আল্লাহ তায়ালা এই বিশ্বজগতের প্রতিটি সৃষ্টিকে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে, সৌন্দর্য ও উদ্দেশ্যের সমন্বয়ে সৃষ্টি করেছেন। কোনো কিছুই এখানে উদ্দেশ্যহীন নয়। উদ্ভিদের সৌন্দর্য তার সবুজ-শ্যামল পাতা ও রঙিন ফুলে প্রকাশ পায়, কিন্তু এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো মানুষের জন্য খাদ্যশস্য ও ফল উৎপাদন করা।
তদ্রুপ কাপড়ের সৌন্দর্য তার রং, নকশা ও নান্দনিকতায় নিহিত, অথচ এর মূল লক্ষ্য মানুষের দেহ আবৃত রাখা ও তাকে সুরক্ষা দেওয়া। এভাবে পৃথিবীর প্রতিটি বস্তুই বাহ্যিক সৌন্দর্যের মাধ্যমে মানুষকে আকৃষ্ট করে, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য মানুষকে স্রষ্টার দিকে পরিচালিত করা এবং আখেরাতের প্রস্তুতিতে উদ্বুদ্ধ করা।
দুনিয়ার এই মোহনীয় সৌন্দর্যের আড়ালে এক গভীর সত্য লুকিয়ে আছে; আর তা হলো ঈমান ও সৎ আমলের আহ্বান। মানুষ যখন এই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়, তখন সে দুনিয়ার চাকচিক্যে মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ে।
সে স্রষ্টাকে ভুলে গিয়ে সৃষ্টির পেছনে ছুটতে থাকে এবং ক্ষণস্থায়ী ভোগ-বিলাসকেই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য মনে করে। অথচ নবী-রাসুলগণ এবং তাঁদের অনুসারীরা কখনোই দুনিয়ার বাহ্যিক চাকচিক্যে আকৃষ্ট হননি; বরং তাঁরা সর্বদা ঈমান, সৎকর্ম, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং দ্বীনের প্রচার-প্রসারে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছিলেন।
বর্তমান যুগে মানুষের প্রবণতা দুনিয়ার ভোগ-বিলাস, খেল-তামাশা ও বাহ্যিক সৌন্দর্যের দিকে ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আধুনিকতা ও ভোগবাদ মানুষকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে যে, অনেকেই জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ভুলে যাচ্ছে।
কিন্তু ইসলাম কখনোই দুনিয়াকে সম্পূর্ণভাবে বর্জনের শিক্ষা দেয় না, বরং দুনিয়াকে আখেরাতের সফলতার জন্য একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার নির্দেশ দেয়। তাই একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো দুনিয়ার প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো গ্রহণ করা, তবে তা যেন আখেরাতের প্রস্তুতিতে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।
ইবাদতের ধারণা ইসলামে অত্যন্ত বিস্তৃত। এটি শুধু নামাজ, রোজা, হজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জীবনের প্রতিটি বৈধ ও সৎ কাজ, যা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সম্পাদিত হয়, সেটিও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত।
মানুষের জীবনযাত্রার সৌন্দর্য, সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা কিংবা পারিবারিক ভালোবাসা যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর আনুগত্যের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, তবে একজন প্রকৃত মুমিন তার প্রবৃত্তি ও কামনার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর ভালোবাসাকে অগ্রাধিকার দেবে। দুনিয়াবি প্রয়োজনের চেয়ে দ্বীনি প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়াই প্রকৃত ঈমানের পরিচায়ক।
যে ব্যক্তি দুনিয়ায় ঈমান ও সৎ আমলের মাধ্যমে নিজেকে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হবে, তার জন্য আখেরাতে রয়েছে মহাসাফল্য। আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাত, চিরস্থায়ী শান্তি, নিজের সন্তুষ্টি এবং সর্বোচ্চ নেয়ামত নিজের দর্শন লাভের সৌভাগ্য দান করবেন।
এটি এমন এক পুরস্কার, যা দুনিয়ার কোনো সুখ-সম্পদের সঙ্গে তুলনীয় নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন, তাতে তুমি আখেরাতের নিবাস অনুসন্ধান করো।
তবে তুমি দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না। তোমার প্রতি আল্লাহ যেরূপ অনুগ্রহ করেছেন, তুমিও সেরূপ অনুগ্রহ করো। আর জমিনে ফাসাদ করতে চেয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ ফাসাদকারীদের ভালোবাসেন না’ (সুরা কাসাস : ৭৭)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার প্রকৃত স্বরূপ তুলে ধরে বলেন, ‘তোমরা জেনে রাখো যে, দুনিয়ার জীবন ক্রীড়া-কৌতুক, শোভা-সৌন্দর্য, পারস্পরিক গর্ব এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা মাত্র আর দুনিয়ার জীবন তো ধোঁকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়’ (সুরা হাদীদ : ২০)
এরপর আল্লাহ তায়ালা মানুষকে ক্ষমা ও জান্নাত লাভের জন্য প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে মানুষ দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহ ত্যাগ করে চিরস্থায়ী কল্যাণের পথে অগ্রসর হয়।
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘নিশ্চয় আমি পৃথিবীর ওপর যা কিছু রয়েছে, তা তার জন্য শোভা করেছি, যাতে আমি পরীক্ষা করি যে, কর্মে তাদের মধ্যে কে উত্তম।’ (সুরা কাহাফ : ৭)
অতএব, দুনিয়ার সৌন্দর্য কোনো বিভ্রান্তির উপকরণ নয়, বরং এটি মানুষের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় সফল সেই ব্যক্তি, যে দুনিয়াকে আখেরাতের পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণ করে।
পক্ষান্তরে ব্যর্থ সেই ব্যক্তি, যে দুনিয়ার অস্থায়ী মোহে আবদ্ধ হয়ে চিরস্থায়ী আখেরাতকে ভুলে যায় এবং নিজের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে দুনিয়ার মোহমুক্ত হয়ে ঈমান ও সৎ আমলের পথে অবিচল থাকার তওফিক দান করুন, আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করুন এবং আমাদের জীবনকে তাঁর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করুন।
লেখক : প্রভাষক, মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাজিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম
/এসএকে