আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের কাঁচা চামড়ার বাজারকে ঘিরে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দেশের অন্যতম বৃহৎ চামড়ার মোকাম চট্টগ্রামের কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, ট্যানারি মালিকদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, সিন্ডিকেট বাণিজ্য, লবণের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, সংরক্ষণ সংকট এবং বন্ধ ট্যানারি চালু না হওয়ায় তারা চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তাদের দাবি, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের ঐতিহ্যবাহী ও সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্প ভয়াবহ সংকটে নিমজ্জিত হবে।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়। সংগঠনের নেতারা বলেন, প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার ব্যবসায়ী ব্যাংক ঋণ ও ধারদেনা করে কোটি কোটি টাকার কাঁচা চামড়া সংগ্রহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতায় তারা আশঙ্কা করছেন, ঈদের পর ট্যানারি মালিকরা সরকার নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করে আবারও কম দামে চামড়া কিনে বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে।
সংগঠনের সহ-সভাপতি সম্রাট মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন, সরকার কাঁচা চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করলেও বাস্তবে সেই দামে চামড়া বিক্রি করা যায় না। ট্যানারি মালিকদের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট নিজেদের ইচ্ছামতো বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে লোকসানে চামড়া বিক্রি করেন। অনেকে পুঁজি হারিয়ে ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে লবণের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় চামড়া সংরক্ষণ ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। পর্যাপ্ত লবণ না থাকলে চামড়া দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। অথচ সরকারিভাবে লবণ সহায়তার কথা বলা হলেও প্রকৃত ব্যবসায়ীরা অনেক সময় সেই সুবিধা পান না। আমরা চাই জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে প্রকৃত চামড়া ব্যবসায়ীদের মাঝে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে লবণ বিতরণ করা হোক।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. ইউনুছ বলেন, চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে বেশ কয়েকটি ট্যানারি বন্ধ থাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। এসব ট্যানারি দ্রুত চালু করা গেলে স্থানীয়ভাবে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হবে। এতে ব্যবসায়ীরা ন্যায্যমূল্য পাবেন, রপ্তানি বাড়বে এবং হাজার হাজার শ্রমিক ও অসহায় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
তিনি আরও বলেন, চামড়া সংরক্ষণের জন্য আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গুদাম এবং বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যবসায়ী, এতিমখানা, মাদ্রাসা ও সাধারণ বিক্রেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে নেতারা অভিযোগ করেন, সরকার নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়নে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় একটি অসাধু চক্র পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এর ফলে মৌসুমি ব্যবসায়ী ও প্রান্তিক সংগ্রাহকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। তারা বলেন, দেশের চামড়া শিল্প একসময় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, নীতিগত দুর্বলতা ও সিন্ডিকেট বাণিজ্যের কারণে শিল্পটি আজ অস্তিত্ব সংকটে।
সংগঠনের নেতারা আরও জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে আধুনিক প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সার্টিফিকেশন নিশ্চিত করা জরুরি। অথচ প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা ও নীতিগত সমন্বয়ের অভাবে এই শিল্পের সম্ভাবনা দিন দিন কমে যাচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে সরকারের কাছে কয়েকটি জরুরি দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-
* জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে প্রকৃত চামড়া ব্যবসায়ীদের মাঝে লবণ বিতরণ,
* লবণের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মূল্য সহনীয় রাখা,
* চট্টগ্রামের বন্ধ ট্যানারিগুলো দ্রুত চালু করা,
* আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা,
* সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া ক্রয় নিশ্চিত করা,
* ট্যানারি সিন্ডিকেট ও অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণ বন্ধে কঠোর নজরদারি,
* এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করা।
ব্যবসায়ীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে শুধু চট্টগ্রাম নয়, সারাদেশের চামড়া খাত ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতি, রপ্তানি আয় এবং লাখো মানুষের জীবিকা। তারা অবিলম্বে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
সময়ের আলো/জেডআই