ইরান যুদ্ধে যেভাবে চরম ঝুঁকিতে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি ইরানের অন্যতম বড় একটি ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে পরিচিত।তবে এই জলপথটি

2026-05-20T09:55:48+00:00
2026-05-20T09:55:48+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ইরান যুদ্ধে যেভাবে চরম ঝুঁকিতে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২০ মে, ২০২৬, ৯:৫৫ এএম 
হরমুজের তলদেশে সাবমেরিন ক্যাবল। ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি ইরানের অন্যতম বড় একটি ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে পরিচিত। 

তবে এই জলপথটি কেবল খনিজ তেল বা বাণিজ্যের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পারস্য উপসাগরীয় দেশ, মিশর ও ইউরোপের মধ্যে ইন্টারনেট সংযোগ সচল রাখারও একটি প্রধান করিডর। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও সংঘাতের জেরে এই রুটের বৈশ্বিক ইন্টারনেট যোগাযোগ এখন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির আইনপ্রণেতারা গুগল, মেটা এবং মাইক্রোসফটের মতো বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বার্ষিক ফি বা শুল্ক আরোপ করার বিষয়ে আলোচনা করছেন। মূলত এই কোম্পানিগুলোর ফাইবার-অপটিক বা সাবমেরিন ক্যাবলগুলো হরমুজ প্রণালির তলদেশ দিয়েই গেছে। উল্লেখ্য, সারাবিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ ইন্টারনেট যোগাযোগই সমুদ্রের নিচের এই ক্যাবলগুলোর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। 

মঙ্গলবার (১৯ মে) মার্কিন সাময়িকী টাইম ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির তলদেশে থাকা এই ক্যাবলগুলোর সামান্যতম ক্ষতি হলেও পুরো বিশ্বের ইন্টারনেট ব্যবস্থা ধীরগতির বা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। এর প্রভাব কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেমিং বা স্ট্রিমিংয়ের ওপরই পড়বে না; বরং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন, ই-কমার্স, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং সামরিক যোগাযোগের মতো জরুরি ডিজিটাল সেবাগুলোও সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে যাবে।

ক্যাবলগুলোর ওপর ফি নির্ধারণ বা অনুমতিপত্র বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে ইরান সরকার এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো আইন পাস করেনি। তবে সমুদ্রের তলদেশের এই ক্যাবল নেটওয়ার্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা মূলত হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের কর্তৃত্বকে আরও জোরালো করারই একটি অংশ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হলে এর প্রতিবাদে ইরান হরমুজ প্রণালিতে অধিকাংশ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। তারা জানায়, যুদ্ধ শেষ হলে নিরাপদ যাতায়াতের জন্য শুল্ক আদায় করা হবে। এরপর গত ১৩ এপ্রিল মার্কিন নৌবাহিনী জোরপূর্বক এই প্রণালি সচল করার চেষ্টা করলে ইরান একে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের শামিল বলে তীব্র নিন্দা জানায়।

এই পরিস্থিতিতে ইরানের সংসদীয় বোর্ডের সদস্য হোসেইন আলি হাজিদেলিগানি মন্তব্য করেন, “হরমুজ প্রণালি আল্লাহর দেওয়া এক নিয়ামত, যা ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।” এদিকে দেশটির সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি সরাসরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, “আমরা ইন্টারনেট ক্যাবলের ওপরও ফি ধার্য করব।” এমনকি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোও ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা এই ক্যাবলগুলোর জন্য লাইসেন্স ফি এবং বার্ষিক নবায়ন ফি আদায় করতে পারে এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইরানের আইন মেনে চলতে বাধ্য করতে পারে। তারা আরও মনে করিয়ে দিয়েছে যে, এই ক্যাবলগুলোর ক্ষতি হলে বিশ্ব অর্থনীতি প্রতিদিন কোটি কোটি ডলারের লোকসানের মুখে পড়বে।

বিষয়টি নিয়ে আল হাবতুর রিসার্চ সেন্টারের সিনিয়র গবেষক মোস্তফা আহমেদ জানান, “হরমুজ প্রণালি শুধু জ্বালানি পরিবহনের সংকীর্ণ পথ নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল ব্লকিং পয়েন্ট। এই অগভীর ও অস্থির সামুদ্রিক করিডোরে একাধিক ক্যাবলের গুচ্ছ থাকায় এটি বৈশ্বিক ইন্টারনেটের প্রধান দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে।”

টেলিকম গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘টেলিজিওগ্রাফি’-এর তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে মোট পাঁচটি বাণিজ্যিক সাবমেরিন ক্যাবল সিস্টেম চলে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে এশিয়া-আফ্রিকা-ইউরোপ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া-মধ্যপ্রাচ্য-পশ্চিম ইউরোপ সিস্টেম। এছাড়া ‘ফ্যালকন’ এবং ‘গালফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল’ নামের আরও দুটি সিস্টেম ইরানের জলসীমা ব্যবহার করছে। লোহিত সাগর থেকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই করিডরটি এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের মধ্যকার সিংহভাগ ডেটা আদান-প্রদান করে থাকে।

ফলে এখানে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার দেশগুলোই সবচেয়ে বড় বিপদে পড়বে। বিশেষ করে কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতের মতো বিকল্প ক্যাবলহীন দেশগুলোর যোগাযোগ তাৎক্ষণিকভাবে অচল হয়ে যাবে। তবে সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশের জন্য বিকল্প স্থলপথ বা লোহিত সাগরের রুট ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

টাটা ও কমিউনিকেশনসের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট জিনিয়াস ওয়াং জানান, টেলিকম অপারেটরেরা সাধারণত এমনভাবে নেটওয়ার্ক তৈরি করেন যাতে সেকেন্ডের মধ্যে বিকল্প রুটে ডেটা পাঠানো যায়। তবে গবেষক মোস্তফা আহমেদের মতে, হরমুজ প্রণালির ডেটার চাপ এত বেশি যে, বড় কোনো ক্ষতি হলে বিকল্প রুটগুলো তা সামাল দিতে পারবে না। উদাহরণস্বরূপ, ভারতে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ইন্টারনেট বিভ্রাট হলে দেশটির আইটি খাতে প্রায় ৯২০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে।

সাধারণত সাগরে জাহাজের নোঙরের টানে প্রায়ই ক্যাবল কেটে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এগুলো মেরামত করা অত্যন্ত কঠিন। বিশ্বে মাত্র ৬০টির মতো বিশেষায়িত মেরামতকারী জাহাজ রয়েছে, যাদের যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করতে হলে সামরিক পাহারার প্রয়োজন হবে। তাছাড়া বিমা কোম্পানিগুলোও এই ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে বীমা দিতে চাইবে না।

আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে স্থাপন করা ক্যাবলের ওপর ইরানের হঠাৎ করে ‘সুরক্ষা ফি’ বা শুল্ক দাবি করা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। তাছাড়া ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বেশিরভাগ ক্যাবল ওমানের জলসীমা দিয়ে নেওয়া হয়েছে, যেখানে ইরানের কোনো আইনি অধিকার নেই। অন্যদিকে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আমেরিকার প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর পক্ষে ইরানকে কোনো অর্থ দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ক্যাবলগুলোতে নাশকতার ঝুঁকি বাড়বে, যা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে এই অঞ্চল থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নিতে বাধ্য করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইরান ডুবুরিদের মাধ্যমে, পানির নিচের চালকহীন যান ব্যবহার করে, মাইন পেতে কিংবা বাণিজ্যিক জাহাজের নোঙর টেনে এই ক্যাবলগুলো ছিঁড়ে ফেলতে পারে। এর আগে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় কয়েকটি সাবমেরিন কেবল কেটে গিয়েছিল, যার ফলে ইউরোপ-এশিয়ার প্রায় ৭০ শতাংশ ইন্টারনেট ট্রাফিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

ইরানের এই ধরনের কঠোর অবস্থান তেল-নির্ভরতা থেকে বের হয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ক্লাউড প্রযুক্তির দিকে এগিয়ে যেতে চাওয়া উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বড় ধাক্কা হবে। যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব মাইক্রোসফট, অ্যামাজন এবং গুগলের সঙ্গে মিলে শত কোটি ডলারের ডেটা সেন্টার তৈরি করছে, যা সম্পূর্ণ সাবমেরিন ক্যাবলের ওপর নির্ভরশীল। তাই ইন্টারনেট অবকাঠামোতে আঘাত বা এর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে একটি বড় ‘অস্তিত্বের সংকট’ তৈরি করতে পারে।

সময়ের/জেডি 


  বিষয়:   ইরান যুদ্ধ  ঝুঁকি  ইন্টারনেট ব্যবস্থা  হরমুজ 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: