ছোট্ট খরস্রোতা নদীটা যেখানে বাঁক নিয়েছে, তার ঠিক তীর ধরেই শুরু হয়েছে আরশিনগর গ্রাম। সত্যিই গ্রামের নামখানি সার্থক, দর্পণ নগরই বটে!
প্রকৃতি যেন তার সব সৌন্দর্য, প্রাণপ্রিয় গ্রামটির ওপর দুহাত ভরে ঢেলে দিয়েছে। তিরতির করে বয়ে চলা নদীর পরেই লাল মাটির সরু রাস্তা। গ্রামটিতে এখনও অগ্রগতির ছোঁয়া খুব একটা স্পর্শ করেনি। বড় যানবাহন এখনও এই রাস্তায় নিজের অস্তিত্ব প্রকট করেনি। তাই গ্রামটি অনেকটাই দূষণমুক্ত। লালমাটির রাস্তা দিয়ে দুয়েকটা বাইক চোখে পড়ে, সংখ্যায় তাও খুব কম। দুপাশে পলাশ, কৃষ্ণচূড়া, দেবদারু গাছেরা যেন তাদের সৌন্দর্যের প্রাচুর্যে মুড়ে রেখেছে সমগ্র পথ। কিছুদূর গেলেই শুরু ছোট ছোট মাটির কুঁড়েঘর। সুন্দর করে নিকানো উঠোনে রঙ-বেরঙের পাখিরা চড়ে বেড়াচ্ছে স্বাধীনভাবে। তাদের রঙিন পাখনার ওপরে সূর্যের আলো পড়ে ঝিকিমিকি সৃষ্টি করেছে। ফলে, মাটিতেই যেন রামধনু সৃষ্টি হয়েছে। বিকেলের রামধনুর আকাশ যেন আরশিনগরের প্রভাতের উঠানগুলোর নরম মাটিতে নেমে আসে। চারিদিক জুড়ে এক অপার স্নিগ্ধতা বিরাজ করে। চারপাশে তাকালেই শান্ত সবুজ বনানী। অদূরে খেজুর গাছগুলোতে রস সঞ্চয়ের জন্য যে মাটির হাড়ি বাঁধা হয়েছে, প্রথমে দেখলে মনে হবে বাবুই পাখি যেন পরম যত্নে তার নিপুণ কুটিরশিল্পের বাসা বেঁধেছে সেখানে। পাখিদের মিষ্টি কলকল ধ্বনি শুনলে মনে হবে- নাহ্, জগতে শুধু কৃত্রিম শব্দই বর্তমান নেই, ঈশ্বর প্রদত্ত শব্দ এখনও আছে। এ যেন এক সুখ স্বর্গ!
এই গ্রামেই রয়েছে একটি আশ্রম, যা গ্রামের শোভা আরও অধিক বর্ধিত করেছে। আশ্রমের গুরু সকলের আদরের খুব প্রিয় নিশিকান্ত বাবু। নিশিকান্ত ব্যানার্জি এককালে পেশায় শিক্ষক ছিলেন। এই গ্রামের ছেলে নন তিনি। শিক্ষকতা করার সূত্রে এখানে একটি স্কুলে পড়াতেন। পূর্বে শহরতলিতে বাস ছিল তার। গ্রামের মানুষদের ভালোবাসার টানে সুন্দর গ্রামটিকে শেষ পর্যন্ত ছেড়ে যেতে পারেননি তিনি। তাই পরিবার নিয়ে এই স্বর্গ রাজ্যেই থেকে গেছেন। এখানে থেকে তিনি গ্রামের দুঃস্থ পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার জন্য তৈরি করেছেন তার প্রাণভ্রমরা আশ্রমখানি।
গ্রামের সকলের চোখের মণি নিশিকান্ত বাবু। গরিব বড়লোক সব মানুষের কাছে তিনি দেবতা। গ্রামের ছোট বড় সবাই তার সামনে শ্রদ্ধায় মাথা অবনত করে।
বয়স প্রায় ষাট ছুঁইছুঁই তার। তাও যেন অদম্য জীবনীশক্তি নিয়ে গ্রামের ছেলেগুলোকে মানুষ গড়ার কাজে ব্রতী হয়েছেন। যে শিক্ষাদানের কাজে নিজেকে তিনি নিয়োগ করেছেন, আজীবন তা অক্ষরে-অক্ষরে পালন করে চলেছেন।
নিশিকান্ত বাবুর একমাত্র মেয়ে কস্তুরী। অসম্ভব সুন্দরী দেখতে। যেমন রূপ তেমন গুণ। মা মরা মেয়েকে তিনি ভীষণ যত্নে, ততোধিক স্বাধীনচেতা হিসেবেই বড় করেছিলেন। তার মেয়ে যখন দশ বছর, তখন এক কঠিন ব্যাধিতে মার যান নিশিকান্ত বাবুর পত্নী। গ্রামের দুর্বল স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর জন্য বাঁচাতে পারেননি তাকে। তাই তার অপূর্ণ ইচ্ছে, এই গ্রামের চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত করা।
বাবার অত্যন্ত বাধ্য মেয়ে কস্তুরী। নিশিকান্ত বাবুর একমাত্র অবলম্বন সে। বাবার সঙ্গে আশ্রমের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার দিকটা মন দিয়ে সামলায়। বাবার কথা তার কাছে বেদবাক্য। সেই কস্তুরী প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম মেনেই প্রেমে পড়ল, গ্রামের অন্ত্যজ শ্রেণির অত্যন্ত মেধাবী ছেলে কৈলাশের। আরশিনগরের প্রত্যেকটি কোণ তাদের ভালোবাসার সাক্ষী থাকল।
ভালোবাসার স্রোতে হারিয়ে গেলেও, কৈলাশের মনে দুশ্চিন্তার মেঘ অশান্তির টুকরো কোলাজ সৃষ্টি করেছিল। কৈলাশ যেহেতু নিচু বংশের ছেলে, তাই নিশিকান্ত বাবু তাদের এই সম্পর্কটা হয়ত নাও মেনে নিতে পারেন। কৈলাশ বলেছিল, ‘আমি যেদিন শহর থেকে বড় ডাক্তার হয়ে ফিরে আসব, দেখবে সেদিন গুরুজি তোমাকে নিজে আমার হাতে তুলে দেবেন কস্তুরী। সেইদিন আর আমাদের মধ্যে কোনো শ্রেণিবিভেদ থাকবে না।’ কস্তুরীর মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, তার বাবা অন্য মানুষ। আর পাঁচজন যা করে, নিশিকান্ত বাবু তা করেন না। তিনি তাদের থেকে অনেক ব্যতিক্রমী। তাই তো তিনি অনন্য! তাই কস্তুরী বলেছিল, ‘আমার বাবাকে আমি চিনি গো। তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তিনি প্রেমের পূজারি। তিনি কখনও আমাদের ভালোবাসার অমর্যাদা করবেন না, দেখো।’ দুজনে এরপর পরম তৃপ্তিতে নিজেদের ভালোবাসার পরশ মেখে, ভবিষ্যৎ স্বপ্নে বিভোর হয়ে যেত।
তারা দুজন মিলে ঠিক করেছিল, গুরুজির আশ্রমটাকে আরও বৃহৎ করবে। গুরুজির অবর্তমানে তারা এই আশ্রমের পূর্ণ ভার গ্রহণ করে, অসহায় হতদরিদ্র মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াবে। আশ্রমের এক দিকে দুঃস্থ বাচ্চাদের কস্তুরী শিক্ষাদান করাবে, অন্যদিকে কৈলাশ ডাক্তারি পাশ করে এসে আশ্রমে বিনা পয়সায় চিকিৎসা করাবে। তারা তাদের আরশিনগরকে সুন্দর জীবনের আয়নার প্রতিচ্ছবি করে গড়ে তুলবে। তাদের আরশিনগর হবে এক স্বপ্ননগর।
