শ্রাবণে মেঘের দিন

রাকিবুল রকি

সাহিত্য

রবীন্দ্রনাথের খুব পরিচিত একটি গান আছে, যার প্রথম দুটো লাইন হলো-‘শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা, নিশীথযামিনী রে।কুঞ্জপথে, সখি, কৈসে যাওব অবলা

2026-07-31T14:09:23+00:00
2026-07-31T14:09:23+00:00
 
  শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬,
১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬
সাহিত্য
শ্রাবণে মেঘের দিন
রাকিবুল রকি
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬, ২:০৯ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
রবীন্দ্রনাথের খুব পরিচিত একটি গান আছে, যার প্রথম দুটো লাইন হলো-
‘শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা, নিশীথযামিনী রে।
কুঞ্জপথে, সখি, কৈসে যাওব অবলা কামিনী রে।’

শ্রাবণ মাসের বর্ষণসিক্ত রাতে বিরহী রাধার মনের আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে গানটি। মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলি দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ ব্রজবুলি ভাষায় রচনা করেছিলেন বেশ কিছু পদ। ভানুসিংহ নামে। তারই একটি পদের দুটো পঙ্ক্তি ওপরে উদ্ধৃত করা হয়েছে। কিন্তু এই গানের ব্যাখ্যা বা রাধার বিরহ ব্যথা নিয়ে আলাপের জন্যে পঙ্ক্তি দুটো উদ্ধৃত করিনি, উদ্ধৃত করার কারণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। ‘শাওন গগনে ঘোর ঘটঘটা’ শব্দবন্ধটা শুনলে এখন জাতির ওপর আসন্ন দুর্যোগের কথা মনে পড়ে। মনে হয়, এই দুর্যোগ পেরিয়ে কীভাবে কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছাব? এই মনে হওয়া হয়তো আমার সীমাবদ্ধতা। অথবা রবি ঠাকুরের গানের শক্তি।

আমাদের মতে, যে কবিতা বা গানের যতবেশি ‘মিসরিডিং’, সেই গান বা কবিতা ততবেশি শক্তিশালী। মিসরিডিং বলতে রচনার বহুরৈখিকতাকে বোঝাতে চাচ্ছি। এই বহুরৈখিকতা একটি গান বা কবিতাকে একেক জনের মনে একেক ধরনের ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। যাই হোক, রবীন্দ্রনাথ যে বাংলার শ্রাবণকে নিয়ে চব্বিশটি গান রচনা করেছেন, সেই বাংলা আজ ভালো নেই। আল মাহমুদের ভাষায় ‘নিষ্ফলা বাংলায়’ আজ অশুভ বজ্র এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছে, যার ফলে তারা পুড়িয়ে দিতে চায় বুনো বাতাসে উড়তে থাকা নীল শাড়ির আঁচল। তাই কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে হয়,
‘ঘোর ঘনঘটা ছাইল গগন
ভুবন গভীর বিষাদ মগন॥
নাহি রবি শশী নাহি গ্রহ তারা
নিখিল নয়নে শ্রাবণের ধারা
সৃষ্টি ডুবাল গো স্রোতের প্লাবন॥’

আরও পড়ুন

০২.
মাঝেমধ্যে- মাঝেমধ্যে নয়, প্রায়ই কবিতা দ্বিতীয় পাঠের সময় চুপ করে বসে থাকি। প্রথম পাঠে থাকে শুধু মুগ্ধতা আর রস আস্বাদন। তখন বাছবিচার নেই। কেবল পড়ে যাওয়া। না বুঝেই পড়ে যাওয়া। কিন্তু দ্বিতীয় পাঠে যখন বুঝতে যাই, খুঁজতে যাই ভালো লাগার রহস্য কী, কোথায় শব্দ প্রাণ পেয়ে ব্যঞ্জনার ডানা মেলেছে, তখনই ডানা ভাঙা পাখির মতো মুখ থুবড়ে পড়ি। ভাবতে ভাবতে নীড় যে খুঁজে পাই না, তা নয়, তবে সেটিই যে সঠিক নীড় তা জোর দিয়ে বলতে পারি না। তবে খুঁজে পাওয়া গন্তব্য ঠিক হোক বা বেঠিক, সেখানে ডানা গুটিয়ে বসতে সমস্যা হয় না। আরেকটু খোলাসা করে বলি। তার আগে চলুন পাঠ করি, সুনীলের অর্থাৎ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ভালোবাসা’ কবিতার প্রথম স্তবক।

‘ভালোবাসা নয় স্তনের ওপরে দাঁত?
ভালোবাসা নয় শ্রাবণের হা-হুতাশ?
ভালোবাসা বুঝি হৃদয় সমীপে আঁচ?
ভালোবাসা মানে রক্ত চেটেছে বাঘ!’

