বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির বড় সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছে রাশিয়ার তেল খাত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার সিদ্ধান্তের পর, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও ট্যাঙ্কার ভাড়া করার জন্য বিভিন্ন দেশের মধ্যে এক ধরনের মরিয়া ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
গত ১০ মার্চ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে এক ফোনালাপের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইরানের কারণে হরমুজ প্রণালীতে যে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা মেটাতে যুক্তরাষ্ট্র ‘নির্দিষ্ট কিছু দেশের’ জন্য রাশিয়ার তেলের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেবে। উল্লেখ্য, স্বাভাবিক সময়ে এই প্রণালীটি দিয়েই মধ্যপ্রাচ্যের উৎপাদক দেশগুলোর উৎপাদিত বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস রপ্তানি করা হয়।
সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (CREA)-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথম দুই সপ্তাহেই তেল বিক্রি থেকে রাশিয়া অতিরিক্ত ৬৭২ মিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৭৭৭ মিলিয়ন ডলার) আয় করেছে।
যুদ্ধাবস্থায় ইসরাইল ইরানের প্রধান সাউথ পার্স গ্যাস ক্ষেত্রে বোমাবর্ষণ করে এবং ইরানও পাল্টা আঘাত হিসেবে কাতারের বিশ্বের বৃহত্তম ‘রাস লাফান’ এলএনজি কেন্দ্রসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালায়। এই সংঘাতের জেরে ‘ইউরাল’ তেলের দাম যুদ্ধ-পূর্ববর্তী ৬০ ডলারের নিচ থেকে লাফিয়ে ব্যারেলে প্রায় ৯০ ডলারে ঠেকেছে।
প্যারিসভিত্তিক স্বতন্ত্র জ্বালানি বিশ্লেষক জর্জ ভলোশিন আল জাজিরাকে জানান, হরমুজ প্রণালী ইরানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল মধ্যপ্রাচ্যের তেল অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
বৈশ্বিক বাজারে তেলের তীব্র সংকট ও মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র তাই বাধ্য হয়ে সমুদ্রপথে পরিবাহিত রুশ তেলের ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। সংকট শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা যুদ্ধের আগে ছিল মাত্র ৬৫ ডলারের কাছাকাছি।
ভলোশিনের মতে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বাজারে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তার সম্পূর্ণ সুবিধা পাচ্ছে মস্কো। বিশ্বের শোধনাগারগুলো এখন বিকল্প হিসেবে ‘মিডিয়াম-সাওয়ার ক্রুড’ পাওয়ার জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছে, যা রাশিয়ার ‘ইউরালস গ্রেড’ তেল দিয়ে সহজেই পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। মার্কিন সরকারের এই ছাড় মূলত রুশ তেলকে বৈশ্বিক বাজারে একচ্ছত্র বিকল্প হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার কারণে দীর্ঘদিন ৬০ ডলারের নিচে থাকা ইউরাল তেলের দাম এখন আকাশচুম্বী। ভলোশিন বলেন, অতীতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ব্রেন্ট ক্রুডের চেয়ে রুশ তেল অনেক কম দামে বিক্রি হলেও, বর্তমান সংকটে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় সেই ব্যবধান ঘুচে গেছে। ক্রেতারা এখন আইনি বাধ্যবাধকতার চেয়ে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। ফলে জি-৭ নির্ধারিত ৬০ ডলারের সর্বোচ্চ সীমার চেয়ে অনেক বেশি দামেই এই তেল বিক্রি হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার পর গত তিন সপ্তাহে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার পরিমাণ ব্যাপক হারে বাড়িয়েছে। ভলোশিন জানান, এই মুহূর্তে রাশিয়ার সমুদ্রপথের তেলের সিংহভাগই কিনছে ভারত ও চীন।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতই প্রথম দেশ যারা রাশিয়ার তেল আমদানির জন্য মার্কিন ট্রেজারি থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আইনি ছাড় পেয়েছে। বিতর্কিত জলপথের ঝুঁকি ও অতিরিক্ত বীমা খরচ এড়াতে এবং নিজেদের জরুরি মজুদ গড়ে তুলতে ভারত এই পথ বেছে নিয়েছে। অথচ কিছুদিন আগেও ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার তেল কেনার অপরাধে ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করেছিল, যা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে মার্কিন তেল কেনার আশ্বাসের পর তুলে নেওয়া হয়।
পাশাপাশি তুরস্কও এখন রুশ তেলের বড় ক্রেতা হয়ে উঠেছে, কারণ সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডে হামলার পর দেশটিতে যে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, তা তারা রাশিয়ার তেল দিয়ে সামাল দিচ্ছে। এছাড়া স্যাটেলাইট ট্রাকিং-এর বাইরে থাকা একটি ‘ছায়া নৌবহর’ বা পুরোনো ট্যাঙ্কারের গোপন বহর দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ছোট ছোট শোধনাগারগুলোতে গোপনে রুশ তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বাজারে দৈনিক ৮০ লাখ ব্যারেল তেলের ঘাটতি রয়েছে। এই সরবরাহ সংকট বজায় থাকলে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় নিষেধাজ্ঞা দিলেও ভারতের মতো আমদানিকারক দেশগুলো নিজেদের অর্থনীতি সচল রাখতে রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করবে না। তবে দ্বিতীয় দফায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা এলে ক্রেতারা ঝুঁকির ক্ষতিপূরণ হিসেবে রাশিয়ার কাছে অনেক কম দাম দাবি করতে পারে। যদিও বাজারের অস্থিরতা বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্র এই ছাড়ের মেয়াদ আরও বাড়ানোর সম্ভাবনাই বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওপেক (OPEC) বহির্ভূত দেশগুলোর মধ্যে নরওয়ে এবং কানাডাও এই পরিস্থিতি থেকে লাভবান হতে পারে। নরওয়ে ইতোমধ্যে ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ তেল-গ্যাস উৎপাদনের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে কানাডাও মার্কিন উপকূলে তাদের রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তবে পাইপলাইন ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে স্বল্প মেয়াদে তাদের উৎপাদন হঠাৎ করে বাড়ানো কঠিন।
সূত্র: আল জাজিরা
সময়ের আলো/জেডি