মধ্য আফ্রিকার দেশ ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো) ইবোলার নতুন প্রাদুর্ভাবে ৮০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর পরপরই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) একে আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছে। সংস্থাটি বলছে, সীমান্তবর্তী এলাকায় দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তাই দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ এখন খুব জরুরি।
ডিআর কঙ্গোতে এখন পর্যন্ত ৩ শতাধিক সন্দেহভাজন ইবোলা রোগী শনাক্ত হয়েছে। এসব রোগীর বড় অংশ দেশটির পূর্বাঞ্চলে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এই কারণে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর মধ্যে উগান্ডায় মাত্র দুটি কেস শনাক্ত হয়েছে।
ডব্লিউএইচও প্রধান টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস বলেছেন, পরিস্থিতি এখনও বৈশ্বিক মহামারিতে পরিণত হয়নি, তবে আফ্রিকার মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। তিনি জানান, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, সংক্রমিতদের আইসোলেশন, সীমান্ত এলাকায় স্ক্রিনিং, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।
উগান্ডার রাজধানী কাম্পালাসহ বিভিন্ন শহর ও সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে প্রবেশের সময় মানুষের শরীরের তাপমাত্রা মাপা হচ্ছে, জ্বর ও অন্যান্য উপসর্গ পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং সন্দেহভাজনদের আলাদা পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে তারা সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকতে পারেন।
ইবোলা ভাইরাস সাধারণত সংক্রমিত ব্যক্তির রক্ত, বমি, ঘাম, মল বা অন্যান্য শরীরের তরলের মাধ্যমে ছড়ায়। এছাড়া সংক্রমিত মৃতদেহ বা দূষিত বস্তু স্পর্শ করলেও রোগটি ছড়াতে পারে। এর প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বর, তীব্র দুর্বলতা, মাথা ও শরীর ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া এবং গুরুতর ক্ষেত্রে শরীরের ভেতরে ও বাইরে রক্তক্ষরণ। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুহার অনেক বেশি।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবটি বুন্ডিবুগিও ভাইরাস রোগ (বিভিডি) নামের ইবোলার একটি বিরল ধরনের কারণে হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। এই ধরনটি খুব কম দেখা যায় এবং এর জন্য এখনো কোনো নির্দিষ্ট অনুমোদিত ভ্যাকসিন বা চিকিৎসা নেই। এ কারণে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এটিকে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন।
আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (আফ্রিকা সিডিসি) জানিয়েছে, পরিস্থিতি দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৩৩৬টি সন্দেহভাজন সংক্রমণ এবং ৮৭ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, প্রাথমিক নমুনাগুলোতে উচ্চ হারে সংক্রমণ ধরা পড়ছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
পরবর্তীতে উগান্ডা জানায়, ডিআর কঙ্গো থেকে আসা একটি রোগী রাজধানী কাম্পালার একটি হাসপাতালে মারা যান। এর পর সেখানে আরও একটি কেস শনাক্ত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, এই দুই কেসের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি, তবে দুজনই ডিআর কঙ্গো থেকে ভ্রমণ করেছিলেন।
এদিকে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উগান্ডা সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তারা এখনই সীমান্ত বন্ধ করছে না, তবে কঠোর নজরদারি চলছে। রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, সীমান্ত পারাপার, ঘনবসতি, এবং দুর্বল স্বাস্থ্য অবকাঠামোর কারণে রোগটি আরও দ্রুত ছড়াতে পারে। তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে দ্রুত শনাক্তকরণ, রোগীদের আলাদা রাখা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো।
/ইউএমএইচ