নিরন্তর তেল উত্তোলনে পৃথিবীর বুকে অন্তহীন ক্ষত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

মানবসভ্যতার শিরা-উপশিরায় আজ যে কালো সোনা প্রবাহিত, সেই খনিজ তেলের জন্য আমরা পৃথিবীর বুক চিরে চলেছি নিরন্তর। জ্বালানির অমোঘ চাহিদা

2026-05-21T03:42:29+00:00
2026-05-21T03:42:29+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
নিরন্তর তেল উত্তোলনে পৃথিবীর বুকে অন্তহীন ক্ষত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ৩:৪২ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
মানবসভ্যতার শিরা-উপশিরায় আজ যে কালো সোনা প্রবাহিত, সেই খনিজ তেলের জন্য আমরা পৃথিবীর বুক চিরে চলেছি নিরন্তর। জ্বালানির অমোঘ চাহিদা মেটাতে আমরা ভূগর্ভের অন্ধকার গহ্বর থেকে যে সম্পদ তুলে আনছি, তার পুরো চিত্রটা কিন্তু চকচকে কালো তরলের মতো আকর্ষণীয় নয়। সায়েন্সডটকম, বিবিসি ও দ্য গার্ডিয়ান।

এই মাত্রাহীন আহরণের ফলে মাটির নিচে যে নীরব বিপর্যয় ঘটে চলেছে, তার খেসারত আমাদেরই দিতে হবে। তাও আবার সুদে-আসলে। তেল উত্তোলনকে আমরা সাধারণত একটি অর্থনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু এর আড়ালে একটি ভয়ংকর প্রাকৃতিক বাস্তবতা লুকিয়ে আছে। তা হলো, মাটি থেকে তেল তোলা মানেই ভূগর্ভস্থ পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর একের পর এক ছোবল। এই প্রক্রিয়া কেবল প্রাকৃতিক সম্পদই শেষ করে না, বরং ধীরে ধীরে ভূ-অভ্যন্তরের কাঠামোকেও ভঙ্গুর করে তোলে। 

ভূগর্ভস্থ শূন্যতা ও মাটির তলিয়ে যাওয়া : সবচেয়ে প্রত্যক্ষ যে শারীরিক বিপর্যয়টি ঘটে, তা হলো ভূমিধস বা মাটির তলিয়ে যাওয়া, যার ভূতাত্ত্বিক নাম ‘সাবসিডেন্স’। সমুদ্রের তলদেশে যেমন পানি, তেমনই ভূগর্ভে থাকে বিশাল শিলাস্তর। যার ছিদ্রপথগুলো তেল ও গ্যাসে পরিপূর্ণ। এই তরল ও বায়বীয় পদার্থগুলো একটি স্বাভাবিক চাপ প্রয়োগ করে মাটির নিচের ভারসাম্য রক্ষা করে। 

যখন আমরা বছরের পর বছর ধরে অপরিকল্পিতভাবে সেই তেল তুলে আনি, তখন ওই ফাঁকা জায়গা আর পূর্ণ হয় না। ভূগর্ভে তৈরি হয় বিশাল বিশাল শূন্যস্থান। দীর্ঘদিন এই শূন্যস্থান পূরণের কোনো প্রাকৃতিক ব্যবস্থা না থাকলে, উপরিভাগের পাথর ও মাটির স্তর দুর্বল হয়ে পড়ে। একসময় তা আর নিজের ওপরের বিশাল চাপ ধরে রাখতে পারে না, এবং মাটি ধীরে ধীরে কিংবা কখনো আকস্মিকভাবে তলিয়ে যেতে শুরু করে।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের কিছু অঞ্চল, এমনকি নেদারল্যান্ডসের গ্রোনিংয়েন গ্যাসক্ষেত্রের ওপরের বিস্তীর্ণ এলাকা আজ এভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে নেমে যাওয়ার হুমকিতে আছে। এটি শুধু একটি ভূতাত্ত্বিক ঘটনা নয়; এটি মানবসৃষ্ট এক ধীরগতির বিপর্যয়, যা ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও সম্পূর্ণ জনপদকে গ্রাস করতে পারে।

সুপেয় পানির আধারে বিষক্রিয়া : এই ক্ষতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো ভূগর্ভস্থ পানির স্থায়ী দূষণ। মাটির নিচে সুরক্ষিত থাকা বিশুদ্ধ পানির স্তর যাকে আমরা বলে থাকি অ্যাকুইফার। সেখানে থাকে আমাদের খাওয়ার পানি, কৃষিজমির সেচ। নদীর মূল প্রবাহের অন্যতম উৎসও এটি। তেল উত্তোলনের সময় এই পানি বিষাক্ত হওয়ার বিপুল আশঙ্কা থাকে। প্রথমত, খননকার্যের সময় বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রিত ‘ড্রিলিং ফ্লুইড’ ব্যবহৃত হয় যা ফাটল দিয়ে পানির স্তরে প্রবেশ করতে পারে। 

দ্বিতীয়ত, পুরোনো বা ত্রুটিপূর্ণ তেলকূপ থেকে তেল নিজেই চুঁইয়ে পড়তে পারে ভূগর্ভস্থ পানিতে। তৃতীয়ত, হাইড্রোলিক ফ্র্যাকচারিং বা ‘ফ্র্যাকিং’-এর মতো প্রযুক্তিতে যে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক-মিশ্রিত পানি উচ্চচাপে মাটির নিচে প্রবেশ করানো হয়, তা সরাসরি পানির স্তরকে দূষিত করে ফেলে। এই দূষণ একবার ঘটলে তা আর দূষণমূক্ত হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার কিছু অঞ্চলে আজও গৃহস্থালির পানির ট্যাপ থেকে মিথেন গ্যাস বের হওয়ার ঘটনা তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
 
ভূপৃষ্ঠের চাপের ভারসাম্যহীনতা : খনিজ তেল ও গ্যাস ভূগর্ভে থাকে এক বিশাল প্রাকৃতিক চাপে আবদ্ধ হয়ে। এই চাপই হলো মূল চালিকাশক্তি। কূপ খোঁড়ার পর বিপুল চাপে এই তেল-গ্যাস উপরে উঠে আসে। যখন আমরা পরিকল্পনাহীনভাবে অনবরত তেল তুলতেই থাকি, তখন সেই স্বাভাবিক চাপ কমতে থাকে। একে বলে ‘রিজার্ভয়ার প্রেশার ডিপ্লিশন’।

এই চাপ কমে যাওয়া মানে শুধু ভবিষ্যতে তেল তোলার গতি মন্থর হওয়া নয়, বরং একটি ভয়ানক অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ফাঁদ। যখন ভূগর্ভের শক্তিক্ষয় হয়, তখন বিপুল পরিমাণ তেল মাটির পাথরের ছিদ্রে আটকে থেকে যায়, যা উত্তোলন করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। অতি উন্নত ও ব্যয়বহুল প্রযুক্তি ছাড়া সেই তেল আর তোলা যায় না। 

শিলাস্তরে চিড় এবং ভূ-কম্পন : তেল উৎপাদনের সঙ্গে ভূমিকম্পের সরাসরি যোগসূত্র এখন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। সাধারণত ভূগর্ভস্থ ভূতাত্ত্বিক চ্যুতিরেখাগুলোতে স্বাভাবিক চাপ বিরাজ করে। কিন্তু যখন তেল-গ্যাস তুলে বিপুল শূন্যতা সৃষ্টি হয় বা ফ্র‍্যাকিং-এর জন্য পানি ঢুকিয়ে শিলাস্তরে চাপ প্রয়োগ করা হয়, তখন সেই চাপ ভূতাত্ত্বিক ফল্টগুলোর সক্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে স্থানীয়ভাবে সৃষ্টি হয় মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প, যাকে বলে ‘ইনডিউসড সিসমিসিটি’।

