বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী একটি উপজেলা কসবা। এই উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন সরাসরি ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায় ভৌগোলিক ও সামাজিক কারণে এ অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থায় কিছু ভিন্নধর্মী চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সীমান্তবর্তী ইউনিয়নগুলোর কিছুসংখ্যক শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয় বা মাদরাসায় ভর্তি হলেও হঠাৎ করেই পড়ালেখা থেকে দূরে সরে যায়।
শিশুরা প্রথমে টানা কয়েকদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে। এরপর মাঝে মধ্যে দু-একদিন স্কুলে এলেও দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে তারা ক্লাসের নতুন পড়ার সাথে সহজে খাপ খাওয়াতে পারে না। ফলে, ক্লাসে পড়া না পারার কারণে শিক্ষকের বকুনি এবং নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ভয়ে একসময় তারা স্থায়ীভাবে স্কুল ফাঁকি দিতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে ঝরে পড়ে।
এই শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার পেছনে পারিবারিক উদাসীনতা, সামাজিক পরিবেশ ও অর্থনৈতিক সংকট ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অনেক পরিবারের পিতা-মাতা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন হওয়ায় শিক্ষার প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেন না। চরম অর্থনৈতিক অনটনের কারণে তারা সন্তানের লেখাপড়ার ব্যাপারে উদাসীন থাকেন এবং সন্তানদের পারিবারিক কাজে ব্যস্ত রাখেন।
ফলে শিশুরা একসময় স্কুল ও তাদের স্কুলগামী সহপাঠীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বড় সংকট হলো, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে অনেক পরিবার মাদক ও চোরাচালান ব্যাবসার সাথে যুক্ত। চোরাকারবারিরা কাঁচা টাকার লোভ দেখিয়ে দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে ব্যবহার করে ভারতীয় কাঁটাতার ভেদ করিয়ে বিএসএফ-এর গুলির মুখে ঠেলে দেয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে কয়েক দিনের সমপরিমাণ টাকা উপার্জন করা যায় বলে পরিবারে বড়দের দেখে শিশুরা খুব ছোটোবেলাতেই এই অন্ধকার পেশায় জড়িয়ে পড়ে।
অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, পরিবারের নারী সদস্যরাও অনেক সময় এই অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছেন, যার ফলে সন্তানেরা মাদক ব্যাবসা ও মাদকাসক্তিতে লিপ্ত হয়ে পরিবারের জন্য মরণাস্ত্র হয়ে উঠছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আমাকে এমন শত পিতা-মাতার আহাজারি শুনতে হয়েছে এবং সন্তানদের নিরাময় কেন্দ্র কিংবা পূর্ণবয়স্কদের জেল-হাজতে পাঠাতে হয়েছে। অথচ সামান্য কাঁচা টাকার লোভে না পড়ে তারা যদি সচেতন হতেন, তবে বর্ডার বাণিজ্য ও ঝরে পড়া শিশুর হার— উভয়ই কমানো সম্ভব হতো।
কসবা উপজেলার আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলোর দিকে তাকালে ঝরে পড়ার আরেকটি চিত্র ফুটে ওঠে। এখানকার দরিদ্র মানুষ জীবিকার তাগিদে খুব ভোরেই ঘর থেকে বের হয়ে যান; পুরুষেরা অটোরিকশা, সিএনজি, বাস-ট্রাকের ড্রাইভারি বা হেল্পারি করেন এবং নারীরাও বিভিন্ন কর্মে লিপ্ত থাকেন। কিছু আশ্রয়ণ প্রকল্প হাইওয়ের পাশে অবস্থিত হওয়ায় এবং সেখান থেকে স্কুল-মাদরাসা দূরে থাকায়, অভিভাবকেরা নিরাপত্তার অভাবে ছোট বাচ্চাদের একাকী স্কুলে পাঠাতে চান না। ফলে শিশুরা নিয়মিত অনুপস্থিত থাকতে থাকতে একসময় ছিটকে পড়ে এবং বিভিন্ন দোকান বা হোটেলে শিশুশ্রমে নিযুক্ত হয়। প্রাথমিকে ঝরে পড়া রোধে শিশুশ্রম বন্ধে আরও কঠোর ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
উপজেলা প্রশাসন কসবা অঞ্চলের এই সংকট নিরসনে মাঠ পর্যায়ে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের স্কুলে ধরে রাখতে তাদের অভিভাবকদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। বেশ কিছু পরিবারকে সেলাই মেশিন দেওয়া হয়েছে যেন তারা আয়ের উৎস খুঁজে পায়।
এছাড়া বিভিন্ন এনজিও-র মাধ্যমে হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশু পালনের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষকদের মাধ্যমে এই শিশুদের শিক্ষার নিয়মিত খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিদ্যালয়গামী রাস্তা তৈরি ও মেরামত, বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ, মাঠ সংস্কার এবং নতুন খেলার মাঠ প্রস্তুত করা হয়েছে, যা শিশুদের স্কুলমুখী করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। ঝরে পড়ার হার আরও কমিয়ে আনতে সরকারি উপবৃত্তির পাশাপাশি সকল শিক্ষার্থীর জন্য অভিন্ন স্কুল ড্রেস এবং 'মিড ডে মিল' (দুপুরের খাবার) চালু করা প্রয়োজন। সেই সাথে নিয়মিত 'মা সমাবেশ' ও 'অভিভাবক সমাবেশ'-এর মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইভটিজিং প্রতিরোধে প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান এবং সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা আবশ্যক।
কেবল বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়, শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। অনেক বিদ্যালয়ে দৈনিক সমাবেশ বা অ্যাসেম্বলি করার মতো মাঠ নেই কিংবা থাকলেও তা সংস্কারহীন, এগুলো মেরামত করার পাশাপাশি নতুন ভবন নির্মাণের মাধ্যমে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের মধ্যকার দলাদলি ও নোংরা রাজনীতি এবং স্কুলভিত্তিক কোচিং বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ করা প্রয়োজন। আনন্দপূর্ণ পরিবেশে পাঠদানের জন্য আধুনিক ও মাল্টিমিডিয়া প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং প্রতিটি স্কুলে লাইব্রেরি স্থাপন করে প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের অন্তত এক ঘণ্টা সেখানে পড়ার সুযোগ করে দিতে হবে।
শিক্ষার মান বাড়াতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি এবং নিবিড় তদারকি নিশ্চিত করা আবশ্যক। কসবা উপজেলায় শিক্ষকদের সঠিক সময়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে একটি ডিজিটাল উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রতিদিন সকাল ৯:০০টায় শিক্ষকেরা স্কুলে উপস্থিত হয়ে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন এবং ৯:২০ মিনিটের মধ্যে সেই ছবি শিক্ষা অফিসারের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পাঠান। এর ফলে শিক্ষকদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে এবং ছুটির সময়েও ভিডিও কলের মাধ্যমে উপস্থিতি যাচাই করা হয়।
এছাড়া প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানকে দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের বাড়িতে 'হোম ভিজিট' করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকেরা ৮-১০ জন শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিয়ে তাদের হোমওয়ার্ক দেবেন এবং তা আদায় করবেন। এই গ্রুপগুলোর কোনো শিক্ষার্থী পড়া না বুঝলে সহপাঠী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক মিলে তাকে বুঝিয়ে দেবেন। তবে শিক্ষকদের এই আন্তরিকতা বজায় রাখতে তাদের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং ঝরে পড়া রোধের এই লড়াইয়ে প্রশাসনের পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অভিভাবকগণ যদি তাদের সন্তানদের পড়ালেখার নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখেন, তবে শিক্ষার্থীরা আড্ডাবাজি ও অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করে পড়াশোনায় মনোযোগী হবে। সকলের সম্মিলিত ও সমন্বিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে যাবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং নিশ্চিত হবে আমাদের সোনামণিদের সুন্দর ভবিষ্যৎ।
সময়ের আলো/জেডি