নওগাঁর আত্রাই উপজেলায় সড়ক ও গাইডওয়াল (ব্রিক প্যালাসাইড) নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা বলছেন, ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে চলছে অনিয়মের মহোৎসব। উপজেলার আত্রাই নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত থলওলমা, ভাগসুন্দর ও বিশা গ্রাম। এ তিন গ্রামে কয়েক হাজার মানুষের বসবাস। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় তিন গ্রামের মানুষের চলাচলের মাটির সড়কের এখন বেহাল দশা। বর্ষা মৌসুম এলেই নদীর পানির চাপে মাটির সড়কটি ভেঙে যায়। ভ্যানও ঠিকমতো চলাচল করতে পারে না। কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারজাত করা সম্ভব হয় না। চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হয় এলাকাবাসীর। তাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, সড়কটি একদিন সংস্কার করা হবে। এলাকাবাসীর দুর্ভোগ নিরসনে অবশেষে গত ফেব্রুয়ারি মাসে গাইডওয়াল নির্মাণসহ সড়ক সংস্কারের কাজ শুরু হয়। কিন্তু কাজে ব্যাপক অনিয়ম করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ ঘটনায় থলওলমা, ভাগসুন্দর ও বিশা গ্রামের বাসিন্দাদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। এলাকাবাসীর দাবি, যথাযথভাবে তদারকির মধ্য দিয়ে কাজটি দ্রুত ও সঠিকভাবে সম্পন্ন করা হোক।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গাইডওয়াল (ব্রিক প্যালাসাইড) নির্মাণে সিমেন্টের খুঁটির সঙ্গে ১০ ইঞ্চির ইটের গাঁথুনি দেওয়া হয়েছে। ইটের গাঁথুনির ওপরে ১৫ ইঞ্চির ঢালাই দেওয়ার কথা থাকলেও সেখানে ৫ ইঞ্চির ঢালাই দেওয়া হয়েছে। কাজে সিমেন্টের পরিমাণ কম দেওয়ার পাশাপাশি খারাপ বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে গাইডওয়াল নির্মাণ করা হয়নি। এ ছাড়া গাইডওয়ালের নিচ থেকে গভীর করে মাটি কেটে সড়কের জন্য ভরাট করা হচ্ছে। এতে সড়কের গোড়ায় মাটি সরে যেকোনো সময় ধসে যেতে পারে। আবার যেখানে পানির চাপ সেখানে গাইডওয়াল না করে ফাঁকা রাখা হয়েছে। দায়সারাভাবে কোনো রকমে কাজ শেষ করার তোড়জোড় চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
আরও পড়ুন
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আত্রাই উপজেলা প্রকৌশলী নিতিশ কুমার বলেন, রাস্তাটি নওগাঁ জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প থেকে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিটুমিনাস কাজ করা হচ্ছে। শিডিউলে বাইরে থেকে মাটি নিয়ে এসে ভরাট এবং সাইনবোর্ড তৈরির কোনো বরাদ্দ নেই। এ কারণে সাইটের পাশ থেকেই মাটি কেটে সড়ক তৈরি করা হচ্ছে। তবে এতে সড়কের কোনো সমস্যা হবে না। সড়কটি তৈরি হলে গ্রামগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি অর্থনেতিক দিক দিয়েও এগিয়ে যাবে গ্রামবাসীরা।
অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযোগ অস্বীকার করে সাব ঠিকাদার গোলজার রহমান বলেন, কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম করা হয়নি। শিডিউল অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, গাইডওয়াল নির্মাণে অনিয়ম করা হয়েছে। নির্মাণকাজ শুরুর মাত্র দুদিনের মাথায় ফাটল দেখা দিয়েছিল। এলাকাবাসীর তোপের মুখে মাটি দিয়ে তড়িঘড়ি করে ফাটল ঢেকে দেয় ঠিকাদার। আবার প্রতিবাদ করলে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা খলিল হোসেন বলেন, গাইডওয়ালের নিচ থেকে মাটি কেটে রাস্তায় দেওয়া হচ্ছে। এতে করে গাইডওয়ালটি দুর্বল হয়ে পড়বে। কিছু দিন আগে গাইডওয়ালের এক জায়গায় ফাটল দেখা দেয়। পরে ঠিকাদাররা সেটা মাটি দিয়ে ঢেকে দিয়েছে যেন মানুষ বুঝতে না পারে। এই যদি অবস্থা হয় তা হলে কতদিন সড়কটি টিকবে তা বোঝাই যায়।
আত্রাই উপজেলা এলজিইডি অফিস সূত্রে জানা যায়, নওগাঁ জেলা উন্নয়ন প্রকল্প থেকে উপজেলার থলওলমা থেকে বিশা হয়ে ভাগসুন্দর পর্যন্ত ১ হাজার ২৩০ মিটার দৈর্ঘ্যরে বিটুমিনাস সড়ক এবং ৪৪৫ মিটার দৈর্ঘ্যরে গাইডওয়াল নির্মাণের কাজ করা হচ্ছে যার মোট চুক্তিমুল্য ১ কোটি ৯৪ লাখ ৮৫ হাজার ৩২২ টাকা। কাজটি পেয়েছে নওগাঁ শহরের উকিলপাড়া মানহা ট্রেডার্স। তবে সাব ঠিকাদার হয়ে কাজটি করছেন আত্রাই উপজেলার গোলজার রহমান। বিটুমিনাস কাজ বলতে মূলত বিটুমিন ব্যবহার করে রাস্তা নির্মাণ, সংস্কার এবং ওয়াটারপ্রুফিং বোঝায়। কাজটি শুরু হয়েছে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি। শেষ হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারিতে।
থলওলমা গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুস সোবহান বলেন, রাস্তা হলে আমাদের সুবিধা হবে। কিন্তু যেভাবে গাইডওয়াল তৈরি করা হয়েছে তাতে বর্ষার সময় নদীতে পানি ঢুকলেই মাটি ধসে পড়বে। সড়কটি আমাদের কোনো কাজেই আসবে না।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সোলাইমান আলী বলেন, কাজ যেভাবে হওয়া দরকার সেভাবে হচ্ছে না। সরকারি কাজে একটি সাইনবোর্ড থাকে সেখানে কাজের বিস্তারিত দেওয়া থাকে। ঠিকাদার যখন কাজ শুরু করে তখন কাজের বিষয়ে আমরা জানতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি কোনো সদুত্তর দেননি। গাইডওয়াল যথাস্থানে করা হয়নি এবং ওয়ালের পাশ থেকেই মাটি কাটা হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি, কাজটি তদারকি করে যেন সঠিকভাবে তৈরি করা হয়। এতে এলাকাবাসী উপকৃত হবে।
এএডি/