ওকলাহোমার মতো এককালের ভূমিকম্পহীন মার্কিন রাজ্য সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ফ্র‍্যাকিং বর্জ্য পানি পুনঃপ্রবেশের কারণে শত শত ভূমিকম্পের সাক্ষী হয়েছে। বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছোট-বড় ভূমিকম্পের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যার পেছনে প্রতিবেশী দেশগুলোর অতিরিক্ত গ্যাস ও তেল উত্তোলনকেও দায়ী করেন বিশেষজ্ঞরা। বিষয়টি উপেক্ষা করার মতো নয়, কারণ বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে সামান্য ভূমিকম্পও বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

বাস্তুতন্ত্রের সর্বনাশ : সব শেষে আসে সরাসরি বিপর্যয়ের কথা, যা আমাদের চোখের সামনে ঘটে। আর তা হলো তেল নিঃসরণ বা ‘অয়েল স্পিল’। অর্থাৎ পাইপলাইন বিস্ফোরণ, জাহাজডুবি, কিংবা কূপের মুখ দিয়ে অসাবধানতাবশত তেল বেরিয়ে পড়া। তবে যে কারণেই হোক, এই কালো তরল একবার প্রকৃতিতে মিশলে তা হয়ে ওঠে এক সর্বগ্রাসী মৃত্যুফাঁদ। সামুদ্রিক তেল নিঃসরণের কথা তো আমরা জানি, যেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠ তেলের আস্তরণে ঢেকে যায়, সামুদ্রিক পাখি আর মাছের জীবনাবসান ঘটে, ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস হয়।

তবে স্থলভাগেও এই দূষণ কম ভয়াবহ নয়। বাংলাদেশের হরিপুর কিংবা সিলেট অঞ্চলে তেলের খনি ও পাইপলাইনের আশপাশের জমি ক্রমশ অনুর্বর হয়ে পড়ছে। ধানক্ষেতে তেলের আস্তরণ পড়ায় মাটি উর্বরতা হারাচ্ছে। স্থানীয় মাছ, ব্যাঙ, সাপ, পাখি- সমগ্র খাদ্যশৃঙ্খলই এই বিষক্রিয়ায় পর্যদুস্ত।

ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেসের অমেরুদণ্ডী প্রাণীবিদ্যা ও ভূতত্ত্ব বিভাগের কিউরেটর ড. পিটার রূপনারিন ২০১০ সালের ডিপওয়াটার হরাইজন বিপর্যয়ের পর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন। ২০২১ সালে পিএলওএস ওয়ান জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় তিনি উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের ভয়াবহ দূষণের চিত্র তুলে ধরেছেন। ড. রূপনারিন দীর্ঘমেয়াদি এই দূষণের ব্যাপকতা সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন, যতদিন আমরা আমাদের গ্রহের পেট চিরে পেট্রোলিয়াম উত্তোলন চালিয়ে যাব, ততদিন আমরা উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রগুলোকে দূষণের মুখে ঠেলে দিতেই থাকব।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, তেল উত্তোলনকে আর কেবল জ্বালানি নিরাপত্তা বা রাজস্ব আয়ের চশমায় না দেখে, একে দেখতে হবে প্রকৃতির বিরুদ্ধে চালানো এক গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে। মাটির নিচে আমরা যে অস্ত্রোপচার চালাচ্ছি, তার প্রতিটি কাটা-ছেঁড়া পৃথিবীর দেহে অমোচনীয় ক্ষত তৈরি করছে। ভূমি ধসে যাচ্ছে, পানিতে বিষ মিশছে, ভূগর্ভের চাপের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ভবিষ্যতের সম্পদ আমরা বিনষ্ট করছি, আর সৃষ্টি করছি কৃত্রিম ভূমিকম্পের মতো নতুন দুর্যোগ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরাসরি জীববৈচিত্র্যের বিনাশ। তাই তেলের এ নেশা যত মধুরই হোক, এর পরিণাম যে তিক্ত এ সত্যটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

সময়েল আলো/আআ


  বিষয়:   নিরন্তর  তেল  উত্তোলন  পৃথিবী  ক্ষত 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: