মানুষের মৃত্যুতে সাধারণত মুসলমানরা ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পড়ে শোক প্রকাশ করেন এবং মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করেন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভিন্ন এক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ভিন্ন মত, ভিন্ন রাজনৈতিক দল কিংবা চলচ্চিত্র-নাটক অঙ্গনের কিছু ব্যক্তির মৃত্যুতে কেউ কেউ আলহামদুলিল্লাহ বলে স্বস্তি বা আনন্দ প্রকাশ করছেন। এ নিয়ে ধর্মীয় ও সামাজিক পরিমণ্ডলে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে সময়ের আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন ইসলামি বুদ্ধিজীবী, আলেম ও সাংবাদিক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ এবং আলেম-গবেষক কবি মুসা আল হাফিজ।
মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, কোনো ভালো মানুষ বা সাধারণ মুসলিম মৃত্যুবরণ করলে তার জন্য ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন বলা এবং দোয়া করা একজন মুসলিমের শোভন আচরণ। তবে ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তি ছিলেন, যারা ভয়ঙ্কর জালেম, অত্যাচারী ও ইসলামবিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
বর্তমান যুগেও এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদেরকে ফেরাউনের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এ ধরনের ব্যক্তিদের মৃত্যুতে কেউ কেউ আলহামদুলিল্লাহ বলে স্বস্তি প্রকাশ করেন।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি মানুষকে দুই শ্রেণীতে ভাগ করেন। প্রথমত, এমন মুসলিম যারা ধর্মকর্মে উদাসীন ছিলেন, নামাজ-রোজা ঠিকমতো পালন করতেন না বা গাফেল জীবন কাটিয়েছেন, কিন্তু নিজেদের মুসলিম পরিচয় অস্বীকার করেননি। এমন কারো মৃত্যুতে আলহামদুলিল্লাহ বলা ঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। কারণ, ওই ব্যক্তি মুসলিম পরিচয় বহন করেছেন এবং ইসলামের গণ্ডি থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেননি।
দ্বিতীয়ত, এমন কিছু ব্যক্তি আছেন যারা প্রকাশ্যে ইসলামবিরোধিতা করেছেন, ধর্মবিদ্বেষ ছড়িয়েছেন, নিজেদের নাস্তিক বা খোদাদ্রোহী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন, নবীকে অবমাননা করেছেন কিংবা মানুষের ওপর বড় ধরনের জুলুম করেছেন।
এ ধরনের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কেউ কেউ আলহামদুলিল্লাহ বলে থাকেন। বড় কোনো জালেমের মৃত্যুতে এমনটি বলার অনুমতি আছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে চলচ্চিত্র, নাটক বা বিনোদন অঙ্গনের কারো মৃত্যুতে এ ধরনের মন্তব্য করা উচিত কি না—এ প্রশ্নে তিনি সতর্ক অবস্থান তুলে ধরেন। তার মতে, শুধুমাত্র কোনো পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে কারো মৃত্যুতে আনন্দ প্রকাশ করা ঠিক নয়। বিশেষ করে দাওয়াতি মানসিকতা থেকে মানুষের মৃত্যুতে উল্লাস প্রকাশ না করাই উত্তম।
তিনি আরও বলেন, ইসলামি ইতিহাসে বড় কাফের, মুনাফিক বা ইসলামবিদ্বেষী ব্যক্তির মৃত্যুতে অনেক আলেম ও মুসলিম স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তবে তারা সরাসরি আলহামদুলিল্লাহ বলেছেন কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য তার কাছে নেই।
এ প্রসঙ্গে সামাজিক বাস্তবতার দিকেও গুরুত্বারোপ করেন মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ। তিনি বলেন, মানুষকে অবাধে বিচার করার সুযোগ দিলে অনেক সময় নৈরাজ্য তৈরি হয়। ব্যক্তিগত শত্রুতা, রাজনৈতিক বিরোধ বা দলীয় বিভেদের কারণেও কেউ অন্যকে শত্রু মনে করে তার মৃত্যুতে আলহামদুলিল্লাহ বলতে শুরু করতে পারে। এতে সমাজে বিভক্তি ও বিদ্বেষ বাড়ে।
তার ভাষায়, যে ব্যক্তি নিজেকে মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিয়েছে এবং প্রকাশ্য কুফরি, ঈমানহারা আচরণ বা ভয়াবহ জুলুমের জন্য পরিচিত নয়, তার মৃত্যুতে এমন কোনো আচরণ করা উচিত নয় যাতে আনন্দ প্রকাশ পায়।’
এদিকে আলেম গবেষক, কবি মুসা আল হাফিজ বলেন, সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত কাফের, জালেম বা ইসলামবিদ্বেষী ব্যক্তির মৃত্যুতে আলহামদুলিল্লাহ বলার অনুমতি রয়েছে। এটিই এ বিষয়ে মূলনীতি।
তিনি বলেন, এই মূলনীতির আলোকে নির্ধারণ করতে হবে—কার মৃত্যুতে আলহামদুলিল্লাহ বলা যাবে, আর কার ক্ষেত্রে বলা যাবে না।
কেউ যদি স্পষ্টভাবে জালেম, ইসলামবিদ্বেষী বা কাফের হিসেবে প্রমাণিত হন, তাহলে তার মৃত্যুতে এ ধরনের মন্তব্য করা যেতে পারে। অনুমতি রয়েছে। তবে এমন বৈশিষ্ট্য প্রমাণিত না হলে কারো মৃত্যুতে আলহামদুলিল্লাহ বলা উচিত নয়।
ইসলামি স্কলারদের মতে, এ ধরনের বিষয়ে আবেগ নয়, বরং সংযম, সতর্কতা ও শরিয়তের মূলনীতি অনুসরণ করাই একজন মুসলিমের জন্য অধিকতর শোভন।
/এসএকে