পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি কম্পাউন্ডে ভয়াবহ হামলায় একাধিক আধাসামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন। আফগানিস্তানভিত্তিক পাকিস্তান তালেবান (টিটিপি) এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। সাম্প্রতিক কয়েক দিনের মধ্যে একই অঞ্চলে একাধিক হামলায় ২০ জনের বেশি প্রাণহানি, ইসলামাবাদ–কাবুলের মধ্যে চলমান নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
নিরাপত্তা সূত্র জানায়, বাজাউর জেলায় বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকালে সশস্ত্র একটি দল বিস্ফোরকভর্তি গাড়ি নিয়ে সারাই নওরাং এলাকার নিরাপত্তা ক্যাম্পের গেটে আঘাত করে। গাড়িটি গেটে পৌঁছানোর পরই শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের পরপরই একাধিক হামলাকারী কম্পাউন্ডের ভেতরে প্রবেশ করে এবং ভারী অস্ত্র দিয়ে গুলি চালাতে শুরু করে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, হামলাটি ছিল সমন্বিত এবং পরিকল্পিত। প্রথমে আত্মঘাতী বিস্ফোরণের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা দুর্বল করা হয়, এরপর দ্বিতীয় দফায় গুলিবর্ষণ শুরু হয়। এতে পুরো ক্যাম্পে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে গোলাগুলি চলে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনায় অন্তত ৮ থেকে ৯ জন পাকিস্তানি আধাসামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন। নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা অভিযানে হামলাকারীদের মধ্যেও অন্তত ১০ জন নিহত হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া আরও প্রায় ৩৫ জন নিরাপত্তা সদস্য আহত হয়েছেন, যাদের অনেকের অবস্থা গুরুতর।
স্থানীয় প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, ২০ কিলোমিটার দূরের বাজার এলাকাতেও অনুভূত হয়েছে। বিস্ফোরণের পর ক্যাম্পের অনেক ভবন আগুনে পুড়ে যায় এবং কিছু অংশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। পরে উদ্ধারকর্মী ও নিরাপত্তা বাহিনী এলাকা ঘিরে ফেলে অভিযান শুরু করে।
এ ঘটনার পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সীমান্তবর্তী অঞ্চলজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করেছে। আফগানিস্তান সীমান্ত ঘেঁষা রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং পুরো এলাকা ঘিরে তল্লাশি অভিযান চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সীমান্ত অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার অংশ। বিশেষ করে টিটিপির কার্যক্রম সাম্প্রতিক সময়ে আবারও বেড়েছে, যা পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এদিকে, সীমান্ত অঞ্চলে বারবার এমন হামলা ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে থাকা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক এরইমধ্যেই সন্দেহ ও উত্তেজনায় ভরা এবং এই ধরনের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রাণঘাতী হামলা বাড়ছে
পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক প্রাণঘাতী হামলা বাড়ছে। আফগানিস্তানভিত্তিক পাকিস্তান তালেবান (টিটিপি) এসব হামলার দায় স্বীকার করেছে। তারা আফগান সীমান্তের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক হামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি নিরাপত্তা ফাঁড়িতে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ, একটি পুলিশ পোস্টে গাড়িবোমা হামলা এবং একটি বাজারে বিস্ফোরণ। এসব ঘটনায় কয়েক দিনের ব্যবধানে ২০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া বাজৌরের ইনায়াত কিল্লি এলাকায় মর্টার শেল পড়ে তিনজন নিরাপত্তা সদস্য আহত হয়েছেন।
পাকিস্তানের কর্মকর্তারা বলছেন, আফগানিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সীমান্ত পার হয়ে হামলা চালাচ্ছে। তবে কাবুল এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। আফগান তালেবান ২০২১ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ক্রমেই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতি ধীরে ধীরে আন্তঃসীমান্ত সংঘর্ষে রূপ নেয়। এমনকি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এক পর্যায়ে এটিকে ‘উন্মুক্ত যুদ্ধ’ বলেও উল্লেখ করেন। ফেব্রুয়ারির পর থেকে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ বাড়তে থাকে, যদিও মার্চে একটি অস্থায়ী বিরতিতে সম্মত হয়।
তবে সেই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হয়নি। পরে আবারও বিক্ষিপ্তভাবে সহিংসতা শুরু হয়। গত মাসে চীনের মধ্যস্থতায় আলোচনার চেষ্টা হলেও কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা স্থায়ী সমঝোতা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, কার্যকর চুক্তির অভাব এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে পরিস্থিতি দ্রুত আবার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক ধারাবাহিক হামলা দুই দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ও শত্রুতা বাড়াচ্ছে।
এদিকে জাতিসংঘ জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই সীমান্ত সংঘর্ষে কমপক্ষে ৩৭২ জন আফগান বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ৪০০ জন আহত হয়েছেন, যা এই সংঘাতের ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
/ইউএমএইচ