পড়ি নিয়মিতভাবে কবিতার বই। মনজুরে মওলা সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের কবিতা, ১৯৪৭-২০১৭’ সংকলনটির কবিতাগুলো আবারও পড়ছি। একজন কবি ও কবিতার পাঠক হিসেবে বাংলাদেশের কবিতার সুলুকসন্ধান ও বাজিয়ে নেওয়ার জন্য এমন কবিতার সংকলনগুলো মাঝেমধ্যে টেনে নিই এবং পড়ি। এই সঙ্গে উত্তম দাশ সম্পাদিত ‘বিশ্ববাংলা কবিতা’ সংকলনটির কবিতাও পড়ছি, এই সংকলনে পুরো বাংলা কবিতাসহ বর্তমানের বাংলাদেশ, আসাম ও ত্রিপুরা এবং বহির্বাংলা ও বহির্ভারতের বাংলা কবিতা রয়েছে, প্রায় এক হাজার পৃষ্ঠার বইটি।
এই সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে আমাদের জাতিসত্তা ও ইতিহাস নিয়ে অনেক ধরনের কথাবার্তা চালু আছে, সে কারণে ইতিমধ্যে গোলাম মুরশিদের লেখা ‘উজান স্রোতে বাংলাদেশ’ বইটির বিভিন্ন প্রবন্ধগুলো পড়ে ফেললাম। ‘উজান স্রোতে বাংলাদেশ’ বইটি প্রকাশিত হয়েছে ২০০৩ সালে, ঢাকার মাওলা ব্রাদার্স থেকে। বইটিতে রয়েছে সাতটি প্রবন্ধ। প্রবন্ধগুলোর শিরোনাম- ‘বাঙালিত্ব’, ‘স্বরূপের সংকট, না নব্য-সাম্প্রদায়িকতা’, ‘উজান স্রোতে বাংলাদেশ’, ‘ব্যক্তিপূজা বনাম গণতন্ত্র’, ‘আদর্শবাদ ও মানুষের সংকট’, ‘জানার অধিকার ও সৎ সাংবাদিকতা’ ও ‘মহিলারা ইদানীং’। বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৩৫।
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের ‘গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ’ গ্রন্থটি আমি পড়লাম আবারও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। আমার হাতে বইটির তৃতীয় পুনর্মুদ্রণ কপি, যা বাংলা একাডেমি থেকে জুলাই ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয়। বইটিতে বিভিন্ন প্রেক্ষাপট নিয়ে বিস্তৃতভাবে বিভিন্ন দিগন্ত উন্মোচিত করা হয়েছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে সংবিধান প্রণয়ন পর্যন্ত এ গ্রন্থের বিস্তৃত বিষয়। গবেষক, লেখক, শিক্ষাবিদ, আইনবিদ, রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ, ভাষাসংগ্রামী, অভিধান প্রণেতা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান দেশের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
লেখক ইতিহাসের ছাত্র ও শিক্ষক হওয়ার ফলে ইতিহাসের দৃষ্টিপথ দিয়ে প্রসারিত করেছেন এই এলাকার শতাব্দীর পর শতাব্দীর ইতিহাসলগ্ন ঘটনা, তথ্য, শাসন, যুদ্ধ, রাজ্য গঠন ও ভাঙন, মানুষের জীবন ও বহুবিধ প্রসঙ্গ। আর এসব প্রসঙ্গ পাঠকের ইন্দ্রিয়গোচরে নিয়ে এসেছেন দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরের বর্ণনায়! তা পাঠক হিসেবে আমাদের বিস্ময়াভিভূত করে, যা আমাদের ইতিহাসের কৌতূহল শুধু মেটায় না, চিন্তার খোরাকও জোগায়, বহুবিধ জিজ্ঞাসা এবং উত্তরও আমরা পাঠক হিসেবে খুঁজে পাই। এমন একটি গ্রন্থ- ‘গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ’।
উল্লিখিত দুটি বই পাঠ করার পর এই সিরিজের আরও কটি বই পাঠের তালিকায় রেখেছি- এর মধ্যে দুটি বই উল্লেখ করি- স্বপন বসু ও ইন্দ্রজিত চৌধুরী সম্পাদিত ‘উনিশ শতকের বাঙালিজীবন ও সংস্কৃতি’ এবং স্বপন বসু ও হর্ষ দত্ত সম্পাদিত ‘বিশ শতকের বাঙালি জীবন ও সংস্কৃতি’। জীব ও সমাজ ইতিহাস আমার অনেকটা আগ্রহের বিষয়, এসব বিষয়ে বেশ কিছু বই সংগ্রহে আছে, সেগুলোও মাঝেমধ্যে পড়ছি, সেই ধারার আর একটি বই আমার বিছানায় আরও কিছু বই ও সাময়িকীর সঙ্গে আছে, সেই বইটি হলো- প্রসাদরঞ্জন রায় ও আনন্দ ঘোষ হাজরার ‘জীব বিবর্তনের ইতিহাস’।
বই তো পড়ি- প্রতি সপ্তাহের দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীর লেখাগুলোতেও নিয়মিত দৃষ্টি দিই, কবিতাগুলো তো পড়ি, সেই সঙ্গে আমার পছন্দ মতো অন্যান্য লেখাও পড়ি। ‘কালি ও কলম’, ‘শব্দঘর’ ও ‘নতুন দিগন্ত’ নিয়মিত পড়ি, পড়ি আরও সাময়িকী ও লিটল ম্যাগ। ‘দেশ’-সহ বেশ কিছু পত্রিকা আমার সংরক্ষণে আছে সেগুলো থেকে কিছু কিছু টেনে নিয়ে আবারও পড়ি। অনলাইন থেকেও লেখা টেনে নিয়ে পড়ি, ইউটিউব থেকেও অনেক বিশিষ্টজনের বক্তিতা-সাক্ষাৎকার নিয়মিত শুনি, তা তো এক ধরনের পড়া।
পেশাগতভাবে এখন কোনো কাজ করছিনে, আড্ডা ও অনুষ্ঠানে যাওয়াও অনেকটা কমিয়ে দিয়েছি, এর ফলে এখন বেশ সময় পাচ্ছি। অনেকটা নিজেই একঘরে হয়ে সময় কাটাচ্ছি বেশ, ঢাকার যে এলাকায় ছিলাম, একনাগাড়ে পনেরো বছর, সেই এলাকা থেকে বেশ দূরে কোলাহল মুক্ত, প্রায় গ্রামীণ পরিবেশে, জল-হাওয়ার দূষণমুক্ত পরিবেশে, স্বেচ্ছা নির্বাসনে যেন এখন আছি, আর এই সুযোগে-আনন্দ, কৌতূহল আর বিস্ময়ঘোর নিয়ে পাঠস্পৃহা মিটিয়ে বোধের বিভিন্ন কূলকিনারা খুঁজতে চেষ্টা করছি! তবে কানে কানে বলে রাখি- এমন একান্ত সময় কাটানোর জন্য সংসার নির্বাহের জন্য জরুরি কাজের অবহেলার জন্য চাপ ও দোষেরও অংশী হতে হচ্ছে আমাকে!
আমি নিয়মিত কবিতা লিখছি। এর মধ্যে একটি কবিতা বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি করলাম। সেই সঙ্গে আমার একশ কবিতার ইংরেজি অনুবাদের পাণ্ডুলিপির কাজও শেষের দিকে। বিনীতভাবেই বলি- আমিও বুঝেছি কিশোর বয়সেই কবিতা লেখায় আমার ভবিতব্য। শুধু কবিতা লিখব বা লেখালেখি করব, এটাই ছিল জীবনের মূল লক্ষ্য। কিশোর বয়সেই অন্ধকারের দিগন্ত চিড়ে বুঝতে পেরেছিলাম, অনেক পথই হাতছানি দিচ্ছে, কিন্তু সেসব হাতছানি পরিহার করে কবিতার পথই থাকতে হবে আমাকে।
এই তো এখন মাঝেমধ্যে শুনতে হয় আমার জীবনসঙ্গীর কথা : ‘তুমি যদি কবিতা না লিখতে, তা হলে আরও বেশি বেতনের চাকরি করতে পারতে, টাকা-পয়সা হতো, গাড়ি-বাড়ি-ফ্ল্যাট আরও অনেক কিছু! না, তুমি এসবের দিকে তোমার যোগ্যতা থাকার পরও মনোযোগ দিলে না, সময় দিলে না!’ এক ধরনের হতাশার মধ্যে কাজ করে কি না, জানি না। তবে আমি মনে করি শুধু কবিতা লেখার জন্য দৃঢ় মনোবল নিয়ে, জিদ নিয়ে, ধারাবাহিকভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে সেই কিশোর বয়স থেকেই। বহু কিছু ছাড় দিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে একাকী অনেক গলিপথ-ঘুরপথ ঘুরেফিরে নিজেকে কবিতা বা লেখালেখির জন্য রক্ষা করতে হতে হয়েছে। কখনো কখনো উন্মাতাল সময়ের মুখোমুখি হয়েছি, কত রকমের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ করতে হয়েছে কিশোর বয়স থেকে আজ অবধি।
আমি যখন থেকে কবিতা লিখতে শুরু করি, তখন থেকে প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্য লেখাও শুরু করি। কবিতা ও প্রবন্ধ হাত ধরাধরি করে চলে যেন। নব্বই দশকে বহু কলাম দৈনিক পত্রিকায় লিখি, বিশেষত যখন ‘আজকের কাগজ’ জনপ্রিয় হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে। সেই সময়ে ছদ্মনামেও নিয়মিত গদ্য লিখেছি সাপ্তাহিক পত্রিকায়।
সাহিত্যবিষয়ক গদ্য তো বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় কম লিখিনি! এর মধ্যে ‘পাহাড়ের দেশে দেশে- পাহাড়ঘেষা খণ্ড খণ্ড চিত্র ও অনুভূতি’ শিরোনামের প্রায় আট হাজার শব্দের একটি দীর্ঘ ভ্রমণ গদ্য লিখে শেষ করেছি। আরও কিছু ভ্রমণ গদ্য লেখার প্রস্তুতিতে আছি। অন্যান্য আরও কিছু লেখা লিখতে অস্থির হয়ে আছি। কবে যে সেসব লেখা লিখে শেষ করব!
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও