এই ঘুম চেয়েছিলে বুঝি

সানাউল্লাহ সাগর

সাহিত্য

গতকাল থেকে কেয়ার ফোন বন্ধ। ফোন কখনোই এত সময় বন্ধ থাকে না। এমনকি ক্লায়েন্টের সঙ্গে থাকলেও সে কখনো ফোন বন্ধ

2026-07-17T18:41:49+00:00
2026-07-17T18:41:49+00:00
 
  বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৮ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সাহিত্য
এই ঘুম চেয়েছিলে বুঝি
সানাউল্লাহ সাগর
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬, ৬:৪১ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
গতকাল থেকে কেয়ার ফোন বন্ধ। ফোন কখনোই এত সময় বন্ধ থাকে না। এমনকি ক্লায়েন্টের সঙ্গে থাকলেও সে কখনো ফোন বন্ধ রাখে না। রাত ১১টার দিকে ছোট করে এক লাইনের ম্যাসাজ দিয়ে রাখল, ‘তাড়াতাড়ি ফোন দিস।’ রাতে ভালো ঘুম হয়নি।

কেয়ার প্রতি যে সহানুভূতি ছিল তা মনপুরা ঘুরে আসার পর থেকে আস্তে আস্তে ভালোবাসায় রূপ নিচ্ছিল। টের পাচ্ছিল বুকের মধ্যে কেয়ার জন্য একটি ছোট ঘর তৈরি হয়েছে। যেখানে অতি যত্নে শোভা পাচ্ছে কেয়ার সঙ্গে কাটানো সুন্দর মুহূর্তগুলো। অপেক্ষা করছিল সুযোগ বুঝে একদিন বলে দেবে মনের কথাগুলো।

Advertisement
সকাল ৯টার দিকে হৃদয় মিরপুরে চলে গেল। কেয়ার বাসায় হৃদয় একবারই গিয়েছিল। কয়েকজন মেয়ে মিলে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকে। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, গত দুদিন ধরে কেয়া বাসায় আসেনি। কেউ জানে না কোথায় গেছে।

ফুটপাথ ধরে মিরপুর-১০-এর দিকে হাঁটছিল। মাথায় হাবিজাবি চিন্তা। হঠাৎ হৃদয়ের মোবাইলে একটি ফোন এলো। ফোন রিসিভ করতেই ওপ্রান্ত থেকে তটস্থ প্রশ্ন, আপনি কি সাথি আক্তারের পরিচিত কেউ?
হৃদয় অবাক, না তো এই নামে কাউকে আমি চিনি না।

‘তার নোটবুকে আপনার নম্বর পেয়েছি। আপনিই তো হৃদয় চৌধুরী নাকি?’
‘হু। কিন্তু... আপনি কোথা থেকে বলছেন?’
‘আপনি কি একটু ঢাকা মেডিকেলে আসতে পারবেন?’

হৃদয় বুঝতে পারছিল না কী করবে। এমনিতে দুদিন থেকে কেয়ার খোঁজ পাচ্ছে না। তারপর আবার এই অদ্ভুত ব্যাপার। কিন্তু ঢাকা মেডিকেলে কেন যাবে! তারপরও কী ভেবে যেন রাজি হয়ে যায়, ‘আচ্ছা, আসছি।’
‘তাড়াতাড়ি আসেন’ বলে লোকটি ফোন কেটে দিল।

ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছাতে ১ ঘণ্টা ২৩ মিনিট লাগল। স্টাফ এসে বলল, ‘এই যে সাথি আক্তারের পরিচয়পত্র। দেখেন তো চিনতে পারছেন কি না?’
সবার জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি যেমন থাকে এটাও তেমনই, অস্পষ্ট, অপুষ্টিতে ভোগা রোগীর মতো। তবু চিনতে পারল, সাথি আক্তারই কেয়া।

জানতে চাইল, ‘এটা আপনি পেলেন কোথায়?’
স্টাফ বলল, ‘গতকাল রাত থেকে এই মেয়েটির মৃতদেহ মর্গে পড়ে আছে। কোনো আত্মীয়স্বজন না পাওয়ায় আমরা মৃতদেহ ছাড়তে পারিনি।’
‘মৃতদেহ মানে?’

স্টাফ স্বাভাবিক গলায় বলে যায়, মেয়েটির পার্সে রাখা ছোট ডায়েরির প্রথমে জরুরি প্রয়োজনে লেখা স্থানে আপনার নম্বরটি পাই।

হৃদয় দাঁড়ানো থেকে বসে পড়ে। ঢাকা শহরে এত অসহায় এর আগে কখনো লাগেনি। যখন পকেটে টাকা ছিল না। দুই বেলা না খেয়ে কেটেছে তখনও এতটা একা লাগেনি। কেয়ার সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকে জানত, ঢাকা শহরে একজন মানুষ আছে যার ওপর চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়। সে মানুষটি আজ আর বেঁচে নেই। জীবনের অপর পৃষ্ঠায় চলে গেছে। 

হৃদয় অপেক্ষা করছে কখন পোস্টমর্টেম হবে। আইনি প্রক্রিয়া শেষ হবে। তারপর কেয়াকে গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাবে।
কারও হাতের স্পর্শে তার ঘোর কাটল। মুখ তুলে তাকিয়ে দেখল, অপরিচিত কেউ। সে হৃদয়কে উঠে দাঁড়াতে নিষেধ করল। চোখ-মুখ ফোলা তার। বোঝা যাচ্ছে ঘুম হয়নি। কান্নার দাগ এখনও গালে লেগে আছে। লোকটি তার কাঁধে হাত রাখল। সে মাথা তুলে হৃদয়ের তাকিয়ে বলল, ‘আমার ছেলে...’

হৃদয় চমকে উঠল! যেন অতিপরিচিত তার। যার কাছে দুঃখ শেয়ার করা যায়। লোকটি কথা শেষ না করেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। হৃদয় তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন এই দুঃখ তারও পরিচিত। যেন তারই দুঃখ এটা। তার কান্না কেঁদে দিচ্ছে লোকটি। সে একটু থেমে চোখ মুছে আবার বলা শুরু করল, এটা পুলিশের কাজ। তারাই গুলি করেছে। এখন উল্টাপাল্টা বোঝাচ্ছে।

হৃদয় কিছু বুঝতে পারছিল না। তার শান্ত শিশুর মতো সরল মুখের দিকে তিনি তাকিয়ে রইল। লোকটি একটু থেমে আস্তে আস্তে করে বলল, ‘আমার ছেলে আর আপনার বউ একই স্থানে মারা গেছে।’

হৃদয়ের বলতে ইচ্ছা করল, না কেয়া তার বউ না। হয়তো বললেও লোকটি বিশ্বাস করবে না। হৃদয় চুপ করে রইল। সে বলতে থাকল, গতকাল পল্লবীতে গার্মেন্টস শ্রমিকরা আন্দোলন করছিল তাদের বকেয়া বেতন আদায়ের জন্য। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল অবরোধকারী বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা। তাদেরকে সরাতে পুলিশ প্রথমে লাঠিচার্জ করেছে। তাতে কাজ হয়নি। তারপর শুরু হয় পুলিশের হামলা। আন্দোলনকারীরাও পাল্টা হামলা করে। আর এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয় আমার ছেলে।

কথা শেষ করে আবার হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে সে। হৃদয় হা হয়ে শুনতে থাকে। প্রশ্ন তৈরি হয় কেয়া ওখানে কী করছিল? সরলভাবে প্রশ্ন করে, আপনার ছেলে গার্মেন্টসে চাকরি করে?
লোকটি বলে, ‘না। ওর কি চাকরি করার বয়স হইছে? কেবল এগারো বছর...’ 

লোকটি আবার কান্না শুরু করল। হৃদয় ভাবছে, তারও কি কান্না করা উচিত? হয়তো! কিন্তু তার কান্না পায় না। কিছুতেই বুঝতে পারছে না কেমনে এসব হলো! আস্তে করে তার দিকে তাকিয়ে বলে, কেয়াও চাকরি করত না। তারপর তারা কেউ কোনো কথা বলে না। দুজনেই চুপ করে বসে থাকে। দীর্ঘক্ষণ ধরে বসে থাকে।

হৃদয় তাকে আর কোনো প্রশ্ন করেনি। বলার প্রয়োজন বোধ করেনি। বরং বুকের ভেতরেই কেয়াকে অনুভব করেছে সবসময়। বিশেষ করে মনপুরা থেকে ফিরে আসার পর থেকে। আইনি প্রক্রিয়া চলছে। পোস্টমর্টেম শেষ হলেই রওনা দিতে হবে। কেয়ার জন্য একটা অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করা হয়েছে।

বিকাল ৫টার দিকে সব প্রক্রিয়া শেষে কেয়ার মৃতদেহ হস্তান্তর করা হলো। তার চোখের সামনে পড়ে আছে নিথর এক দেহ। তীব্র ইচ্ছে থাকার পরও তার চুপ হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকাতে পারছে না। অথচ সেই মুখ কত কথা বলত। জীবনের প্রতি কত দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তার। সবচেয়ে প্রিয় কথা ছিল, একটাই তো জীবন। কীসের এত টেনশন? নো টেনশন, শুধু ফুর্তি।
কোনো আন্দোলনে তার আগ্রহ ছিল না। ভরসা ছিল না কোনো রাজনৈতিক দলের ওপর। তার লড়াই ছিল রুটি-রুজির। তার আগ্রহ ছিল, নিজের ঘৃণিত পরিচয় বাতিল করে নতুন করে জীবন সাজানোর প্রতি। জীবনে কখনো কোনো মিছিলে যায়নি।

মর্গে দাঁড়িয়ে হৃদয়ের মনে হয় সে সত্যিকার অর্থেই একজন ব্যর্থ মানুষ। ভালোবাসতে ব্যর্থ, প্রকাশ করতে ব্যর্থ, রক্ষা করতেও ব্যর্থ। তাদের শেষ দেখা হয়েছিল এক কফিশপে। কেয়ার মুখে কথার খই ফুটেছিল সেদিন। সে এমনিতেই এলোমেলো কথা বলে। এটা ভালো লাগত হৃদয়ের। সেদিন কেয়া বলেছিল, ‘জানিস, আমার জীবনের কিছু স্বপ্ন আছে তোকে একদিন বলব। তুই সঙ্গে থাকবি কিন্তু। জানি সঙ্গে থাকবি তাও বললাম।’

হৃদয় অস্থির হয়ে বলল, ‘কী স্বপ্ন? বল।’
‘না, এখন বলব না।’
‘কেন?’
‘আমি একটু গোছানোর চেষ্টা করছি। আরেকটু আগাই তারপরে বলব।’ 
‘আচ্ছা। অপেক্ষায় রইলাম।’

হৃদয় বুঝেনি সেটাই শেষ দেখা হবে। কেয়ার স্বপ্নের কথা আর জানা হবে না হৃদয়ের। সেদিন কেয়া জানত না হৃদয় একা দাঁড়িয়ে থাকবে তার মৃত শরীরের পাশে। বুকে জমা থাকবে হাজারো অপূর্ণ প্রশ্ন। এখন একটাই দায়িত্ব তাকে তার নিজের ভিটেয় নিয়ে যাওয়া। ফ্রিজিং ভ্যান চলছে। গন্তব্য কেয়ার গ্রামের বাড়ি, পিরোজপুরের তেসদাসকাঠী। কখনোই পিরোজপুর যাওয়া হয়নি হৃদয়ের। তারপরও এখন সেই অচেনা-অজানা তেসদাসকাঠী গ্রামে যেতে হবে তার। সেই বাড়িটায় কেয়া বড় হয়েছে। যে গাছের হাওয়ায় আবার শৈশবে ফিরে যাবে কেয়া! পৃথিবীর সব ওজন যেন হৃদয়ের মাথায়। সে স্থির হয়ে আছে। কিংবা অস্থির। তুমুল এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে বরফ আবৃত কেয়ার রন্ধ্রে রন্ধ্রে...।

সময়ের আলো/আআ
  বিষয়:   সাহিত্য  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: