ইরানজুড়ে রাষ্ট্র-সমর্থিত সমাবেশ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ নাগরিকদের সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান, প্রকাশ্য স্থানে অস্ত্র প্রশিক্ষণ এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বন্দুক প্রদর্শনের মাধ্যমে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা তেহরানের দৈনন্দিন জীবনকে বদলে দিচ্ছে। ইরানের ভেতর থেকে সিএনএনের ম্যাথিউ চান্স জানিয়েছেন, সিএনএন সরকারের অনুমতি নিয়ে কাজ করলেও সম্পাদকীয় নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে রেখেছে।
ইরানের বিস্তৃত রাজধানী তেহরানে রাত নেমে আসে, আর আলবোর্জ পর্বতমালার তুষারঢাকা চূড়াগুলো অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে থাকে। সেই সময় হাজার হাজার ইরানি নিয়মিতভাবে রাস্তায় নেমে আসে সমাবেশে যোগ দিতে, যার উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী জনসমর্থন জোরদার করা।
তেহরানের অভিজাত এলাকা তাজরিশ স্কয়ারের কাছে ইরানি পতাকার ঢেউয়ের মধ্যে “আমেরিকার মৃত্যু হোক” স্লোগান ধ্বনিত হয়। রাস্তার বিক্রেতারা দেশপ্রেমমূলক বেসবল ক্যাপ, প্যাচ ও চা বিক্রি করছে উচ্ছ্বসিত জনতার কাছে।
ইরানি পতাকার রঙের চশমা পরা টিয়ানা নামের এক তরুণী উচ্চস্বরে স্লোগানের মাঝেও বলেন, আমি আমার দেশ ও জনগণের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে সামরিক অভিযানের হুমকি প্রত্যাখ্যান করে টিয়ানা বলেন, আমাদের জনগণ, পুরো সেনাবাহিনী, সব কমান্ডার—সবাই জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। তারা হৃদয় ও আত্মা দিয়ে লড়াই করবে।
রোববার ট্রাম্প তার ট্রুথ স্যোশাল প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, ইরানের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। তাদের আরও দ্রুত এগোতে হবে, নইলে শেষ পর্যন্ত কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
স্থগিত শান্তি আলোচনা এবং ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির অবনতির কারণে অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বেড়ে গেছে।
একজন বয়স্ক ব্যক্তি একটি অস্থায়ী প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে তার ফারসি ভাষায় লেখা স্লোগানটি অনুবাদ করে দিতে চাইলেন। সেখানে লেখা ছিল, পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি আমাদের সীমান্তের মতোই গুরুত্বপূর্ণ, তাই আমরা সেগুলো রক্ষা করব।
তিনি আমাকে বলেন, আমাদের পারমাণবিক শক্তি দরকার—পরিষ্কার জ্বালানির জন্য, বোমার জন্য নয়।
ইরান তাদের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ এড়ানোর শর্ত হিসেবে সেটিই দাবি করেছেন।
বৃদ্ধ ব্যক্তি আরও বলেন, ট্রাম্প জানেন আমাদের কাছে কোনো বোমা নেই, তবুও তিনি আমাদের ওপর হামলা চালাতে চান।
ক্রমাগত গুজব ও বাড়তে থাকা আশঙ্কার মধ্যে অনেক ইরানির মনে এখন একটি ধারণা দৃঢ় হচ্ছে—মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার মাধ্যমে সংঘাত আবারও শুরু হওয়া হয়তো সময়ের ব্যাপার মাত্র।
লন্ডন ও দুবাইয়ে বেড়ে ওঠা ফাতিমা নামের এক নারী বলেন, আমরা জানি এই যুদ্ধ শেষ হয়নি। আমরা জানি ট্রাম্প সত্যিকার অর্থে আলোচনায় যেতে চান না।
তিনি শুধু বলতে যাচ্ছেন, আমি যা বলি তাই করো, না হলে তোমাদের হত্যা করব। আর তারপর আমরা যদি তার কথাও মেনে নিই, তবুও তিনি আমাদের আক্রমণ করবেন, তিনি যোগ করেন।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় তিন মাস ধরে প্রতি সন্ধ্যায় দেশজুড়ে এই সমাবেশ—যা “রাত্রিকালীন সমাবেশ” নামে পরিচিত—অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে নতুন এক উদ্বেগজনক দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, প্রকাশ্য স্থানে বন্দুক প্রশিক্ষণ বুথ, যেখানে সাধারণ নাগরিকদের অস্ত্র ব্যবহারের প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। এটি ইঙ্গিত করছে যে ইরানের কড়া কর্তৃপক্ষ জনগণকে সম্ভাব্য আরও সংঘাতের জন্য প্রস্তুত করছে।
একই দিনে অংশগ্রহণকারীদের অস্ত্র ধরে রাখার কৌশল শেখানো হয় ওই স্কয়ারে।
ভানাক স্কয়ারের একটি কিয়স্কে আমরা দেখি, কালো চাদর পরা এক নারীকে কীভাবে একটি একে-৪৭ রাইফেল পরিচালনা করতে হয় তা শেখানো হচ্ছে। সামরিক পোশাক পরা মুখোশধারী এক ব্যক্তি তাকে অস্ত্রটি কীভাবে খুলে আবার জোড়া লাগাতে হয় তা দেখাচ্ছিলেন।
কয়েক ফুট দূরে একটি ছোট মেয়ে আনলোড করা কালাশনিকভ হাতে খেলছিল। সে বন্দুকটি আকাশের দিকে তাক করে ট্রিগার টানে, তারপর হাসিমুখে সেটি তার প্রশিক্ষকের হাতে ফিরিয়ে দেয়।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনেও অস্ত্র ব্যবহারের এই প্রচারণা জোরালোভাবে প্রচার করা হচ্ছে। বিভিন্ন চ্যানেলে উপস্থাপকদের অ্যাসল্ট রাইফেল হাতে সম্প্রচার করতে দেখা যাচ্ছে।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর এক মুখোশধারী সদস্যের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর রাষ্ট্র-পরিচালিত ওফোগ টিভি চ্যানেলের উপস্থাপক হোসেইন হোসেইনি লাইভ টেলিভিশনে তার রাইফেল থেকে স্টুডিওর ছাদের দিকে গুলি ছোড়েন।
চ্যানেল–৩-এর এক নারী উপস্থাপক, মোবিনা নাসিরি, দুই হাতে একটি অ্যাসল্ট রাইফেল ধরে দর্শকদের উদ্দেশে বললেন, ওরা আমাকে ভানাক স্কয়ার থেকে একটি অস্ত্র পাঠিয়েছে, যাতে আমিও তোমাদের সবার মতো এটি ব্যবহার করতে শিখতে পারি।
তবে সব ইরানি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত নয়।
তাজরিশ স্কয়ারের সমাবেশস্থল থেকে একটু দূরে, ইরানের সিনেমা জাদুঘরের কাছের একটি শান্ত পার্কে স্থানীয়রা খোলা বইয়ের দোকানের পাশে চা পান করছিলেন, আর দম্পতিরা হাত ধরে হাঁটছিলেন।
যুদ্ধ নয়, পাশ দিয়ে যেতে যেতে এক তরুণ বলে উঠল।
নিজের স্বামীর সঙ্গে পার্কের বেঞ্চে বসা এক নারী, যিনি একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং নাম প্রকাশ করতে চাননি, আমাকে বললেন তারা দুজনেই ইরানকে বদলাতে চান।
তিনি নিচু স্বরে ইংরেজিতে বললেন, আমরা শুধু একটি স্বাভাবিক দেশে বাস করতে চাই, যেখানে আমাদের সন্তানদের একটি ভবিষ্যৎ থাকবে।
ইরানে মতামতের ভিন্নতার ইঙ্গিত দিয়ে আরেক তরুণী বললেন, আমরা শান্তি চাই।
তবে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পরিবেশ ক্রমেই আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠছে, এবং দেশটি যেন আবারও যুদ্ধ শুরুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। কট্টরপন্থী সরকারি বার্তার প্রবল স্রোতে অন্য সব কণ্ঠস্বর যেন ডুবে যাচ্ছে।
/ইউএমএইচ