মার্কিন–চীন আলোচনায় বড় কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আত্মবিশ্বাস নিয়ে বেইজিং সফরে যাচ্ছেন। একই সময়ে, পরপর দুইজন বড় বিশ্বনেতার সফর আয়োজন করে চীনও তার কূটনৈতিক প্রভাব ও শক্তি দেখাচ্ছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মঙ্গলবার (১৯ মে) সন্ধ্যায় বেইজিং পৌঁছাবেন। সেখানে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন। আনুষ্ঠানিকভাবে সফরটি ২০০১ সালের ‘সুপ্রতিবেশী ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি’র ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বুধবারের শি-পুতিন বৈঠকের গুরুত্ব শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এর পেছনে বড় ভূরাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন সফর করেন এবং শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। ট্রাম্প বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে ইতিবাচক বক্তব্য দিলেও, তাইওয়ান ও ইরান যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বড় কোনো অগ্রগতির প্রমাণ দেখা যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি রাশিয়ার জন্য ইতিবাচক। কারণ এতে বোঝা যাচ্ছে, চীন এখনো রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী এবং পশ্চিমা চাপের কারণে মস্কো থেকে দূরে সরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা বেইজিংয়ের নেই।
একই সঙ্গে, ট্রাম্পের সফরের পরপরই পুতিনকে স্বাগত জানিয়ে চীন দেখাতে চাইছে যে বিশ্ব কূটনীতিতে তারা এখন একটি কেন্দ্রীয় শক্তি, যারা নিজেদের শর্তে প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করতে সক্ষম।
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিকে ‘অনিশ্চিত’ বা ‘বেপরোয়া’ হিসেবে দেখার অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রাশিয়া ও চীনকে আরও কাছাকাছি এনেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুতিন ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে একটি শক্তিশালী কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে উঠেছে।
তবে এই সফরে বড় কোনো নীতিগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। বরং সফরটির মূল তাৎপর্য হলো— চীন ধীরে ধীরে এমন একটি বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করছে, যারা নিজেদেরকে বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের লক্ষ্যে গড়ে তুলেছে।
‘শি’র চেয়ে পুতিনের এই সফর বেশি প্রয়োজন
চীনের দৃঢ় অবস্থান সত্ত্বেও, বিশ্লেষকদের মতে পুতিনের এই সফর থেকে বড় কোনো অগ্রগতি বা নতুন সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা নেই। বরং এটি দুই দেশের বিদ্যমান কৌশলগত সম্পর্ককে আরও গভীর করার একটি ধারাবাহিক পদক্ষেপ।
লন্ডনের কিংস কলেজের ডিফেন্স স্টাডিজ বিভাগের পোস্টডক্টরাল গবেষক মেরিনা মিরন আ-জাজিরাকে বলেন, আমি মনে করি না এখানে বড় কোনো পরিবর্তন হবে।ক তর মতে, এই সফরের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য এবং সামরিক প্রযুক্তি বিনিময় আরও শক্তিশালী হতে পারে।
ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র রাশিয়া বিশ্লেষক ওলেগ ইগনাতভও একই মত দেন। তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত হলেও তারা সামরিক মিত্র নয়। তাই সম্পর্কের কাঠামো বড় কোনো পরিবর্তনের দিকে যাবে না। বরং এটি একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব হিসেবেই থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জ্বালানি ও প্রযুক্তি। চীন রাশিয়ার কাছ থেকে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি পেতে চায়, আর রাশিয়া চীনের প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে— বিশেষ করে ড্রোন ও সামরিক ব্যবহারের দ্বৈত প্রযুক্তিতে।
তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই সম্পর্কের ক্ষমতার ভারসাম্য সমান নয়।
চ্যাথাম হাউসের রাশিয়া ও ইউরেশিয়া প্রোগ্রামের ফেলো টিমোথি অ্যাশ বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া এখন অনেকটাই চীনের ওপর নির্ভরশীল, ফলে পুতিন এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানে আছেন। তার মতে, শি’র চেয়েও পুতিনের এই সফর বেশি প্রয়োজন, কারণ চীনের হাতে এখন অনেক বেশি কৌশলগত সুবিধা বা কার্ড রয়েছে।
তবুও অন্য বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেন, এই সম্পর্ককে শুধু শ্রেণিবদ্ধ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। তাদের মতে, রাশিয়া ও চীন উভয়ই একটি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা গড়তে চায়, যেখানে কোনো একক শক্তি অন্যদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে না।
সার্বিকভাবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর নতুন কোনো মোড় না নিলেও রাশিয়া–চীন সম্পর্কের বর্তমান কৌশলগত ঘনিষ্ঠতাকে আরও দৃঢ় করবে।
যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ‘নিরপেক্ষ পরাশক্তি’
পরপর দুই শীর্ষ সম্মেলন বিশ্ব কূটনীতিতে বেইজিংয়ের অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ক্রমশ ভেঙে পড়া আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় চীন নিজেকে একটি অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে।
মিরন বলেন, চীন কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের সঙ্গে জোটবদ্ধ না হয়ে, বরং এক ধরনের নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী ও স্বাধীন হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে চাইছে।
তিনি আরও বলেন, চীন রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ হলেও প্রকাশ্যে কোনো বড় শক্তির পক্ষ না নিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
এইভাবে চীন কূটনৈতিক ক্ষেত্রে নিজেকে একটি নিরপেক্ষ পরাশক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে চায় এবং নিজের নিরপেক্ষতার ভাবমূর্তি তৈরি করতে চায়।
মিরন বলেন, এই সফরের পর ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যুদ্ধ— হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় অস্থিরতা তৈরি করেছে— তা রাশিয়ার চেয়ে চীনের অর্থনীতিতে বেশি প্রভাব ফেলবে।
তিনি আরও বলেন, স্বল্পমেয়াদে এই পরিস্থিতি থেকে রাশিয়া কিছুটা সুবিধা পাচ্ছে, কারণ উপসাগরীয় জ্বালানি প্রতিযোগীরা দুর্বল অবস্থায় আছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইরানের সঙ্গে গোয়েন্দা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা থাকলেও তারা সংঘাতের অবসান দেখতে চায়।
বিশ্লেষক অ্যাশ বলেন, ট্রাম্প–শি শীর্ষ বৈঠক যেসব ফলাফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে, তা থেকে মস্কো কিছুটা সন্তুষ্টি পাবে।
তিনি বলেন, চীন ট্রাম্পের চাওয়া—ইরান যুদ্ধের অবসান—পূরণ করেনি। ফলে মস্কো খুশি যে বেইজিং তেহরান বা রাশিয়াকে একা ফেলে দিচ্ছে না।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও আলোচনা প্রায় নিশ্চিত, তবে বিশ্লেষকদের মতে চীন এই বিষয়ে রাশিয়ার ওপর কঠোর চাপ দেবে না। তারা সাধারণভাবে শান্তিপূর্ণ আলোচনার আহ্বান জানাবে, কিন্তু মস্কোকে অপমানিত করার মতো কোনো অবস্থান নেবে না।