভাষারীতি, বিষয় ভাবনা, আঙ্গিক

সরকার মাসুদ

সাহিত্য

এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অস্টেন থেকে মার্গারেট ড্র্যাবল পর্যন্ত অগুনতি লেখক ফর্ম বা আঙ্গিকের দিক থেকে প্রায় নিখুঁত।

2026-07-24T11:28:27+00:00
2026-07-24T11:28:27+00:00
 
  শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬,
৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬
সাহিত্য
আধুনিক কথাসাহিত্যে ভাষারীতি, বিষয় ভাবনা, আঙ্গিক
সরকার মাসুদ
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬, ১১:২৮ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অস্টেন থেকে মার্গারেট ড্র্যাবল পর্যন্ত অগুনতি লেখক ফর্ম বা আঙ্গিকের দিক থেকে প্রায় নিখুঁত। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে দেখি, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, জগদীশ গুপ্ত, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, সমরেশ বসু, শওকত ওসমান, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, সৈয়দ শামসুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, অমর মিত্র, শহীদুল জহির, স্বপ্নময় চক্রবর্তীসহ আরও অনেক লেখক রীতিমতো আঙ্গিকচেতন। এ চেতনার প্রথম আধুনিক রূপায়ণ, আমাদের এখানে, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর হাত দিয়ে ঘটলেও পঞ্চাশের দশকে তার কিছুটা প্রসার ঘটে এবং বিশেষভাবে ষাটের প্রজন্মের কথাকারদের মাধ্যমে তা বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে। 

দেশি-বিদেশি এ লেখকদের জীবনদৃষ্টি কম-বেশি গভীর। রচনারীতিতে তারা প্রায় ত্রুটিহীন এবং সমুজ্জ্বল। বিষয়বস্তু নির্বাচনের বেলায় এ লেখকরা উদার ও নতুনতাসন্ধানী। এসব ভালো দিক থাকা সত্ত্বেও উল্লিখিত সময়কালের অন্তর্ভুক্ত বেশিসংখ্যক লেখক আমাদের ‘প্রিয় লেখক’ হতে পারেননি। প্রধানতম কারণ তাদের কথাসাহিত্য ভাষার প্রসাদগুণ থেকে বঞ্চিত। কথাসাহিত্যিক মাত্রই কথাশিল্পী নন। কেবল তারাই কথাশিল্পী যাদের গল্পভাষা সংকেতঋদ্ধ, প্রতীকী, স্বপ্ন কল্পনাময়। স্বচ্ছতা অবশ্যই ভাষার বড় গুণ। কিন্তু কেবল স্বচ্ছতা, সহজগম্যতা ও পরিচ্ছন্ন জীবনদৃষ্টি এক খণ্ড রচনাকে আধুনিক করে তোলে না। সেই লেখাকে একালের উপযোগী হতে হলে তাতে থাকা চাই অজস্র ইশারা সংকেত এবং কাব্যের বর্ণচ্ছটা।

যে এজরা পাউন্ড কবিতার বা কথাসাহিত্যের গঠনপ্রকৃতি সম্বন্ধে ‘ভবিষ্যদ্বাণীর ঊর্ধ্বে’ কথাটি বলেছিলেন, তিনিই এ মর্মে প্রশ্ন তুলেছেন যে, বিশ্বসাহিত্য অধিকাংশ বড় মাপের কাজ কি আঙ্গিকসংশ্লিষ্ট বড় ধরনের নিরীক্ষার অনুপস্থিতির জন্য উল্লেখ্য নয়? পাউন্ডের এ প্রশ্নের ভেতরে ভাষাস্বচ্ছতার ও বিষয়বস্তুর ওজনের স্পষ্ট ইঙ্গিত বিদ্যমান। ডি এইচ লরেন্স, সমারসেট মম, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, মাহমুদুল হক প্রমুখ লেখকদের গল্প/উপন্যাস আমাদের প্রিয় কেন? কারণ এদের লেখা নিরীক্ষাপ্রধান নয়। এসব লেখকের বলার কথাটি পরিষ্কার এবং এদের ভাষাসচ্ছলতা ধারণ করছে বিষয়বস্তুর ওজন ও গাম্ভীর্য। এক খণ্ড গল্প বা উপন্যাস তখনই গুরুত্ববহ হয় যখন তার ভাষারীতি ও কলাকৌশল সেই রচনাটির বক্তব্যবস্তুকে ছাপিয়ে না যায়। একটি সাহিত্যকর্মের মহৎ কিংবা খুব উৎকৃষ্ট হয়ে ওঠার সঙ্গে তার খারাপ দিকগুলোর পরিমাণের বিষয়টি সম্পর্কিত। কেননা কোনো শিল্পকর্মই ত্রুটিমুক্ত বা নিখুুঁত নয়। তা ছাড়া কায়দাদুরস্ত লেখকরা বানানো কিংবা জটিল ব্যাপার-স্যাপারে অভ্যস্ত হয়ে যান। ফলে সহজে বা কম আয়াসে অর্জনযোগ্য বহু কিছুকে তারা অবজ্ঞা করেন। এর পেছনে নতুন সমালোচক গোষ্ঠীর প্ররোচনা কাজ করে থাকে। এ সমালোচকবৃন্দ আঙ্গিককে ও শৈলীর নৈপুণ্যকে সাহিত্য মূল্যায়নের প্রধানতম মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করেন। ফলে বিষয়বস্তুর ও জীবনদৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব ভীষণভাবে উপেক্ষিত হয়। সাধারণ সচেতন পাঠক অবশ্য সেসব লেখা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন যেগুলো ক্ষেত্রে আঙ্গিকের কিংবা শৈলীর অভিনবত্ব অনিবার্য নয়।

যে শিল্পকলা তার বিষয়বস্তুর চেয়ে নিজেকে নিয়েই বেশি ব্যস্ততা শেষ পর্যন্ত নিষ্ফল ও গুরুত্বহীন। লরেন্স, কাফকা, মার্কেজ, দেবেশ রায় বা হাসান আজিজুল হক আমাদের এত প্রিয় কেন? কারণ তারা বলার কায়দার চেয়ে বলার কথাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। অবশ্যই সাহিত্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করে তার বিষয়বস্তুর উৎকর্ষ অন্তর্নিহিত স্থায়ী মূল্য গুরুত্ব। সুতরাং হেনরি জেমস যে বলেছিলেন, ‘কোনো লেখকের যখন বিশেষ কিছু বক্তব্য থাকে না তখনই সে ভঙ্গির দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে’, এটি খুবই খাঁটি কথা। মজার ব্যাপার, এই হেনরি জেমসই কিন্তু আঙ্গিকের দৃষ্টিকোণ থেকে ডস্টয়ভস্কি ও টলস্টয়কে ‘তরল পুডিং’ বলে অভিহিত করেছেন, যদিও লেখক হিসেবে তারা দুজনেই জেমসের চেয়ে বহুগুণ শ্রেষ্ঠ। বক্তব্যবস্তুকে জেমসও কম মূল্যবান মনে করতেন না, তা সত্ত্বেও এ কথা সহস্রবার প্রমাণিত। আবার লক্ষ করুন যে এজরা পাউন্ড তার গ্রন্থ আঙ্গিকের নীতি প্রচার করেছেন চরমভাবে, সেই তিনিই নামধারী ভার্সগুলোতে জীবনের গভীর ও বিচিত্র অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেছেন,  যা আমাদের কাছে আড়াল করতে পারেনি তার আঙ্গিক ও লিপিকৌশল। আমি এখন বাংলাভাষার তিনজন কথাসাহিত্যকের নাম বলব- কমলকুমার মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শহীদুল জহির। তিনজনই গল্প বলিয়ে হিসেবে সেরা এবং তাদের পৃথক পৃথক বৈশিষ্ট্য অবশ্যই আছে। আমাদের কাছে যে বিষয়টি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয় তা হচ্ছে, এ কৃতী লেখকদের বক্তব্য তাদের আঙ্গিকের বা রচনাভঙ্গির দ্বারা চাপা পড়েনি। এ তিন সাহিত্যিকের লেখা আমাদেরকে চমৎকৃত করে, কিন্তু আমরা এটিও বেশ বুঝতে পারি তারা কী বলতে চান।


রচনারীতি নিয়ে দুই-চার কথা বলব এবার। ভাষার প্রসঙ্গ অবশ্যই আসবে। কেননা লিপিকৌশল আসে ভাষার ওপর ভর করেই। আর ভাষা হচ্ছে সাহিত্য নামক শকটের চাকা। ভেতরে হৃদয়কে নাড়া দেওয়ার মতো বিষয়বস্তু আছে কিন্তু ভাষা অনাকর্ষণী ও নড়বড়ে- এমন সাহিত্যকর্ম কি আমরা পড়ে উঠতে পারি? আনাতোল ফ্রাঁস একবার বলেছিলেন, সব শ্রেষ্ঠ লেখক খারাপ ইংরেজি বা ‘খারাপ ফরাসি’ লিখেছেন। এ কথার অন্তর্নিহিত অর্থ কি এটাই নয় যে, জীবনকে যদি কেউ নানাদিক থেকে প্রতিফলিত করতে চায় তা হলে তাকে খরাপভাবে লিখতেই হবে? ‘খারাপ ফরাসি’ বা ‘খারাপ ইংরেজি’ বলতে ফ্রাঁস তো আসলে ভাষাভঙ্গির ব্যতিক্রমিতাকেই বুঝিয়েছেন। যে অগ্রসর পাঠকরা দেবেশ রায়ের ‘তিস্তা পারের বৃত্তান্ত’ কিংবা ‘খরার প্রতিবেদন’, টমাস পিনকনের বা শহীদুল জহিরের মুখের দিকে দেখি; পড়েছেন তারা আশা রাখি, ভাষার পাশাপাশি ভঙ্গির অপ্রচলতার বিষয়টি ভালো করে বুঝতে পারবেন। হ্যাঁ, নতুন আঙ্গিকের কিংবা নতুন ধরনের লিপিভঙ্গির আবিষ্কারকরা সত্যিকার গুরুত্বপূর্ণ লেখক। সেটি আমরা জেমস জয়েস থেকে জার্মান কথাকর পিটার বিকসেল পর্যন্ত অনেক লেখকের মধ্যেই দেখেছি। কিন্তু তারা একই সঙ্গে তাদের সাহিত্যকর্মে প্রযুক্ত বিষয়বস্তু উৎকর্ষের বা নতুনত্বের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা কি দেখিনি, শত শত গল্প/উপন্যাস চটকদারিত্ব ও নানা রকমের অভিনবত্ব সত্ত্বেও শূন্যগর্ভ? এ রকমটা কেন ঘটে? ঘটে এ জন্য যে, ওইসব রচনায় অনেক কিছুই আছে, কেবল নেই সেই ‘পদার্থ’ যা জীবনের বিচিত্র ও গভীর অভিজ্ঞতা থেকে উৎসারিত।

আগেও কিছুটা ছিল, কিন্তু বিশেষভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অসংখ্য লেখক অদৃষ্টপূর্ব কৌশলের এবং ফর্মের গবেষণায় মেতে উঠেছেন। দুটোই ক্লান্তিকর আর অর্থহীন বিষয়বস্তু সংবলিত। ফলে ওইসব রচনা শিল্পের চোরাবালিতে ডুবে গেছে। আমাদের ভুলে যাওয়া একবারেই অনুচিত যে, ফ্লব্যেয়রের মাদাম বোভারি চেকভের ‘চেরি অর্চার্ড’, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’ প্রভৃতি গ্রন্থ ভাষার ও আঙ্গিকের নিরীক্ষাকে সঙ্গে নিয়েই সেরা সাহিত্যকীর্ত, কারণ এসব লেখায় সর্বজনীন মানবিক টাইপ চিত্রিত হয়েছে। 

বিশেষ জাতির ও সভ্যতার ইতিহাসের পর্বও তুলে ধরা হয়েছে এসব অজর গ্রন্থ। আমি ভুলি নি যে, লরেন্স, গাট্টুড স্টাইন, ‘কাঁদো নদী কাঁদো’, ‘খরার বৃত্তান্ত’ দেবেশ রায় প্রভৃতি সাহিত্যকর্ম বিষয়বস্তুর সমধিক ওজন নিয়েই বিখ্যাত হয়ে আছে। অতএব আমরা সর্বদাই চাইব সেই ধরনের গ্রন্থ যেসবের বক্তব্য উল্লেখযোগ্য, একই সঙ্গে তার প্রকাশরীতিও নজরকাড়া।

সময়ের আলো/এসএকে


Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: