একসময় ভ্রমণ মানেই ছিল শহরের কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে কিছুদিন বিশ্রাম নেওয়া। সমুদ্রের ধারে কিংবা পাহাড়ের কোলে একটি সুন্দর রিসোর্টে থাকা, সুইমিং পুলে সময় কাটানো কিংবা ভালো খাবার খাওয়া। কিন্তু সময় বদলেছে, মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে, সেই সঙ্গে বদলেছে ভ্রামণিকদের চাহিদাও। ভ্রমণকারীদের এখন অন্যতম পছন্দ ওয়ারকেশন ট্রাভেল। অর্থাৎ, ভ্রমণ এবং কাজ একসঙ্গে। যদি তাতে অন্য ভ্রমণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সংস্কৃতির সান্নিধ্য যুক্ত হয়, তাহলে ভ্রমণ সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে।
কাজ ও ছুটি একসঙ্গে
করোনা মহামারির পর অফিসে না গিয়েও ঘরে বসে বা দূর থেকে কাজ করার সংস্কৃতি বিশ্বজুড়ে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এখন কর্মীরা চাইলে প্রয়োজনে পৃথিবীর যে কোনও জায়গা থেকে কাজ করতে পারেন। এই সুযোগকে কেন্দ্র করেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ওয়ারকেশন— অর্থাৎ কাজ এবং ভ্রমণ বা ছুটি একসঙ্গে। সকালে অনলাইন মিটিং, দুপুরে ল্যাপটপে কাজ, বিকেলে সমুদ্রের ধারে হাঁটা সবকিছুই এক ভ্রমণে। পর্যটকরা এখন এমন রিসোর্ট খোঁজেন, যেখানে নিরিবিলি পরিবেশ, সার্বক্ষণিক ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ এবং আরামদায়ক ওয়ার্কস্পেস সুবিধা থাকবে।
সংযোগের সেতু
ওয়ারকেশনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো— মানুষ নিরিবিলি পরিবেশ চায়, কিন্তু পুরোপুরি একা থাকতে চায় না। সবসময় একা থাকাটা সুখকর হয় না। অনেক ভ্রমণকারী একা ভ্রমণ করেন বা কাজের ফাঁকে কয়েকদিনের জন্য নতুন জায়গায় চলে যান। তবে তারা চান, ভ্রমণে গিয়ে যেন অন্য অতিথিদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়, একসঙ্গে সময় কাটানো যায়। এতে সময়ও ভালো কাটে, সংযোগ ও অভিজ্ঞতাও বাড়ে। তারা চায়, রিসোর্টে যেন এই সংযোগের সেতুটা থাকে। ঠিক এ কারণেই আধুনিক রিসোর্টগুলো এখন কমিউনিটি স্পেস তৈরিতে গুরুত্ব দিচ্ছে। কমন লাউঞ্জ, ওপেন ক্যাফে স্পেস, শেয়ারড কো-ওয়ার্কিং জোন, বারবিকিউ বা বনফায়ার এরিয়ার ব্যবস্থা রাখে তারা। এছাড়া গ্রুপ যোগব্যয়াম সেশন, মুভি নাইট, গেম নাইটেরও আয়োজন থাকে। এসব জায়গা বা আয়োজন ভ্রমণকারীদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করে। কেউ হয়তো সকালে চা খেতে খেতে কারও সঙ্গে পরিচিত হলো, কেউ আবার বিকেলে কাউকে নিয়ে কাছের কোনও ট্রেইলে গেল।
সাংস্কৃতিক আয়োজন
পর্যটকদের আরেকটি বড় চাহিদা হলো স্থানীয় সংস্কৃতিকে কাছ থেকে জানা। তারা জানতে চান, সেই অঞ্চলের মানুষ কীভাবে বাঁচে, কী খায়, কী উৎসব করে, তাদের শিল্প ও ঐতিহ্য কী। এই সুযোগ এখন বিভিন্ন রিসোর্টে পাওয়া যায়। তারা পর্যটকদের জন্য আয়োজন করে স্থানীয় রান্না শেখার ক্লাস, লোকসংগীত সন্ধ্যা, হস্তশিল্প কর্মশালা, স্থানীয় গাইডের সঙ্গে গ্রামভ্রমণ, ঐতিহ্যবাহী নাচ বা পারফরম্যান্স, কৃষিকাজ বা মাছ ধরার অভিজ্ঞতা ইত্যাদি।
ধরা যাক, পাহাড়ি অঞ্চলের একটি রিসোর্টে অতিথিরা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর রান্না শিখছেন, তাদের তৈরি পোশাক বা কারুশিল্প দেখছেন, সন্ধ্যায় লোকগানের আসরে অংশ নিচ্ছেন। এতে ভ্রামণিকদের অভিজ্ঞতা যেমন সমৃদ্ধ হয়, তেমনই তারা ভ্রমণকে আরও বেশি উপভোগ করতে পারেন।
দীর্ঘমেয়াদি ভ্রমণ প্রবণতা
ওয়ারকেশনের কারণে এখন মানুষ দুই-তিন দিনের বদলে এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ, এমনকি এক মাসও রিসোর্টে থাকছেন। তাই তাদের জন্য রাখা হচ্ছে লন্ড্রি সুবিধা, ছোট রান্নাঘর, মাসিক বা সাপ্তাহিক প্যাকেজ, ওয়েলনেস ও ফিটনেস সুবিধা। অতিথি যেন সেখানে শুধু বেড়াতে নয়, সাময়িকভাবে বসবাসও করতে পারেন— এমন পরিবেশ তৈরি করেন রিসোর্ট মালিকেরা।
একটি রিসোর্ট যদি একই সঙ্গে শান্ত পরিবেশে কাজের সুবিধা দেয়, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে অতিথিকে পরিচয় করাতে পারে, তাহলে সেটিই হয়ে ওঠে পর্যটকদের পছন্দের গন্তব্য। নতুনভাবে বাঁচা, অভিজ্ঞতা অর্জন, কাজ করা এবং মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার এই সুযোগ এখন প্রায় সব ভ্রমণপ্রিয় মানুষই চায়।
ভবিষ্যতে ভ্রমণকারীর জন্য আদর্শ রিসোর্ট হবে এমন একটি জায়গা, যেখানে সকালে কাজ করা যাবে, বিকেলে নতুন বন্ধুদের সঙ্গে চা খাওয়া যাবে, রাতে স্থানীয় সংগীতের আসরে বসা যাবে অথবা দেখা যাবে কোনও ঐতিহ্যবাহী নৃত্য। তাই আধুনিক রিসোর্টগুলোকেও সেভাবে নিজেদের গড়ে তুলতে হচ্ছে।
/মহু