এইভাবে প্রকৃতির নিয়ম মেনে দিন-মাস-বছর অতিক্রান্ত হয়। গ্রামের কারও মধ্যে কথাটা আর চাপা থাকে না। কিন্তু কথাটা কানাকানি হলেও, গুরুজির মেয়ে; তাই তার দিকে আঙুল তোলার অধিকার কারও নেই, সবাই মুখে কুলুপ এঁটে থাকে। অন্যদিকে, গুরুজিও নিজের স্বপ্নের কাজে এতটাই মশগুল থাকেন যে, এই সব অপ্রাসঙ্গিক দিকগুলো তার নজর এড়িয়ে যায়। তিনি ছাত্র গড়ার কাজে ব্রতী হয়েছিলেন, সেখানেই মন প্রাণ নিযুক্ত করেন।
অন্যদিকে, কৈলাশেরও সময় এসে যায় শহরে যাওয়ার। ডাক্তারির পড়া শেষ করতে কৈলাশ চলে যায় শহরে। বিরহের আগুনে পুড়তে থাকে দুজনেই। শহরে গিয়ে কৈলাশের পড়ার চাপ বেড়ে যায়। সে আর ভালো করে কস্তুরীকে সময় দিতে পারে না। অবশেষে চিঠি লেখা কমতে-কমতে মাসে একটা কি দুটোতে এসে দাঁড়ায়। কস্তুরী কৈলাশের ফিরে আসার দিন গোনে। দুজনের একসঙ্গে দেখা স্বপ্নপূরণের জন্য সে অপেক্ষায়, পাথরের মতো এক একটা দিন কাটাতে থাকে।
এর মধ্যে কৈলাশ গ্রামে এসে একবার ঘুরেও যায়। অনেক দিনের বিরহ যাপনের পর, তাদের দুজনের প্রেম বাঁধন ছাড়া হয়ে ভেসে যায়। কটাদিন যেন স্বপ্নের মতো কেটে যায়। কৈলাশ আবার নিজের গন্তব্যে ফিরে যায়। এই কদিনে কস্তুরী কৈলাশের মধ্যে অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করে। শহরের হাওয়ায় জাদু আছে বোধহয়। শহরের হাওয়া কৈলাশের মধ্যেও পরিবর্তন ঘটায়।
শহরে গিয়ে কৈলাশের ব্যস্ততা আবার বেড়ে যায়। এবার ফিরে গিয়ে তো দুমাস কোনো চিঠি লেখারই সময় পায়নি সে। মনের কষ্ট কস্তুরী একাকী বহন করে বেড়ায়।
এর কিছুদিন পর ঘটে যায় একটি অপ্রিয় ঘটনা! এবার যখন কৈলাশ আসে তারা দুজনে প্রেমের জোয়ারে ভেসে গিয়ে, একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল করে ফেলে! যার পরিণতিতে কস্তুরী সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়ে।
গুরুজি যখন এই সংবাদ শোনেন, মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে তার। সব শুনে তিনি প্রথমে গম্ভীর হয়ে যান। এলোমেলো চিন্তায় কী করবেন, দিশা পান না। অনেক ভেবে মাথা ঠান্ডা করে নিজের কন্যাকে তিনি বলেন, ‘তুমি যথেষ্ট বড় হয়েছ। আমি তোমাকে সব স্বাধীনতা দিয়েই মানুষ করেছি। কোনোরকম পরাধীনতা তোমাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাই তুমি আমার বিশ্বাসের এই মর্যাদা দিলে আজ! তোমরা পরিণত দুজন মানুষ যদি একটা সিদ্ধান্ত নাও, সেখানে আমার কিছুই বলার থাকে না। তবুও বলছি, সমাজের মুখ বন্ধ করার ক্ষমতা আমার নেই মা। অবিলম্বে এই অনাগত সন্তানের পিতাকে জানাও, তোমাকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য।’
এ যেন এক অন্য মানুষ নিশিকান্ত বাবু। সমাজে এমন মানুষ সত্যি বিরল! বাবাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে কস্তুরী। আকুল কান্নায় পিতার বুক ভাসিয়ে তার কাছে ক্ষমা চায় সে। বাবার আজ্ঞা পালন করতে, কৈলাশকে চিঠি লেখে সে, অবিলম্বে এখানে আসার জন্য জানায়। অন্যদিকে, কৈলাশ আসি আসি করেও অনেকদিন কাটিয়ে দেয়। এরপর গুরুজি নিজে কৈলাশকে আসতে বলে চিঠি লেখেন।
এইবার কৈলাশ আসে। সব ঘটনা শোনার পর সে জানায়, কদিন পরে এসে কস্তুরীকে নিজের পত্নীর স্বীকৃতি দেবে সে। হঠাৎ চলে এসেছে সে, তাই শহরে তার কিছু অপূর্ণ কাজ বাকি আছে, সেগুলো সারতে কিছু দিন সময় লাগবে তার। ফিরে এসে সে সব ব্যবস্থা করবে। কস্তুরীর মুখে একটু হাসি ফোটে এতদিনে। নিশিকান্ত বাবু নিশ্চিন্ত হয়। চিন্তার যে কালো মেঘ ঘনীভূত হয়েছিল, তা যেন আস্তে আস্তে সরে যায়। কিন্তু সব মেঘ সরে না; তারা লুকোচুরি খেলে আকাশের নীলিমায়।
শহরে গিয়েই কৈলাশ চিঠি লেখে কস্তুরীকে। সে লেখে, ‘আমার পক্ষে তোমাকে বিয়ে করা সম্ভব নয়, কস্তুরী। আমাকে ক্ষমা কোরো। আমি এখানে আমার এক সহপাঠী দিপাকে ভালোবাসি। আর কিছুদিন পর আমরা বিয়ে করে সংসার শুরু করব। তুমি দয়া করে আমাকে ভুলে যাও। আর ওই অনাগত ভ্রূণটাকে নষ্ট করে ফেলো। তুমিও নিজের জীবনে এগিয়ে যাও। আমি শহরের নামকরা ডাক্তার হতে চাই। ওই এঁদো গন্ডগ্রামে আমি আর ফিরতে চাই না। দিপার বাবা খুব বড় ডাক্তার। তিনি এই বিষয়ে আমাকে সাহায্য করবেন, আমাকে কথা দিয়েছেন। ভালো থেকো।’
চিঠিটা পড়ে কস্তুরী মাথা ঘুরে পড়ে যায়। গুরুজি পাশেই ছিলেন। এসে তাড়াতাড়ি মেয়েকে ধরে ফেলেন। মেয়েকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তিনি চোখে-মুখে জল দিলে জ্ঞান ফেরে কস্তুরীর। কিন্তু তীব্র আঘাতে নিশ্চুপ হয়ে যায় সে।
চিঠিটা রুদ্ধশ্বাসে পড়ে ফেলেন গুরুজি। তার কোমল সদাহাস্য মুখখানিতে শিরা-উপশিরাগুলো কঠিন শক্ত হয়ে জেগে ওঠে। মেয়েকে শক্ত করে আগলে ধরলেন তিনি। চিঠিটা টুকরো টুকরো করে ফেলে বললেন, ‘এখন ভেঙে পরার সময় নয় মা, শক্ত হও। তোমার এখনও অনেক লড়াই বাকি আছে। লড়াই করার জন্য প্রস্তুত হও। অপমানের যোগ্য জবাব তোমাকে দিতে হবে। আমি তোমার পাশে সবসময় আছি। শক্ত করে তোমার হাত ধরে থাকব। এই সন্তানের জন্ম তুমি দেবে। তোমার পরিচয়েই সে মানুষ হবে। সমাজও দেখুক, একা মা তার সন্তানকে মানুষ করতে পারে কিনা!’
এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ পঁচিশ বছর। আজ অনেকগুলো বছর পর ডাক্তার কৈলাশ, তার ডাক্তার পত্নীকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি ঘুরতে আসছে। সেই ঘটনার পর আর গ্রামে আসেনি সে। তার মা-বাবা গ্রামেই থাকতেন। শহরের বাড়িতে তাদের জায়গা হয়নি। বাবা মারা গেছেন বেশ কয়েক বছর হলো। তবুও একা মাকে গ্রামেই ফেলে রেখেছে কৈলাশ। মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠিয়ে সন্তান হওয়ার কর্তব্যটুকু পালন করে শুধু।
সকালের দিকে গ্রামে ঢুকেছে তারা। সেই লালমাটির রাস্তা আর নেই। সেই জায়গায় সরকারের তৈরি কালো পিচের রাস্তা অগ্রগতির শোভা বর্ধন করছে। সেই সুবাদে বাসও চলে দিনে বেশ কতগুলো। আগের চেয়ে বাইকের সংখ্যাও অনেক বেশি। সাইকেল আরোহী সেরকম নেই বললেই চলে। প্রথমে এসে একটু অবাকই হলো কৈলাশ। কত পরিবর্তন ঘটে গেছে গ্রামটার। অনেক পরিবর্তনের মাঝেও একটা জিনিস অপরিবর্তিত আছে, সেটা হলো প্রকৃতি! আজও প্রকৃতি তার ভালোবাসার ডালপালা বিস্তার করে আছে সমস্ত গ্রাম জুড়ে। একমাত্র প্রকৃতির কোনোরূপ বদল ঘটেনি। সে তার প্রিয় আরশিনগরকে ছেড়ে চলে যায়নি। বরং, নিজেকে আরও ভালোবাসার বাঁধনে বেঁধেছে।
সকালে এসে গ্রামে প্রবেশ করলেও, বিশ্রাম নিয়ে সস্ত্রীক বিকেলের দিকে গ্রাম দেখতে বেরোল সে। সেরকমভাবে আগের মানুষগুলো আর নেই। বেশিরভাগজনকেই নতুন লাগল তার। তবুও গ্রামের যে কয়েকজন পরিচিত মুখের সঙ্গে দেখা হলো, সবাই বেশ হাসি মুখে সম্মান দিয়েই কথা বললো তার সঙ্গে। পেশার কদর যে অনেক, জাতপাতকেও হার মানায়! অতীত ঘটনাও তখন মূল্যহীন হয়ে যায়। অতীত ইতিহাস আর কেউ না ঘেঁটে, তখন মানুষের বর্তমান অবস্থার চাকচিক্যের মোড়ক দেখে নিজের চোখ সার্থক করে।
ঘুরতে-ঘুরতে এক জায়গায় এসে থমকে গেল কৈলাশের পা জোড়া। সেই গুরুজির আশ্রম! কত বদলে গেছে। তবে সময়ের স্রোতে ফিকে হয়নি, বরং আরও বেশি উজ্জ্বলতা ধারণ করেছে। পুরনো আশ্রমের পরিবর্তিত রূপ অনেক বেশি চমকপ্রদ।
একবার ভাবল ফিরে যাবে। কিন্তু স্ত্রীর জোরাজুরিতে বাধ্য হলো মত পরিবর্তনে। ভেবে দেখল, গুরুজি আর নেই শুনেছিল। কস্তুরীও নিশ্চয় সংসারী হয়ে অন্য জায়গায় চলে গেছে। এইসব সাত পাঁচ ভেবে, পায়ে পায়ে তারা আশ্রমের ভিতরে প্রবেশ করল। ভেতরে ঢুকেই প্রথম চমকটা লাগল তার! আশ্রমের একদিকে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা। আগের মতো মাটিতে আসন নয়; শিক্ষার্থীদের আসন হয়েছে চেয়ার-টেবিলে। চারদিকেই উন্নত শিক্ষা দানের ছাপ সুস্পষ্ট। অন্যদিকে, একটু দূরে আশ্রম প্রাঙ্গণেই রয়েছে চিকিৎসার যাবতীয় সরঞ্জাম।
মুহূর্তেই যেন অতীত স্মৃতি মনে দোলা দিলো তার! এই ছবিটা তো খুব চেনা। তার আর কস্তুরীর মিলিত স্বপ্ন ছিল এটা! ঘোরের মধ্যে সে দেখতে পেল, বাচ্চারা পড়ছে, কিন্তু শিক্ষিকার আসনটা ফাঁকা। এরপর সে একাই চিকিৎসার দিকটায় গেল। তার স্ত্রী দিপা বাচ্চাদের সঙ্গে তখন আলাপে ব্যস্ত। গিয়ে দেখল, একটা অল্প বয়সী মেয়ে টেথোস্কোপ নিয়ে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। কী অপূর্ব দেখতে মেয়েটাকে। ঠিক যেন অল্প বয়সী কস্তুরীর মুখ বসানো। সেই মুখ, সেই নাক, সেই ঠোঁট। চোখটাই শুধু কস্তুরীর মতো নয়! কিন্তু এই চোখটা তো তার খুব চেনা। চমকাল কৈলাশ, এই চোখ তো আমার নিজেরই প্রতিচ্ছবি!
অবাক হয়ে দাড়িয়ে থাকল সে। এরপর মেয়েটির রোগী দেখা শেষ হলে, হঠাৎ কৈলাশের দিকে নজর পড়ল তার। অল্প হেসে বললো, ‘কিছু বলবেন? আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না। নতুন এই গ্রামে? বেড়াতে এসে গ্রাম দেখতে বেরিয়েছেন বুঝি?’
কৈলাশ এতক্ষণ ঘোরের মধ্যে ছিল। এবার ধীরে ধীরে বললো, ‘হ্যাঁ! না, মানে এই গ্রামেই বাড়ি আমার, কর্মসূত্রে শহরে থাকি। আমার স্ত্রীকে নিয়ে আজ অনেক বছর পর গ্রামে এসেছি। তুমি কে মা? তুমি কি এই গ্রামেরই মেয়ে?’
মেয়েটি বললো, ‘হ্যাঁ, আমি এই গ্রামের মেয়ে আংকেল। আমার নাম অনুমিতা ব্যানার্জি।’
‘তোমার বাবার নাম কি, বলো তো মা? দেখি, চিনতে পারি কিনা। অবশ্য, অনেক বছর গ্রাম ছাড়া তো, নাও চিনতে পারি।’
অনুমিতা বললো, ‘আমার বাবা নেই, আংকেল। আমার মা আমাকে একা মানুষ করেছেন। আমার মা একজন সিঙ্গেল মাদার। আর আমি তার নাম নিয়েই জন্মের পর থেকে বড় হয়েছি। আমার মা আর আমার দাদু গুরু নিশিকান্ত ব্যানার্জি আমাকে মানুষ করেছেন। এই আশ্রমটাও দাদুরই। ওনার স্বপ্ন ছিল, আশ্রমে গ্রামের মানুষদের জন্য শিক্ষা ও চিকিৎসা দুটোই থাকবে। যাতে গ্রামের মানুষ সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে। তাই আমি ডাক্তারি পাশ করে গ্রামের মানুষদের সেবা করি। আর আমার মা স্কুলটা সামলান। আমার পুরো নাম ডক্টর অনুমিতা কস্তুরী ব্যানার্জি।’
ডাক্তার কৈলাশ পটুয়ার চোখের সামনে নীল আকাশটা যেন দুলে উঠল! অতীত আজ তার সামনে। এবার কোথায় পালাবে সে! অতীতের করা অপরাধ, তার গায়ে এসে যেন আগুনের হল্কার পরশ মাখিয়ে দিলো।
কাঁপা কাঁপা স্বরে কৈলাশ বললো, ‘তোমার মা কোথায়?’
‘ওই তো!’ বলার সঙ্গেই অনুমিতা ঘুরে দেখল, তার মা কস্তুরী এসে দাঁড়িয়েছে।
কৈলাশ চোখ তুলে তাকাল কস্তুরীর দিকে। অতিকষ্টে কটা শব্দ বের করতে পারল সে, ‘ভালো আছো কস্তুরী?’
কস্তুরী ব্যানার্জির মুখে বাঁকা হাসি! মেয়েকে ওখান থেকে সরতে বললো না সে। ওরও আজ সবটুকু জানা দরকার। নিজের বিশ্বাসঘাতক পিতাকে চেনার অধিকার ওরও আছে।
কস্তুরী ব্যানার্জি বললো, ‘তুমি কাপুরুষের মতো যেভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করে, পিঠ বাঁচিয়ে, আমাকে একা ছেড়ে গিয়েছিলে, তার থেকে মরতে মরতে বেঁচে উঠেছি। ভালো না থাকলে হয় বলো! এই আমার মেয়ে! যেই ভ্রূণটাকে একদিন নষ্ট করতে বলেছিলে, সেই ভ্রূণটাই আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তোমার সামনে। তোমাকে পরিহাস করছে আজ, তোমার নিজের রক্তের সেই ছোট্ট ভ্রূণ! হেরে গেলে কৈলাশ পটুয়া! সেদিন কাপুরুষের মতো পিঠ বাঁচিয়েছিলে। আর আজ অপরাধীর মতো অপরাধের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছো। শুনেছি, তুমি নাকি নিঃসন্তান! ভগবান নাকি তোমাকে এই উপহার থেকে বঞ্চিত করেছেন! ওপরওয়ালা বলে কেউ আছেন, জানো! তিনি সব সুদে আসলে ফিরিয়ে দেন। কাউকে ফাঁকি দেন না। তুমি তো কোন ছার!’
কৈলাশ বললো, ‘আমাকে ক্ষমা করো, কস্তুরী। আমাকে ক্ষমা করো, অনুমিতা মা!’
এতক্ষণে অনুমিতা কথা বললো, ‘ক্ষমা শব্দটা বিশ্বাসঘাতকদের জন্য বরাদ্দ নয়। আমার ভাবতেও ঘেন্না হচ্ছে যে, আপনার মতো একজন মানুষের রক্ত আমার শরীরে বইছে, মিস্টার পটুয়া! এক্ষুনি এখন থেকে বেরিয়ে যান। আপনার মতো পাপী মানুষ আমার দাদুর আশ্রমে বেশিক্ষণ থাকলে, আশ্রমের মাটি কলুষিত হবে!’
কৈলাশ আর এক মুহূর্তও দাঁড়াতে পারল না ওখানে। নিজের রক্তের সন্তানের ঘৃণাভরা দৃষ্টির সামনে কোনো বাবাই দাঁড়াতে পারে না যে, তিনি যতই বিশ্বাসঘাতক হন না কেন!
কলকাতার নামি ডাক্তার পরাজিত নিঃসন্তান কৈলাশ পটুয়া, দৃষ্টি অবনত করে বেড়িয়ে গেল আশ্রমের মুক্ত দরজা দিয়ে।
মা মেয়ের সুখের আশ্রমে তার মতো বিশ্বাসঘাতকদের জন্য জায়গা নেই যে!
লেখক- শর্মিলা বর্মন
নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
সময়ের আলো/মহু