জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) প্রক্টর অধ্যাপক রাশিদুল আলমকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে তার কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিল শিক্ষার্থীরা। নারী শিক্ষার্থীকে বহিরাগত কর্তৃক ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনার প্রতিবাদ এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তকে গ্রেফতারের দাবিতে তারা তালা ঝোলায়।
শুক্রবার (১৫ মে) দিবাগত রাত ১টার দিকে তারামন বিবি হল থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি বিভিন্ন ছাত্রী হল ঘুরে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়। পরে বিভিন্ন হলের নারী শিক্ষার্থীরা সেখানে অবস্থান নেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে প্রক্টর অধ্যাপক রাশিদুল আলমসহ পুরো প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগ দাবি করেন।
গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন ফজিলাতুন্নেছা হল সংলগ্ন এলাকায় এক নারী শিক্ষার্থীকে রাস্তা থেকে টেনে পাশের জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে। একই ঘটনায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগও করেন ভুক্তভোগী। এ ঘটনায় বুধবার আশুলিয়া থানায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
ঘটনার পরদিন শিক্ষার্থীরা অভিযুক্তকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারের আল্টিমেটাম দেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যর্থ হলে প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি করেন।
শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে— ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তকে গ্রেফতার ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, ব্যর্থ হলে প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগ, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদার, নারী নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ, কুইক রেসপন্স টিম গঠন এবং সাইবার সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা এবং আগের বিভিন্ন ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রক্টর ও প্রশাসন নৈতিকভাবে দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা হারিয়েছে।
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী লামিশা জামান বলেন, রাত ১০টার দিকে তারামন বিবি হলের গেস্টরুমে বিভিন্ন হল ও অনুষদের নারী শিক্ষার্থীরা একত্রিত হই। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী আলোচনায় চলমান পরিস্থিতি, নিরাপত্তা সংকট ও দাবিদাওয়া নিয়ে কথা হয়। গত দুই বছরে ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনায় প্রক্টরিয়াল বডির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ কারণেই সবাই পদত্যাগ দাবিতে একমত হয়।
অবস্থান কর্মসূচির মধ্যে রাত আড়াইটার দিকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল আহসান। এ সময় প্রক্টরের পদত্যাগ দাবিকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তার বাগ্বিতণ্ডা হয়।
উপাচার্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে কোনো শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে তা প্রক্টরিয়াল বডি দেখে। তবে বহিরাগত অপরাধের ক্ষেত্রে সেটি পুলিশের এখতিয়ারভুক্ত।
তিনি আরও বলেন, সবকিছুর নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। এভাবে বাসভবনের সামনে দাঁড়িয়ে প্রক্টরের পদত্যাগ হয় না। তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রক্টরিয়াল বডির গাফিলতি ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা হবে।
সকাল ১০টায় উপাচার্যের বাসভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা অভিযোগ করেন, ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম শেষ হলেও প্রশাসন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, অভিযুক্তকে গ্রেফতারে ব্যর্থতা, তথ্য গোপন এবং বারবার আশ্বাস ভঙ্গ প্রশাসনের ‘চরম ব্যর্থতা ও অসততার’ প্রমাণ।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবন থেকে মিছিল নিয়ে প্রক্টর অফিসে গিয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন। এ সময় তারা প্রক্টরকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন।
এরপর আন্দোলনকারীরা আগামীকাল রেজিস্ট্রার ভবনে তালা দেওয়ার কর্মসূচিও ঘোষণা করেন। তাদের দাবি, অভিযুক্তকে গ্রেফতার এবং প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কার্যালয়ের উপ-রেজিস্ট্রার যে ফরুল হাসান চৌধুরী সজল বলেন, প্রক্টর অফিসে এখনও তালা ঝুলছে।
দুপুর একটার দিকে প্রক্টর রাশিদুল আলম কার্যালয়ে এলেও ভেতরে প্রবেশ করেননি। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত অভিযুক্তকে গ্রেফতার করবে এবং তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলে তিনি আশা করেন।
সময়ের আলো/জোই