হেলে পড়া টাওয়ার যে শহরকে এনে দিলো বিশ্বজোড়া খ্যাতি

সময়ের আলো ডেস্ক

ফিচার

পৃথিবীতে এমন কিছু স্থাপনা আছে, যেগুলো শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, তাদের পেছনের অদ্ভুত গল্পের কারণেও ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। ইতালির

2026-05-17T20:45:07+00:00
2026-05-18T19:58:29+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ফিচার
হেলে পড়া টাওয়ার যে শহরকে এনে দিলো বিশ্বজোড়া খ্যাতি
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ১৭ মে, ২০২৬, ৮:৪৫ পিএম  আপডেট: ১৮.০৫.২০২৬ ৭:৫৮ পিএম
পিসার হেলানো টাওয়ার। ছবি : সংগৃহীত
পৃথিবীতে এমন কিছু স্থাপনা আছে, যেগুলো শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, তাদের পেছনের অদ্ভুত গল্পের কারণেও ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। ইতালির পশ্চিমের ছোট্ট শহর পিসার হেলানো টাওয়ার তেমনই এক বিস্ময়। মজার বিষয় হলো, এই স্থাপনাটির সবচেয়ে বড় পরিচয়— এর হেলে থাকা। তবে এটা কেবলই নির্মাণভুলের ফল। অথচ সেই ভুলই একসময় এটিকে এনে দিয়েছে বিশ্বজোড়া খ্যাতি। স্থাপনাটি পেয়েছে বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের একটি হয়ে ওঠার সম্মান। স্থাপনাটির আরও একটি মজার দিক আছে। এ পর্যন্ত এমন কোনও স্থাপনার কথা শুনেছেন, যা পৃথিবী-বিখ্যাত কিন্তু তার কারিগর কে, তা কেউ জানে না? এই হেলানো টাওয়ারটিই সেই বিস্ময়কর স্থাপনা।

প্রায় হাজার বছর আগের কথা। ব্যাবসাবাণিজ্যে সমৃদ্ধ হতে শুরু করেছে পিসা শহরটি। তখন নগরবাসী অনুভব করল, শহরে একটা ক্যাথিড্রাল থাকা প্রয়োজন। নাহয় আশপাশের অন্যান্য শহরের তুলনায় তারা কোথাও না কোথাও পিছিয়ে থাকবে। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর তারা একটি ক্যাথিড্রাল তৈরি করে ফেলল। ১০৬৩ থেকে ১০৯২, ক্যাথিড্রালটি তৈরি করতে সময় লাগল ২৯ বছর। পাহাড় থেকে আনা বিখ্যাত সাদা মার্বেল পাথর দিয়ে বানানো ক্যাথিড্রালটি অনিন্দ্য সুন্দর হয়ে ধরা দিল।

এরপর কেটে গেল আরও ৫০ বছর। কিন্তু ততদিনেও তৈরি হয়নি ক্যাথিড্রালের ঘণ্টা বাজানোর ঘণ্টা টাওয়ার। অতঃপর ১১৭৩ সালে টাওয়ারের নকশা তৈরি করা হলো। ঘণ্টা টাওয়ারের নির্মাণকাজে ডোনা বার্তা নামে এক ধনী নারী অনেকগুলো রুপার মুদ্রা দান করলেন। সেই মুদ্রা দিয়ে পাথর কিনে ঘণ্টা টাওয়ারের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। সেই অপর্যাপ্ত পাথর দিয়ে পুরো ফাউন্ডেশনটি মাত্র ৩ মিটার গভীর করা সম্ভব হলো।


ফাউন্ডেশনের পর টাওয়ারের কাজ চলতে থাকল। তিনতলা পর্যন্ত কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর দেখা গেল, তারা বড় ধরনের ভুল করেছেন। আর সেই এক ভুলে টাওয়ারের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে গেল। কী এমন ভুলে টাওয়ারের কাজ বন্ধ করে দিতে হয়েছে, সে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে!

এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা নির্মিত হচ্ছে, অথচ এতজন দক্ষ কারিগর থাকার পরও কারও মাথাতেই এলো না- মাত্র ৩ মিটার গভীরতার ফাউন্ডেশন নিয়ে কীভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে এই মস্ত টাওয়ার। ফলে কাজ শুরুর কিছু দূর যাওয়ার পরেই দেখা গেল, টাওয়ারটি আর ঠিকমতো দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না, একপাশে হেলে পড়ছে। এতে লজ্জায় ঘণ্টা টাওয়ারের কনস্ট্রাকশনের সঙ্গে জড়িত সবাই প্রোজেক্ট থেকে নিজেদের নাম সরিয়ে নিল। নকশা ও হিসাবের কাগজপত্র সব নষ্ট করে দেওয়া হলো। কেউ যেন কখনও জানতে না পারে, এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণে এমন ভুল কাজ কারা করেছিল। ভুলের শুরুটা তখন থেকেই। আর সেই ভুলের মাশুল টেনে নিয়ে যেতে হচ্ছে আজও। যদিও এই ভুলের জন্যই টাওয়ারটি আজ বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেয়েছে! একই সঙ্গে ভুলের লজ্জা ঢাকতে গিয়ে ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেল কারিগরদের নামও।

পরবর্তী ১০০ বছর নানান যুদ্ধবিগ্রহ চলতে থাকায় টাওয়ারটির কাজ বন্ধ থাকে। পরিস্থিতি মোটামুটি স্থিতিশীল হলে নগর কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিল, টাওয়ারের কাজ এবার ঠিকমতো শেষ করা হোক। স্থপতি জিওভান্নি ডি সিমিওনিকে এর দায়িত্ব দেওয়া হলো। কিন্তু ভুল যেন পিছু ছাড়ছিল না। টাওয়ারের হেলে যাওয়া যেন বোঝা না যায়, তাই তিনি প্রতি তলার একপাশ আরেক পাশ থেকে উঁচু করে নির্মাণ করতে লাগলেন। আরও বেশি ঘনত্বের মার্বেল পাথর ব্যবহার করলেন। এতে পাথরের ভারে এবং উচ্চতার অসামঞ্জস্যতায় টাওয়ার আরও হেলে পড়ল। স্বাভাবিকভাবে এবারও কাজ বন্ধ হয়ে গেল।


এরপর ৫০ বছর কেটে গেল দ্বিতীয় দফা ভুলের। আবার নতুন উদ্যমে কাজ শুরু হলো। সাততলা পর্যন্ত কাজ সম্পন্ন করে ১৩৭২ সালে বহুল কাঙ্ক্ষিত ঘণ্টা টাওয়ারে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু টাওয়ারটির কপালে দুর্ভোগের অন্ত নেই। ১৮৩৮ সালে আলেসান্দ্রো ডেল্লা নামে একজন স্থপতি টাওয়ারের ফাউন্ডেশন কিছুটা খুঁড়ে প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে যান। এতে পুরো টাওয়ারটি অনেকখানি হেলে যায়। তিনি তখনই ফাউন্ডেশনটি আবার মাটি সিমেন্ট দিয়ে ভরাট করে ফেলেন। নিরাপত্তার কথা ভেবে ১৯৯০ সালে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর শুরু হয় সংস্কার কাজ। কাজ শেষে ২০০১ সালে তা পুনরায় দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয় এবং স্থপতিরা নিশ্চয়তা দেন যে, আগামী ১০০ বছর এটি নিরাপদ থাকবে।

বিখ্যাত বিজ্ঞানী গ্যালিলিও ১৫৯০ সালে এই টাওয়ারে বস্তুর ভরের ওপর পৃথিবীর ত্বরণের পরীক্ষাটি চালান। এর মাধ্যমে তিনি ২ হাজার বছর আগে দেওয়া অ্যারিস্টটলের থিওরি প্রমাণ করেন।

পিসা শহরটি ছোট হলেও শুধু এই বিস্ময়কর টাওয়ারটি দেখতে প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক আসেন এখানে। এ টাওয়ারের জন্যই পৃথিবীসুদ্ধ মানুষ ইতালির ছোট্ট পিসা শহরটিকে চেনে।

যারা এই টাওয়ারের নকশা ও নির্মাণকাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারা যদি জানতেন একদিন তাদের ভুল কাজই টাওয়ারটিকে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি এনে দিবে, তাহলে তারা লজ্জায় নিজেদের গুটিয়ে নিতেন না বরং সগৌরবে নিজেদের নাম লিখে রাখতেন টাওয়ারের ইতিহাস-সংবলিত কোনও সাইন বোর্ডে বা বইয়ের পাতায়। সময়ের অতল স্রোতে তারা হারিয়ে গেলেন নীরবে। তাদের কাজ রয়ে গেল কালের সাক্ষী হয়ে।

/মহু


  বিষয়:   পিসা  টাওয়ার  ইতালি 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: