নরওয়ে সফর, 'অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে' নরেন্দ্র মোদি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

৪৩ বছরের মধ্যে প্রথমবার নরওয়ে সফরে গেলেন ভারতীয় কোনো প্রধানমন্ত্রী। আর এই সফরে সমালোচনা যেন পিঁছু ছাড়ছে না ভারতের প্রধানমন্ত্রী

2026-05-21T01:50:35+00:00
2026-05-21T01:50:35+00:00
 
  শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬,
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
নরওয়ে সফর, 'অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে' নরেন্দ্র মোদি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ১:৫০ এএম 
নরওয়ে সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি : সংগৃহীত
৪৩ বছরের মধ্যে প্রথমবার নরওয়ে সফরে গেলেন ভারতীয় কোনো প্রধানমন্ত্রী। আর এই সফরে সমালোচনা যেন পিঁছু ছাড়ছে না ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। এর আগে ১৯৮৩ সালে নরওয়ে সফর করেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে নরওয়ের একটি সংবাদপত্র। মোদীকে 'সাপুড়ে' চিত্রিত করে প্রকাশিত চিত্রটিকে ‘বর্ণবাদী’ এবং ভারত সম্পর্কে ‘ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি’ প্রচার বলে সমালোচনা করছেন অনেকেই। 

তবে এর আগেই ভারত-নরওয়ের যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্ন করার সুযোগ না থাকা কেন্দ্র করে বিতর্কের শুরু হয়। ভারতীয় কূটনীতিক ও নরওয়েজিয়ান সাংবাদিকদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে ভারতে ‘মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা’র প্রশ্ন আলোচনায় আসে নতুন করে।

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব সিবি জর্জ এবং নরওয়েজিয় সাংবাদিক হেলে লিং-এর মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে ভারত ও নরওয়ের বিভিন্ন গণমাধ্যমে। মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়াসহ নেট দুনিয়ায়।

বিষয়টি নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে বিতর্ক। নরওয়েতে সাংবাদিকদের প্রশ্ন করার সুযোগ না দেওয়ায় নরেন্দ্র মোদীর তীব্র সমালোচনা করেন বিরোধীদলীয় ও কংগ্রেস পার্টির নেতা রাহুল গান্ধী। 

‘কয়েকটি প্রশ্নের মুখে আতঙ্কিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীকে পালাতে’ দেখে বিশ্বের সামনে ভারতের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট করেন রাহুল গান্ধী।   

কী ঘটেছিলো
সোমবার নরওয়ের রাজধানী ওসলোতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার নরওয়েজিয় সমকক্ষ ইয়োনাস গাহর স্তোরের একটি যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় ঘটনার সূত্রপাত হয়। ব্রিফিং শেষে যখন দুই নেতা সভা ত্যাগ করছিলেন, তখনই সাংবাদিকদের মধ্য থেকে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী মোদি, আপনি বিশ্বের সবচেয়ে মুক্ত গণমাধ্যম থেকে কিছু প্রশ্ন কেন নিচ্ছেন না?

প্রশ্ন-উত্তরের কোনো সুযোগ না রেখেই প্রেস ব্রিফিং শেষ করায় নরেন্দ্র মোদীকে উদ্দেশে করে প্রশ্নটি করেন।
স্থানীয় সংবাদপত্র 'দাগসাভিসেন' এর সাংবাদিক হেলে লিং। তবে প্রশ্নে সাড়া না দিয়েই সভাস্থল ত্যাগ করেন নরেন্দ্র মোদি।

পরে এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ শেয়ার করে ভারতের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন হেলে লিং। যেখানে ‍তিনি লিখেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আমার প্রশ্নের উত্তর দেননি, আমিও অবশ্য তার থেকে এটি আশা করিনি।’

বিষয়টি নরওয়ের ভারতীয় দূতাবাসের নজরে এলে লিং-এর পোস্টটি শেয়ার করে আরেকটি পোস্ট করে তারা।   
যেখানে সেদিনের পরবর্তী প্রেস ব্রিফিংয়ে লিং-কে প্রশ্ন করার জন্য ‘স্বাগত’ বলে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

ভারতীয় দূতাবাসের এই প্রেস ব্রিফিংয়ে লিং বলেন, ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন ভারতকে বিশ্বাস করা উচিত’ এই প্রশ্নটি তিনি মোদিকে করতে চেয়েছিলেন। 

ভারতীয় কূটনীতিক সিবি জর্জ এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন ভারতের সংবিধান গণতন্ত্র এবং চিন্তা, প্রকাশ, বিশ্বাস ও উপাসনার স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। এই কূটনীতিক আরও বলেন,‘মানুষ ভারতের বিশালতা সম্পর্কে কিছুই বোঝে না। তারা কোনো এক অজ্ঞাত, অজ্ঞ এনজিওর প্রকাশিত দু-একটি প্রতিবেদন পড়ে এখানে এসে প্রশ্ন করে।’

আর এই পাল্টা বাক্যবিনিময় নিয়েই সমালোচনা শুরু হয়। সেই সমালোচনা তুঙ্গে ওঠে নরেন্দ্র মোদিকে 'সাপুড়ে' হিসেবে চিত্রিত করে একটি কার্টুন প্রকাশের পর।

নরওয়েজিয় সাংবাদিক হেলে লিং-এর প্রশ্নের ধরন ও উদ্দেশ্য নিয়ে সমালোচনাও দেখা যায়। 
সংবাদ মাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে’র এক প্রতিবেদনে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিং দেওয়া পোস্টটিকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘পরবর্তীতে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খোলামেলাভাবেই স্বীকার করেছিলেন যে, মঞ্চে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ছুঁড়ে দেওয়া তার প্রশ্নটির উত্তর মোদী দেবেন, এমনটা তিনি কখনোই আশা করেননি। প্রোটোকল বা নিয়মকানুন তার জানা ছিল।’

‘তা সত্ত্বেও তিনি চিৎকার করে প্রশ্নটি করেছিলেন। এরপর যা ঘটেছিল, তা হলো ভাইরাল মিডিয়ার সেই চিরচেনা আধুনিক চক্রে আবর্তন। অ্যালগরিদমের জোয়ার, একের পর এক সোশ্যাল মিডিয়া থ্রেড এবং আত্মরক্ষামূলক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। তার পরবর্তী প্রতিটি পোস্টের সাথে সাথে স্পটলাইট বা মূল মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু সরে যেতে থাকে’ বলেও মন্তব্য করা হয় প্রতিবেনটিতে।


ভারত ও নরওয়ের সম্পর্ক
আর্কটিক বা সুমেরু অঞ্চলের কোনো দেশের সাথে ভারতের কোনো স্থল বা সমুদ্র সীমা নেই। তবে নরওয়ের সাথে ভারতের সম্পর্ক বেশ পুরানো। ১৯২০ সালে ভারত নরওয়ের সাথে 'সোয়ালবার্ড চুক্তি' স্বাক্ষর করে। 

সোয়ালবার্ড চুক্তিতে সোয়ালবার্ডের ওপর নরওয়ের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করা হয়। এই চুক্তি অনুসারে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোকে সোয়ালবার্ডে মাছ ধরা, শিকার, শিল্প খনি, বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং খনিজ অধিকারসহ সম্পত্তি মালিকানার সুবিধা দিতে পারে নরওয়ে।

এই চুক্তির আওতায় ২০০৭ সালে ভারত আর্কটিক অঞ্চলে গবেষণার জন্য একটি বৈজ্ঞানিক দল পাঠায়। এবং ২০০৮ সালে 'হিমাদ্রি' নামে একটি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করে। এছাড়াও আর্কটিক অঞ্চলের জলবায়ু এবং বরফ গলে যাওয়া কীভাবে ভারতের মৌসুমি বায়ুকে প্রভাবিত করে, তা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে ভারত।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত আর্কটিক অঞ্চলে তার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়াতে আগ্রহী বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকগণ। আর সেই পরিকল্পনার অংশ হিসাবে ভারত এবং নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও ডেনমার্ক এই পাঁচটি নর্ডিক দেশ কৌশলগত ও বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে ওসলোতে একটি সম্মেলন হয়। 

গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ভারত-নর্ডিক শীর্ষ সম্মেলনটি ছিল এই আয়োজনের তৃতীয় আসর। প্রথম আসরটি ২০১৮ সালে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে এবং দ্বিতীয়টি ২০২২ সালে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয়। 

সেই সম্মেলন শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্ন করার সুযোগ না দেওয়ায় সূত্রপাত ঘটে এই পাল্টাপাল্টি বাক্যবাণের। নরওয়েজিয়ান সাংবাদিক হেলে লিং এর প্রশ্ন ঘিরে জন্ম নেয় আরও কিছু প্রশ্নের, যেখানে ভারতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।  

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ভারত
'রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস' প্রকাশিত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে নরওয়ে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে সেই তালিকায় ভারত ১৫৭তম অবস্থানে রয়েছে। 

কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস-এর এশিয়া প্যাসিফিক প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর কুনাল মজুমদার কাতার ভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বড় গণতান্ত্রিক দেশের নেতারা যখন নিয়মিত উন্মুক্ত সংবাদ সম্মেলন করেন না, যেখানে সাংবাদিকরা পূর্বনির্ধারিত নয় এমন প্রশ্ন করতে পারেন না, তখন তা বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও কর্মীদের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়।

কুনাল আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষেত্রে তার ক্ষমতায় থাকার সময়ে এমন সুযোগ অত্যন্ত বিরল।

২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। তার ১২ বছরের শাসনামলে ভারতের অভ্যন্তরে একটি সংবাদ সম্মেলনও করেননি এবং বিদেশ সফরের সময়ও তিনি খুব কমই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে। 

২০২৪ সালে দ্যা ডিপ্লোম্যাট প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে হিন্দুস্থান টাইমসের সাংবাদিক স্নিগেন্ধু ভট্টাচার্য বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গত দশ বছরে নরেন্দ্র মোদি মাত্র একবারই সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। ২০১৯ সালের সেই সম্মেলনে তিনি নিজে কোনো উত্তর না দিয়ে তার সহকর্মী অমিত শাহকে সব প্রশ্নের জবাব দিতে দিয়েছিলেন।

এছাড়াও ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতি সরকারের কঠোর দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাবে সেলফ-সেন্সরশিপের কথা উল্লেখ করে কুনাল মজুমদার বলেন, সাংবাদিকরা আজ যে চাপের মুখোমুখি হচ্ছেন, তা কেবল প্রকাশনার ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

‘প্রতিনিয়ত অনলাইন হেনস্থা, আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে চাপ, কর ও আর্থিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তদন্তের চাপ এবং মূলত ভিন্ন উদ্দেশ্যে তৈরি করা আইনের অপপ্রয়োগ’ এসব বিষয় উল্লেখ করেন তিনি।

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   নরওয়ে  সফর  নরেন্দ্র মোদী  ভারত 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: