হুমায়ূন আহমেদকে কেবল একজন জনপ্রিয় লেখক বললে তার প্রতি এক ধরনের অবিচার করা হয়। তিনি ছিলেন বাঙালির মানসপটের এক নিপুণ চিত্রকর। বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে তিনি যখন বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় পা রাখলেন, তখন সাহিত্য ছিল এক ভারী আভিজাত্যের ভারে ন্যুব্জ। সংস্কৃত-ঘেঁষা গুরুগম্ভীর গদ্য আর দীর্ঘ বর্ণনার আড়ালে সাধারণ মানুষের আটপৌরে জীবনটা কোথাও যেন হারিয়ে গিয়েছিল। ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে তিনি কলম ধরলেন। তার গদ্যে কোনো মেদ ছিল না, ছিল না অলঙ্কারের অযথা ঝনঝনানি। তিনি যেন এক স্নিগ্ধ ঝরনার মতো শব্দ বুনে যেতেন। খুব ছোট ছোট বাক্য, অতি সাধারণ শব্দমালা অথচ তার গভীরতা অতলস্পর্শী।
একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণে সাহিত্যের ভূমিকা থাকে অপরিসীম। হুমায়ূন আহমেদ বাঙালির মধ্যবিত্ত জীবনকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তার ‘নন্দিত নরকে’ বা ‘শঙ্খনীল কারাগার’-এর পাতা ওল্টালে দেখা যায়, অতি তুচ্ছ ঘটনাগুলোও কীভাবে শিল্পের পরশে মহাকাব্যিক হয়ে উঠতে পারে। ডাইনিং টেবিলের সাধারণ আড্ডা, ভাই-বোনের খুনশুটি, বাবার মৃদু শাসন কিংবা মায়ের নীরব দীর্ঘশ্বাস এসবকিছু নিয়ে যে যাপিত জীবন, তাকে তিনি এক সম্মোহনী রূপ দিয়েছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বাঙালির ঘরটা আসলে একটা নীল রঙের কারাগার, যেখানে অনেক দুঃখ আছে, কিন্তু সেই দুঃখের মধ্যেও এক অদ্ভুত তৃপ্তি আছে। এই যে মধ্যবিত্তের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করেও তাকে ভালোবাসতে শেখানো, এটিই ছিল তার সাহিত্যের এক প্রধান দর্শন। সমালোচকরা হয়তো এখানে রাজনৈতিক চেতনার অভাব খুঁজেছেন, কিন্তু গভীর নিরিখে দেখলে বোঝা যায়, তিনি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক মুক্তির পথ প্রশস্ত করেছিলেন।
হুমায়ূন আহমেদের চরিত্র সৃষ্টির জাদুকরি ক্ষমতা নিয়ে কথা বলতে গেলে হিমু এবং মিসির আলীর কথা আসবেই। এই দুটি চরিত্র যেন বাঙালির মনোজগতের দুই বিপরীত মেরুর ধ্রুবতারা। ২০২৬-এর এই চরম যুক্তিনির্ভর পৃথিবীতেও হিমুর হলুদ পাঞ্জাবি আজও এক ধরনের আধ্যাত্মিক বিদ্রোহের প্রতীক। হিমু কোনো লক্ষ্য নিয়ে চলেনি, তার কোনো গন্তব্য ছিল না। সে ছিল আকাশের মেঘের মতো স্বাধীন। তার হাঁটার কোনো গন্তব্য নেই, অথচ সে পৌঁছে যায় হৃদয়ের গভীরে। হিমু চরিত্রটি আসলে জঁ-পল সার্ত্রের অস্তিত্ববাদের এক ভিন্নতর দেশীয় সংস্করণ। সেখানে মানুষ তার নিজের সারসত্তা নিজে নির্মাণ করে। অন্যদিকে মিসির আলী হলেন শুদ্ধ যুক্তি ও বিজ্ঞানের এক অটল দুর্গ। তিনি মানুষের অবচেতন মনের সেই অন্ধকার ঘরগুলোকে আলোর ঝিলিক দিয়ে উন্মোচিত করেন। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের জটিল তত্ত্বে যা বোঝা কঠিন, মিসির আলীর ছোট ছোট যুক্তিতে তা হয়ে ওঠে জলবৎ তরলং।
নাটক ও চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও তিনি এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন। আটের দশকে যখন টেলিভিশনের সামনে মানুষ উন্মুখ হয়ে বসে থাকত, তখন তা ছিল এক সামাজিক উৎসব। ‘এইসব দিনরাত্রি’ বা ‘অয়োময়’-এর মতো নাটকগুলো কেবল বিনোদন ছিল না, ছিল এক জীবনবোধের পাঠশালা। বাকের ভাইয়ের ফাঁসি ঠেকাতে রাজপথে মিছিল হওয়া এই ঘটনাটি পৃথিবীর শিল্প-ইতিহাসে বিরল। একটি কাল্পনিক চরিত্রের জন্য মানুষের এই যে হাহাকার, এটিই প্রমাণ করে যে লেখক মানুষের হৃদস্পন্দন কত গভীরে গিয়ে ছুঁতে পেরেছিলেন। চলচ্চিত্রের রূপালি পর্দায় তিনি যখন ‘আগুনের পরশমণি’ নির্মাণ করলেন, তখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যেন এক নতুন প্রাণ পেল। সেখানে কোনো বড় রণক্ষেত্রের গর্জন ছিল না, ছিল অবরুদ্ধ এক পরিবারের প্রতীক্ষা আর বৃষ্টির শব্দে মিশে থাকা এক অজানা আতঙ্ক। তিনি মুক্তিযুদ্ধকে দেখেছিলেন এক মানবিক বোধের উত্থান হিসেবে। ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ কিংবা ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ চলচ্চিত্রে তিনি আবহমান বাংলার
লোকসংস্কৃতি আর অবদমিত যন্ত্রণাকে যে শৈল্পিক সুষমায় ফুটিয়ে তুলেছেন, তা আজ বিশ্ব চলচ্চিত্রের আর্কাইভে এক অমূল্য সম্পদ।
ইতিহাসের প্রতি তার দায়বদ্ধতা ছিল এক নিরবচ্ছিন্ন গবেষণার মতো। ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ উপন্যাসটি কেবল এক কাল্পনিক আখ্যান নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জন্মের এক প্রামাণ্য দলিল। এখানে ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতে হেঁটেছে, আর তার পাশে পাশে হেঁটেছে সাধারণ মানুষের আবেগ। লেখক ইতিহাসকে কোনো নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে বন্দি না করে তাকে সাধারণের স্মৃতিতে রূপান্তর করেছেন। যুদ্ধের ভয়াবহতার চেয়েও যুদ্ধের সময় মানুষের টিকে থাকার লড়াই, এক ফালি জ্যোৎস্নার জন্য আকুতি এগুলোই তার লেখায় বেশি মূর্ত হয়ে উঠেছে।
হুমায়ূন আহমেদ কি কেবল জনপ্রিয়তার জোয়ারে গা ভাসানো একজন লেখক ছিলেন? সমালোচকদের এই প্রশ্নের উত্তর আজ সময় নিজেই দিচ্ছে। জনপ্রিয় হওয়াটা সহজ হতে পারে, কিন্তু সেই জনপ্রিয়তাকে দশকের পর দশক ধরে রাখা এবং এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সঞ্চারিত করা মোটেও সহজ কাজ নয়। তার লেখায় এক ধরনের হিউম্যানিস্ট বা মানবতাবাদী আবেদন ছিল। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে বৃষ্টিকে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে কদম ফুল দিয়ে বর্ষাকে বরণ করতে হয়। আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজে যেখানে প্রকৃতি থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, সেখানে তার এই প্রকৃতিপ্রেম আজ ‘ইকো-ক্রিটিসিজম’-এর এক অনন্য উদাহরণ। তিনি জানতেন, মানুষের মন যখন খুব একা হয়ে যায়, তখন প্রকৃতিই তার শ্রেষ্ঠ বন্ধু।
হুমায়ূন আহমেদের হাস্যরসের এক বিশেষ মহিমা ছিল। তার লেখায় হাস্যরস ছিল এক গভীর বেদনার প্রলেপ। তিনি জানতেন বাঙালি এক বিষণ্ন জাতি, আর এই বিষণ্নতাকে কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন এক চিলতে হাসি। তার চরিত্রগুলোর কৌতুকবোধ পাঠককে হাসাতে হাসাতে চোখের কোণে জল নিয়ে আসে। এই যে ‘ট্র্যাজিক-কমেডি’ শৈলী, এটিই তাকে বিশ্বসাহিত্যের বড় লেখকদের কাতারে আসীন করেছে। তিনি সমাজ পরিবর্তনের বড় বড় রাজনৈতিক তত্ত্ব দেননি ঠিকই, কিন্তু তিনি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছিলেন। তিনি শিখিয়েছিলেন জীবনকে ইতিবাচকভাবে দেখতে।
হুমায়ূন আহমেদ তার জীবনভর অসংখ্য দর্শন ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন অতি সাধারণ কথার মাধ্যমে। তিনি লিখেছিলেন, ‘মানুষের সব স্বপ্ন কি পূরণ হয়? হয় না। কিছু কিছু স্বপ্ন বাকি থাকাটা খুব জরুরি।’ তার নিজেরও হয়তো কিছু স্বপ্ন বাকি ছিল, কিন্তু তিনি আমাদের জন্য যে স্বপ্নের ভান্ডার রেখে গেছেন, তা শেষ হওয়ার নয়। তিনি শিখিয়েছিলেন জীবন মানে কেবল জয়ী হওয়া নয়, জীবন মানে হারের মধ্যেও সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া। তার সাহিত্যে কোনো তথাকথিত ‘ভিলেন’ নেই, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন প্রতিটি মানুষের ভেতরেই এক ধরনের সাদা-কালো টানাপোড়েন থাকে। এই যে মানুষের প্রতি তার অগাধ মমতা, এটিই তাকে অমরত্ব দিয়েছে।
হুমায়ূন আহমেদ কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের লেখক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক কালজয়ী মহীরুহ। তার কলম থেমে গেছে ২০১২ সালের ১৯ জুলাই, কিন্তু তার সৃষ্টি আজও প্রবহমান। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও আমরা অনুভব করি, তিনি আমাদের সঙ্গেই আছেন কখনো মধ্যরাতের জ্যোৎস্নায়, কখনো বর্ষার প্রথম কদম ফুলে, কখনো বা কোনো রহস্যময় ট্রেনের কামরায়। তিনি বাঙালির হৃদয়ে এমন এক আসন দখল করে আছেন, যা সময় কিংবা প্রযুক্তির কোনো পরিবর্তনের ফলেই মলিন হবে না। তার সেই ‘নীল পদ্ম’ বা ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ চিরকাল বাঙালির অস্তিত্বের অংশ হয়ে থাকবে। সময়ের প্রবাহে অনেক কিছু বিলীন হয়ে যায়, কিন্তু প্রকৃত সৃজনশীলতা নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল থাকে। হুমায়ূন আহমেদ সেই ধ্রুবতারা, যার আলো আমাদের পথ দেখাবে অনাগত বহুকাল।
‘জীবন হলো পেন্সিলে আঁকা ছবির মতো, যার অনেক কিছুই মোছা যায় না।’ তিনি তার লেখনী দিয়ে বাঙালির মনে এমন এক ছবি এঁকে গেছেন, যা মোছার ক্ষমতা কারোরই নেই। তিনি আমাদের একাকিত্বের পরম বন্ধু, আমাদের হাসির কারিগর এবং আমাদের শোকের আশ্রয়। তার মহাপ্রয়াণ ঘটেনি, কারণ লেখক তো মরে না, তিনি কেবল এক জগৎ থেকে অন্য জগতে স্থানান্তরিত হন। তার শব্দগুলো অমরত্বের সুধায় সিক্ত হয়ে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে স্পন্দিত হচ্ছে আজ এবং আগামী দিনগুলোতেও। তিনি কেবল একজন লেখক ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাঙালির আত্মার এক নিঃশব্দ কারিগর।
সময়ের আলো/এসএকে