ভালোবাসাকে সুনীল নিজের মতো প্রশ্ন এবং উত্তর দিয়ে বুঝতে চেয়েছেন। কবিতাটি প্রথম পড়েছিলাম সেই কবে! সুনীলের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র বই কিনে মেহেদীর সঙ্গে গিয়েছিলাম ‘কালির বাজারে’ একটি পাইকারি মুদির দোকানে। দোকানদার যখন সদাই প্যাকেট করছিল, তখন মেহেদী বলল, বইটা দাও, সুনীলের একটা জটিল কবিতা দেখাই। মেহেদীর হাতে ব্রাউন পেপারে মোড়ানো সদ্যকেনা তুলে দিলে, কবিতাটা বের করে দেখায়। নিষ্কাম প্রেমের সিঁড়ি পেরিয়েছি, বেশি দিন হয়নি। 

তবে ভালোবাসার এমন কড়া প্রকৃতির সঙ্গে তখনও পরিচিত না। সুনীলের এত এত ভালো কবিতার ভিড়ে এই কবিতার ঠাঁই প্রথম পঙ্ক্তিতে হবে কি না জানি না, তবে সেদিন পড়ে যেমন ধাক্কা খেয়েছিলাম, তেমনই মুগ্ধ হয়েছিলাম। প্রথম পাঠে কবিতার অর্থ অনেকটাই ধোঁয়াশা ছিল। আসলে কবিতার সবটাই যে বুঝতে হবে, সেই দিব্যি কে দিয়েছে? এত এত মেয়ের ভিড়ে একজন বিশেষ মেয়েকেই কেন ভাল্লাগে, তার সমাধান কি কেউ দিতে পারবে? যাই হোক, এই কবিতার অর্থ খুব বেশি অবগুণ্ঠিত নয়। তারপরও এখনও ভাবি, দ্বিতীয় লাইনে যে সুনীল বলল, ‘ভালোবাসা শুধু শ্রাবণের হা-হুতাশ?’ 

ভালোবাসার হা-হুতাশাকে কেন শ্রাবণের সঙ্গেই তুলনা করল? কেন আষাঢ় অথবা ভাদ্রের বর্ষণের সঙ্গে নয়? তখন নিজের মতো করে কিছু উত্তর সাজাই, শ্রাবণের বর্ষণের যে তীব্রতা, তা আষাঢ়ের বা ভাদ্রের বর্ষণে নেই। আষাঢ় বর্ষার ঋতুর শুরু হলেও এখানে মেঘ-বৃষ্টি বড় চঞ্চলা। এই আসে, এই চলে যায়। ভালোবাসার মতো গভীরতা, দীর্ঘসূত্রতা আষাঢ় বা ভাদ্রের বৃষ্টিতে নেই। তাই বিরহের সহোদর হিসেবে বারবার কবিতা-গানে শ্রাবণের নামই উঠে আসে। এত সহজে কি ভোলা যায় মান্না দে বা কনক চাঁপার কণ্ঠে গীত নজরুলের সেই গান-
‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে’
বাহিরে ঝড় বহে, নয়নের বারি ঝরে।’

নির্মলেন্দু গুণকেও দেখি শ্রাবণের ঘোর বর্ষণে তার হারিয়ে যাওয়া প্রিয়াকে স্মরণ করছে, ভাবছে, তার প্রিয়া কার বিছানায় রজনিগন্ধা হয়ে ফুটেছে? তিনি লিখেছেন-
‘শ্রাবণ ঘন গহনমোহে, না জানি সেই প্রিয়া,
কার রজনিগন্ধা হয়ে ফুটেছে, ওফেলিয়া!’

শ্রাবণ যেন সেই স্পর্শ যা অতীত এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নকে জাগিয়ে তোলে। শ্রাবণের হাহাকার মনে দুরাশার রং ছড়িয়ে দেয়, মনে রটিয়ে দেয় আসন্ন ফাল্গুনেও প্রেয়সী আসবে না।
‘তুমি আসবে না
নিঃশব্দে নিঃসঙ্গ এই চেনা
বাগানের দরজা খুলে ফাল্গুনের বিহ্বল দুপুরে।’
(জর্নাল, শ্রাবণ : শামসুর রাহমান)

উদ্ধৃত তিনটি লাইনে শ্রাবণের কথা উল্লেখ নেই। নেই সম্পূর্ণ কবিতাতেও। কিন্তু কবিতার শিরোনামে যখন কবি লিখেছেন, ‘জর্নাল, শ্রাবণ’, তখন বুঝে নিয়ে কষ্ট হয় না, শ্রাবণের ঘোর বর্ষণই কবির মনে এই হা-হুতাশ জন্ম দিয়েছে। কবিগণ কখনো কখনো এভাবেও আমাদের জন্য নির্দিষ্ট পথ ধরে হাঁটার জন্য চিহ্ন ফেলে যান।

শ্রাবণের বৃষ্টি শুধু প্রেয়সীর জন্য মনকে আকুল করেই তোলে না, মনের মধ্যে তৈরি করে আরও বড় শূন্যতার আবাস। অবিরাম বর্ষণ মনকে এতটাই আচ্ছন্ন করে, একাকিত্বকে এমনভাবে প্রকটিত করে যে, জীবনের নশ্বরতার কথা মনে হয়, মনে পড়ে মৃত্যুর কথা। আল মাহমুদ লিখেছেন-
‘এক ধারাবর্ষণের সন্ধেবেলায় ভাবনা একটি
ভেজা পাতার মতো দুলতে লাগল।
কেন জানি মনে হলো, এসো মৃত্যুর কথা ভাবি।’

এই কবিতাতেও শ্রাবণের নামোল্লেখ্য নেই। তবে শিরোনাম ‘শ্রাবণ’ রেখে আল মাহমুদ বুঝিয়ে দিয়েছেন, ধারাবর্ষণের সেই সন্ধেটা ছিল শ্রাবণ মাসের।


০৩.
শ্রাবণ, শাঙন কিংবা শাওন- এই নামের মধ্যেই কেমন এক ঘোর আছে। জাদু আছে। আছে মেদুরতা। ‘রূপালী মানবী’ কবিতায় তাই সুনীল বলেন,
‘রূপালী মানবী, সন্ধ্যায় আজ শ্রাবণ ধারায় 
ভিজিও না মুখ, রূপালী চক্ষু, বরং বারান্দায় উঠে এসো’

সুনীল কেন রূপালী মানবীর ওপর এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, আমরা জানি না, তবে ‘শ্রাবণের বৃষ্টিতে রক্তজবা’ উপন্যাসে হুমায়ুন আজাদ দেখিয়েছেন, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আমলা মো. আবুল কাশেম হাওলাদার এক দিন শ্রাবণ রাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। শ্রাবণের বৃষ্টিতে ভিজে তিনি শুদ্ধতম মানুষ হয়ে ফিরে আসেন বাড়িতে। সঙ্গে করে নিয়ে আসেন দুটো রক্তজবা। একজন অবসরপ্রাপ্ত আমলার হাতে যেন রক্তজবা মানায় না। কিন্তু এই শ্রাবণের বৃষ্টিই তাকে নিয়ে গেছে প্রকৃতির সৌন্দর্যের কাছে। অবসরের পরে হাওলাদার সাহেবের প্রথম বৃষ্টিতে ভেজার অনুভূতি বোঝাতে গিয়ে হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন, ‘হঠাৎ তুমুল অনির্বাচনীয় বৃষ্টি নামে, প্রথমে যে বুঝতেও পারে না যে বৃষ্টি নেমেছে, যখন তার মনে হয় সে অবর্ণনীয় এক ধরনের সুখ বোধ করছে, যাতে তার সারা শরীর ভ’রে উঠছে, তখন চারদিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারে বৃষ্টি নেমেছে।’

শ্রাবণের বৃষ্টি এমন এক ঘোর তৈরি করে মনে, যার ফলে ‘শ্রাবণমেঘের দিন’ উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ কুসুমের মৃত্যুকে আরও বেশি জীবন্ত করে তোলার জন্য শ্রাবণের একটি বর্ষণসিক্ত ক্ষণকেই বেছে নিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, আকাশজোড়া শ্রাবণের মেঘ। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। মতি এবং সুরুজ মিয়া দুজনের চোখেই পানি। শ্রাবণ ধারার কারণে এখন আর এই চোখের পানি আলাদা করে চোখে পড়বে না।

নৌকা হাওড়ে পড়ল। বাতাসে বড় বড় ঢেউ উঠছে। নৌকা টালমাটাল করছে- মোবারক শক্ত হাতে হাল ধরে আছে। বৃষ্টি নেমেছে মুষলধারে। জ¦র, পরিশ্রম, আতঙ্ক এবং ক্লান্তি সব মিলিয়ে মতির ভেতর এক ধরনের ঘোর তৈরি হয়েছে। তার কেন জানি মনে হচ্ছে অপূর্ব গলায় কেউ একজন কাছেই কোথাও গাইছে-
তুই যদি আমার হইতি, আমি হইতাম তোর।’

শ্রাবণের বৃষ্টি ভেজা হাওড়ের বুকে কুসুমের মৃত্যুর পটমঞ্চ যেমন নির্মাণ করেছেন হুমায়ূন আহমেদ, তেমনি শ্রাবণের ভরা নদী দিয়ে ঘেরা এক ক্ষেতে এক কৃষককে মৃত্যুর জন্য বসিয়ে রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘সোনার তরী’ কবিতায়। মাঝেমধ্যে মনে হয়, ওই কৃষকের মাঝে কি রবীন্দ্রনাথ নিজেই নিজের মৃত্যু দিনের নকশা এঁকে রেখেছিলেন? নইলে কেন বাইশে শ্রাবণকে বেছে নিলেন তার প্রস্থানের সময় হিসেবে? কে দেবে এই প্রশ্নের উত্তর? জানা নেই।

সময়ের আলো/এসএকে



  বিষয়:   শ্রাবণ  মেঘ  দিন  সাহিত্য  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: