টেস্ট ক্রিকেটে বাঁকবদল

মেহেদী হাসান

খেলা

একসময় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট মানেই ছিল অপেক্ষা। কখনো সম্ভাবনার, কখনো অলৌকিক কিছুর, কখনো শুধু সম্মানজনক লড়াইয়ের। জয় এলেও সেটি হতো

2026-05-21T02:06:09+00:00
2026-05-21T02:06:09+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
খেলা
টেস্ট ক্রিকেটে বাঁকবদল
মেহেদী হাসান
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ২:০৬ এএম 
পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশের পর মুশফিক-শান্তদের উচ্ছ্বাস। ছবি : সংগৃহীত
একসময় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট মানেই ছিল অপেক্ষা। কখনো সম্ভাবনার, কখনো অলৌকিক কিছুর, কখনো শুধু সম্মানজনক লড়াইয়ের। জয় এলেও সেটি হতো বিচ্ছিন্ন কোনো গল্প। ধারাবাহিকতা ছিল না, ছিল না বড় দলকে চোখে চোখ রেখে হারানোর সাহসও। কিন্তু সিলেটের মেঘলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে এবার যেন লাল বলের ক্রিকেটে নতুন এক বাংলাদেশের জন্ম দেখল ক্রিকেটবিশ্ব। যে দল ভয় পায় না, চাপের সামনে ভেঙে পড়ে না, বরং প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে ইতিহাস লিখতে জানে।

পাকিস্তানকে টানা দুই টেস্ট সিরিজে হোয়াইটওয়াশ, সেটিও ঘরের মাঠ ও প্রতিপক্ষের মাঠ মিলিয়ে টানা চার টেস্ট জিতে। বাংলাদেশের ২৬ বছরের টেস্ট যাত্রায় এমন গৌরবের অধ্যায় আর কখনো লেখা হয়নি। তাই সিলেটের এই জয় কেবল আরেকটি সিরিজ জয়ের গল্প নয়, এটি যেন বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে নতুন সূর্য উঠার ঘোষণা। এই জয়ে টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ে প্রথমবার সাতে উঠল, সঙ্গে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের তালিকায় জায়গা করে নিল পাঁচে।

তবে এমন অর্জনের পথে শেষ দিনের সকালটা মোটেও সহজ ছিল না। একটি উইকেট চাই, শুধু একটি উইকেট। সকাল থেকেই যেন সেই অপেক্ষায় ছটফট করছিল বাংলাদেশ। কিন্তু মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সাজিদ খান ক্রমেই ম্যাচটাকে নিয়ে যাচ্ছিলেন অন্যদিকে। রান বাড়ছিল, সঙ্গে বাড়ছিল অস্বস্তি। মাত্র এক ঘণ্টা পেরোলেও মনে হচ্ছিল যেন সময় থেমে গেছে।
সিলেটের আকাশও যেন সেই উত্তেজনার অংশ হয়ে উঠেছিল। সকাল থেকে ছিল মেঘলা আবহাওয়া, থেমে থেমে ঝরছিল বৃষ্টি। ১৫ মিনিট দেরিতে শুরু হয় খেলা। কিন্তু মাঠে নামার পর শুরু হয় পাকিস্তানের পাল্টা লড়াই।

নাহিদ রানার প্রথম ওভারেই সুযোগ এসেছিল। গালিতে রিজওয়ানের ক্যাচ প্রায় হাতে নিয়েও শেষ পর্যন্ত ধরতে পারেননি মেহেদী হাসান মিরাজ। এরপর থেকে বাংলাদেশের জন্য অপেক্ষা ছিল শুধু হতাশার। কখনো বল ব্যাটের কানা ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছে, কখনো দুই ফিল্ডারের মাঝখানে পড়েছে ক্যাচ। অন্যদিকে রিজওয়ান ও সাজিদ খেলেছেন কিছু দারুণ শটও।
৪৩৭ রানের অসম্ভব লক্ষ্যও তখন হঠাৎ একটু বাস্তব মনে হচ্ছিল। বাংলাদেশের বোলাররা চেষ্টা করছিলেন, অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বদলাচ্ছিলেন ফিল্ড সেটিং, কিন্তু কিছুতেই আসছিল না ব্রেক থ্রু। ব্যবধান নেমে আসে একশর নিচে, তারপর আশিরও নিচে। গ্যালারিতেও তখন চাপা উদ্বেগ।

ঠিক তখনই আশীর্বাদ হয়ে আসে পানি পানের বিরতি। বিরতি থেকে ফিরে দ্বিতীয় বলেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন তাইজুল ইসলাম। সিøপে ক্যাচ তুলে দেন সাজিদ খান। ৫৪ রানের জুটি ভাঙতেই যেন হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে পাকিস্তান। শরিফুল ইসলাম আক্রমণে এসে প্রথম বলেই ফিরিয়ে দেন ৯৪ রান করা রিজওয়ানকে। এরপর শেষ উইকেটটিও তুলে নেন তাইজুল।

মাত্র ১৩ বলের মধ্যে শূন্য রান যোগ করেই শেষ তিন উইকেট হারায় পাকিস্তান। যে ম্যাচ কিছুক্ষণ আগেও বাংলাদেশের হাতছাড়া হওয়ার ভয় তৈরি করছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় দাপুটে জয়ে। ৭৮ রানের সেই জয় নিশ্চিত করে পাকিস্তানকে আবারও হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ।

২০২৪ সালে পাকিস্তানের মাটিতে প্রথমবারের মতো ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু এবারের অর্জন যেন আরও বেশি পরিপূর্ণ। কারণ এবার দুই টেস্টেই টস হেরে সবুজাভ উইকেটে আগে ব্যাট করতে হয়েছে শান্তদের। প্রতিকূল কন্ডিশন, চাপ আর প্রতিপক্ষের চ্যালেঞ্জ, সবকিছুকে হারিয়েই এসেছে এই সাফল্য।

এই সিরিজে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানসিক দৃঢ়তা। মিরপুরে চাপের মধ্যে জিতেছে, সিলেটে শেষ দিনের স্নায়ুচাপও সামলেছে। আগের বাংলাদেশ হয়তো এমন পরিস্থিতিতে ম্যাচ হারিয়ে ফেলত, কিন্তু এই দল জানে কীভাবে ম্যাচে ফিরে আসতে হয়।

আর সেই প্রত্যাবর্তনের প্রতীক যেন তাইজুল ইসলাম। বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল টেস্ট বোলার আবারও প্রমাণ করলেন, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থাকলেও কঠিন সময়ে তিনিই দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অস্ত্র। শেষ ইনিংসে ৬ উইকেট, ম্যাচে ৯ উইকেট নিয়ে তিনিই গড়ে দিলেন জয়ের ভিত।

তবে এই জয় কেবল একজনের নয়, এটি পুরো দলের মানসিকতার জয়। লিটন দাসের প্রতিরোধ, মুশফিকুর রহিমের অভিজ্ঞতা, নাহিদ রানার গতি, শরিফুলের আগ্রাসন, শান্তর নেতৃত্ব- সব মিলেই গড়ে উঠেছে নতুন বাংলাদেশ।

জয়ের পর বাংলাদেশের উদযাপনেও ছিল আলাদা এক বার্তা। উল্লাস ছিল, আনন্দ ছিল, কিন্তু ছিল না বাঁধনহারা বিস্ময়। যেন তারা বোঝাতে চাইল, পাকিস্তানকে হারানো এখন আর রূপকথা নয়, এটি এখন তাদের নতুন বাস্তবতা। বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের আকাশে সত্যিই নতুন সূর্য উঠছে।

সময়ের আলো/আআ



  বিষয়:   টেস্ট  ক্রিকেট  বাঁকবদল  বাংলাদেশ  পাকিস্তান 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: