আল মাহমুদের কবিতায় বাংলাদেশ

ফরিদ আহমদ দুলাল

সাহিত্য

বাংলাদেশের কাব্যভূগোলে আল মাহমুদের কৃতি এবং অবস্থান নিয়ে বলতে বসে দুই ধরনের পরস্পরবিরোধী মনোসংযোগ কখনো দ্বিধায় ফেলে বটে; কিন্তু একজন

2026-07-17T18:53:20+00:00
2026-07-17T18:53:20+00:00
 
  শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬,
২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
সাহিত্য
আল মাহমুদের কবিতায় বাংলাদেশ
ফরিদ আহমদ দুলাল
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬, ৬:৫৩ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বাংলাদেশের কাব্যভূগোলে আল মাহমুদের কৃতি এবং অবস্থান নিয়ে বলতে বসে দুই ধরনের পরস্পরবিরোধী মনোসংযোগ কখনো দ্বিধায় ফেলে বটে; কিন্তু একজন কবি হিসেবে আল মাহমুদকে অগ্রাহ্য করার স্পর্ধা দেখার সাহস হয় না কখনোই এবং এ সত্য স্বীকার করে নিয়েই বর্তমান আলোচনা।

বলে রাখা ভালো, আল মাহমুদ বাংলা কবিতার আকাশে এক অনিবার্য জ্যোতিষ্ক। প্রবল প্রভাববলয় সৃষ্টিকারী এ কবির উত্থান পঞ্চাশের দশকে। তার সমসাময়িককালের যারা প্রতিনিধিত্বকারী কবি, তাদের অনেকেই বাংলা কবিতার উজ্জ্বল নক্ষত্র। তুলনা করে কে আগে আর কে পরে, সে কথা বলার অবকাশ নেই। কালপ্রবাহে কার অবস্থান কোথায় হবে, সে কথা বলারও সুযোগ নেই।

সন্দেহ নেই কবি আল মাহমুদ তার কাব্যজীবন শুরু করেন প্রাগ্রসর চিন্তার প্রতিনিধি হয়েই, তার কবিতায় আমরা দ্রোহ-প্রতিবাদ পড়ি, পড়ি গভীর প্রেম এবং রোমান্টিকতা। তার কবিতায় রোমান্টিকতা পড়তে মনোযোগ দিতে পারি-

স্মাগলার আলোচক সম্পাদক তরুণীর দল,
           কবিতা বোঝে না কোনো সং
অভিনেত্রী নটিনারী নাটের মহল
            তার মনে কতটুকু রং?
            ও পাড়ার সুন্দরী রোজেনা
সারা অঙ্গে ঢেউ তার, তবু মেয়ে
            কবিতা বোঝে না।

আল মাহমুদের প্রস্তুতি মাটি থেকে, সমকালের মানুষ- পরিপার্শ্ব থেকে, প্রকৃতি-পরিবার থেকে; প্রাতিষ্ঠানিক পাঠের চেয়ে সে প্রস্তুতি স্বতন্ত্র মাত্রায় উজ্জ্বল হওয়াই সংগত।

পঞ্চাশের দশক বাঙালির বোধোদয়ের দশক। স্বপ্নভঙ্গ এবং নতুন স্বপ্ন রচনার পথে এগিয়ে চলার দশক। বাঙালির ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছার দশক। মায়ের মুখের ভাষার জন্য বাঙালি রাজপথ রঞ্জিত করে এ দশকেই, ভাষা আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ পলকেই ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে; বাংলা কবিতায় তার প্রভাবও পড়ে প্রবলভাবে। আল মাহমুদের কবিতাও সেখানে ব্যতিক্রম নয়। আল মাহমুদ তখন লিখলেন-

তাড়িত দুঃখের মতো চতুর্দিকে স্মৃতির মিছিল
রক্তাক্ত বন্ধুদের মুখ উত্তেজিত হাতের টংকারে
তীরের ফলার মতো
নিক্ষিপ্ত ভাষার চিৎকার
বাঙলা, বাঙলা
কে নিদ্রামগ্ন আমার মায়ের নাম উচ্চারণ করো?
অথবা...
ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ দুপুরবেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে বৃষ্টি কোথায় বরকতের রক্ত
হাজার যুগের সূর্যতাপে জ্বলবে এমন লাল যে
সেই লোহিতেই লাল হয়েছে কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে;

৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি লেখেন-
ট্রাক ট্রাক ট্রাক
শুয়োরমুখো ট্রাক আসছে
দুয়ার বেঁধে রাখ।
.......................................

ট্রাকের মুখে আগুন দিতে
মতিউরকে ডাক।
কোথায় পাবো মতিউরকে
ঘুমিয়ে আছে সে
তোরাই তবে সোনা-
মানিক
আগুন জ্বেলে দে।

সন্দেহ নেই আল মাহমুদ মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন, সে সময় তিনি লেখেন-
আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে
হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে
নদীর কাছে গিয়েছিলাম, আছে তোমার কাছে?
হাত দিও না আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে।

আল মাহমুদের কবিতায় তার পরিপার্শ্বের মানুষ আর সাধারণ মানুষের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে বারবার ঘুরেফিরে। কয়েকটি পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করছি-

ক.
আমার মাথার জন্য অশ্রুসজল আবেদনে কাঁপছে
ভ্রমরকৃষ্ণ একজোড়া চোখের পাতা;
তার সন্তানদের কেউ যেন ‘বেঈমানের বাচ্চা’ না বলে।
দূর মফস্বল শহরের এক দুর্বল বৃদ্ধা
তার সান্ধ্য প্রার্থনায় জায়নামাজ বিছিয়েছে;
প্রভু আমার ছেলের ঘাড় পাথরের মতো শক্ত করে দাও।
সাবধান আমার মাকে কেউ যেন গোলামের গর্ভধারিণী না বলে!

খ.
গালিগালাজের ঢেউ টলমলায় আমার উঠোনে
আমারে ভাসিয়ে নেয় খাদ্যলোভী ক্ষোভের কাতারে
সাপের অঙ্গের মতো ভঙ্গি ধরে টান মারে, মিছিলে রাস্তায়।
সাহস দেখো না মিয়া, শহরে আগুন দিতে আহে, ঐ
বে-তমিজ গাঁওয়ের পোলারা
দিল বাইন্ধা বাস গাড়ি মোটর দোকান
গোলমালের কারিগর ইটা মারে মুরুবির গায়।
সাহস দেখো না মিয়া বে-তমিজ বান্দির পুতেরা
মাইনষের লওয়ের মতো হাঙ্গামার নিশান উড়ায়।

কবি আল মাহমুদের সোনালি কাবিন (১৯৭৩) বাংলা কবিতার জগতে তাকে এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে। বাংলার পাঠকসমাজ সোনালি কাবিনে পড়েছেন লোকবাংলার সাধারণের বুকের আকুতি; কেউ পড়ে, কেউ আবার না পড়েও তার কবিতার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন অন্যের মুখে শুনে শুনে। সোনালি কাবিন কাব্যের ‘শিরোনাম’ কবিতাগুচ্ছে লোকায়ত বাংলার গ্রামীণ জীবনের যে শাশ্বত চিত্র বাক্সময় হয়েছে প্রতি পঙ্ক্তিতে, এখানে তার উল্লেখ করতেই সোনালি কাবিন কাব্য থেকে কয়েকটি পঙ্ক্তি উদ্ধৃতি দিচ্ছি-

ক.
বৃষ্টির দোহাই বিবি, তিলবর্ণ ধানের দোহাই
দোহাই মাছ মাংস দুগ্ধবতী হালাল পশুর
লাঙল জোয়াল কাস্তে বায়ুভরা পালের দোহাই
হৃদয়ের ধর্ম নিয়ে কোন কবি করে না কসুর
কথার খেলাপ করে আমি যদি জবান নাপাক
কোনোদিন করি তবে হয়ো তুমি বিদ্যুতের ফলা।
খ.
বধূবরণের নামে দাঁড়িয়েছে মহামাতৃকুল
গাঙের ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল, কবুল।
গ.
আমার চুম্বনরাশি ক্রমাগত তোমার গতরে
ঢেলে দেবো চিরদিন মুক্ত করে লজ্জার আগল
এর ব্যতিক্রম বানু এ মস্তকে নামুক লানৎ
ভাষার শপথ আর তোমার কাব্যের শপথ।

আল মাহমুদের কাব্যভাষা আর উপস্থাপনশৈলীর অভিনবত্বে তিনি হয়ে উঠলেন স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। কাব্যাঙ্গনের প্রভাববিস্তারী কবি। কবি আল মাহমুদের কাব্য অভিযাত্রার দিকে যদি আমরা তাকাই দেখব, কবির প্রথম কাব্য ‘লোক লোকান্তর’ প্রকাশিত হয় ১৩৭০ বঙ্গাব্দে, অর্থাৎ ১৯৬৫ সালে। এরপর ‘কালের কলস’ ১৯৬৮ তে, তার জনপ্রিয়তম কাব্য ‘সোনালি কাবিন’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৩-এ। পর্যায়ক্রমে প্রকাশিত হয়েছে তার ‘মায়াবী পর্দা দুলে উঠো’, ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’, ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’, ‘আরব্যরজনীর রাজহাঁস’, ‘একচক্ষু হরিণ’ এবং অতঃপর ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’, ‘আমি, দূরগামী, দোয়েল ও দয়িতা’, ‘সেলাই করা মুখ’ ইত্যাদি।

যে কবি একদা উচ্চারণ করেছিলেন নিচের পঙ্ক্তিগুলো-
সোনালি খড়ের স্তূপে বসতে গিয়ে প্রত্যাগত পুরুষ সে-জন
কী মুশকিল দেখল যে নগরের নির্ভাজ পোশাক
খামচে ধরছে হাঁটু।

উরতের পেশি থেকে সোজা অতদূর কোমর অবধি
সম্পূর্ণ যুবক যেন বন্দি হয়ে আছে এক নির্মম সেলাইয়ে।

২. শ্রমিক সাম্যের মন্ত্রে কিরাতেরা উঠিয়েছে হাত
হিয়েনসাঙের দেশে শান্তি নামে দেখ প্রিয়তমা,
এশিয়ায় যারা আনে কর্মজীবী সাম্যের দাওয়াত
তাদের পোশাকে এসো এঁটে দিই বীরের তকমা।
আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন,
পরম স্বস্তির মন্ত্রে গেয়ে ওঠো শ্রেণির উচ্ছেদ,
প্রথম প্রেমের বাক্য সাহসিনী করো উচ্চারণ
যেন না ঢুকতে পারে লোকধর্মে আর ভেদাভেদ।
তারপর তুলতে চাও কামের প্রসঙ্গ যদি নারী
ক্ষেতের আড়ালে এসে নগ্ন করো যৌবন জরদ,
শস্যের সপক্ষে থেকে যতটুকু অনুরাগ পারি
তারও বেশি ঢেলে দেব আন্তরিক রতির দরদ,
সলাজ সাহস নিয়ে ধরে আছি পট্টময় শাড়ি
সুকণ্ঠি কবুল করো, এ অধমই তোমার মরদ।

বাংলা কাব্যভুবনের প্রভাববলয় সৃষ্টিকারী কবিপুরুষ আল মাহমুদ ‘লোক লোকান্তর’, ‘কালের কলস’, ‘সোনালি কাবিন’ থেকে ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’, ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’, ‘আরব্যরজনীর রাজহাঁস’, ‘একচক্ষু হরিণ’ অথবা ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’ লিখে ধর্মীয় আদর্শের দিকে নিজের কবিতার বাঁক বদল করেন। একজন কবি তার ধর্মবিশ্বাস থেকে ধর্মীয় সংস্কৃতি, ধর্মীয় আদর্শ-মূল্যবোধ প্রচারে উৎসাহী হতেই পারেন। কিন্তু পঞ্চাশের শক্তিধর কবি আল মাহমুদ যে বাংলাদেশকে তার হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন, তার প্রমাণ পাই তার কবিতার পঙ্ক্তিতে।

রাজনীতি এবং চেতনাগত কারণে আল মাহমুদকে কিছু বিতর্ক তো আছেই, আমি বরং বলি আল মাহমুদ অমীমাংশিতই থাকুন সময়ের অচলায়তনে। এই অচলায়তন যেদিন ভাঙবে, যেদিন সূর্যালোক ঢুকবে আমাদের মগজের কোষে কোষে, যেদিন কূপমণ্ডূকতার অন্ধকার দূর হয়ে যাবে; সেদিন নিশ্চয়ই দ্বিধা-সংশয়ের আড়াল সরিয়ে আলো আর অন্ধকারে পার্থক্য চূড়ান্ত হয়ে যাবে। কবি আল মাহমুদও সেদিন তার পক্ষপাতদুষ্ট ভক্তকুলের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলার আপামর কাব্যানুরাগী পাঠকের অন্তরে নিজস্ব ঠিকানা খুঁজে পাবেন এবং তা পাবেন কবি তার কবিতার শক্তিতেই।

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   আল মাহমুদ  কবিতা  বাংলাদেশ  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: