ট্রাম্প পেল শুধু আনুষ্ঠানিকতা, পুতিনের সঙ্গে অংশীদারত্ব

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে যখন শি জিনপিং বৈঠকে বসেন তখন বাইরে থেকে দৃশ্যগুলো প্রায়

2026-05-22T03:09:25+00:00
2026-05-22T03:09:25+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ট্রাম্প পেল শুধু আনুষ্ঠানিকতা, পুতিনের সঙ্গে অংশীদারত্ব
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬, ৩:০৯ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে যখন শি জিনপিং বৈঠকে বসেন তখন বাইরে থেকে দৃশ্যগুলো প্রায় একই রকম মনে হচ্ছিল। বেইজিংয়ের তিয়ানআনমেন স্কয়ারে আনুষ্ঠানিক করমর্দন, ফুল হাতে শিশুদের উচ্ছ্বসিত অভ্যর্থনা, আর ঝকঝকে বেয়নেট হাতে কুচকাওয়াজরত সেনাদের সারি। 

সবকিছুতেই ছিল রাষ্ট্রীয় জাঁকজমকের ছাপ। কিন্তু এই দুই সফর আরেকটি বাস্তবতাও স্পষ্ট করে দেয়- চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক যেমন এক ধরনের হিসাবি স্থিতিশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে; রাশিয়ার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ততটাই গভীর কৌশলগত অংশীদারত্বে পরিণত হয়েছে। 

ট্রাম্পের সফরে বেইজিংয়ের মূল লক্ষ্য ছিল ওয়াশিংটনের সঙ্গে উত্তেজনা কমানো এবং সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণে রাখা। অন্যদিকে পুতিনের সফর ব্যবহার করা হয় দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত জোট আরও শক্তিশালী করার সুযোগ হিসেবে।

ট্রাম্পের ক্ষেত্রে শি জিনপিং বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন আনুষ্ঠানিক আতিথেয়তায়। তাকে বিরল সম্মান দেখিয়ে ঘুরিয়ে দেখানো হয় ঝংনানহাই নামক চীনের সাবেক রাজকীয় উদ্যান, যা এখন দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্র ও সরকারি সদর দফতর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। 

বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং খুব ভালো করেই বুঝেছিল ট্রাম্প প্রকাশ্য সম্মান ও দৃশ্যমান মর্যাদা অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। তাই ক্যামেরার সামনে তাকে বিশেষ অতিথির মতো উপস্থাপন করতেই বেশি মনোযোগ ছিল চীনের।

কিন্তু পুতিনের ক্ষেত্রে দৃশ্যপট ছিল ভিন্ন। সেখানে বাড়তি আড়ম্বরের প্রয়োজন ছিল না বরং গুরুত্ব পেয়েছে বাস্তব কূটনীতি, কৌশলগত বোঝাপড়া এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতা। 

দুই নেতা পুরোনো বন্ধুত্ব চুক্তি পুনর্ব্যক্ত করেছেন, নতুন জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং আবারও জোর দিয়েছেন তাদের তথাকথিত ‘নো লিমিটস পার্টনারশিপ’-এর ওপর।

দুই সফরের পার্থক্য শুরু হয়েছিল সময়সূচি থেকেই। ট্রাম্প চীনে ছিলেন তিন দিন। পুতিনের সফর ছিল দুদিনের। তবে দুজনকেই তিয়ানআনমেন স্কয়ারে সামরিক আনুষ্ঠানিকতায় স্বাগত জানানো হয়। সামরিক ব্যান্ড, আনুষ্ঠানিক গার্ড এবং পতাকা হাতে শিশুদের অভ্যর্থনায় কোনো কমতি ছিল না। 

দুজনই গ্রেট হল অব দ্য পিপলে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবে ট্রাম্পের সফরে প্রকাশ্যে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরের আয়োজন দেখা যায়নি। বিপরীতে পুতিন ও শি একসঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

ট্রাম্পকে ব্যক্তিগতভাবে টেম্পল অব হেভেন ঘুরিয়ে দেখানো হয়। তিনি ঝংনানহাইয়ের রাজকীয় বাগানেও হাঁটাহাঁটি করেন। অন্যদিকে পুতিনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে গ্রেট হল অব দ্য পিপলের ভেতরে। সেখানে দুই নেতা চীন-রাশিয়া সম্পর্ক নিয়ে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন এবং পরে একসঙ্গে চা পান করেন। 

ট্রাম্পের জন্য এটি ছিল প্রেসিডেন্ট হিসেবে চীনে দ্বিতীয় সফর। কিন্তু পুতিনের জন্য এটি ছিল ২৫তম সফর; যা দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতার আরেকটি ইঙ্গিত বহন করে। তবে সবচেয়ে বড় পার্থক্য ছিল দুই বৈঠকের রাজনৈতিক বার্তায়। 

ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় শি জিনপিং মূলত সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার ওপর জোর দেন। কয়েক মাসের বাণিজ্যযুদ্ধ ও উত্তেজনার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার হিসেবে দেখার আহ্বান জানান। দুই নেতাই ‘কৌশলগত স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে গঠনমূলক চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক’ গড়ে তোলার কথা বলেন।

অন্যদিকে পুতিনের সঙ্গে আলোচনায় শি জিনপিং দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও গভীর করার দিকেই মনোযোগ দেন। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যেখানে এখনও বাণিজ্য সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে, সেখানে মস্কো ও বেইজিং নিজেদের অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে পুনর্ব্যক্ত করেছে। পুতিন স্পষ্ট করে বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের মূল চালিকাশক্তি হলো জ্বালানি খাত। বিশেষ করে তেল ও গ্যাস।

চীন ও রাশিয়া বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৪০টিরও বেশি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। দুই নেতা যৌথ ঘোষণায় নিজেদের ‘বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তিকেন্দ্র’ বলেও উল্লেখ করেন। অন্যদিকে ট্রাম্প ও শি কোনো যৌথ ঘোষণা দেননি। 

এমনকি সফর চলাকালে প্রকাশ্যে কোনো চুক্তিও হয়নি। পরে ওয়াশিংটন জানায়, চীন প্রতি বছর ১৭ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার এবং ২০০টি বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে দুই সম্পর্কের প্রকৃতি। রাশিয়ার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক কাঠামোগত ও দীর্ঘমেয়াদি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এখনও অনেকটাই দরকষাকষি ও স্বার্থের ভারসাম্যের মধ্যে আটকে আছে। তবে পুতিনের সফরেও একটি অপ্রত্যাশিত দিক ছিল।

বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছিলেন, ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প নিয়ে বড় কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হবে। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে মঙ্গোলিয়া হয়ে রাশিয়ার গ্যাস চীনে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে ধরনের কোনো চুক্তি হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এটি রাশিয়ার জন্য একটি বড় ধাক্কা। 

তাইওয়ান প্রশ্নেও দুই সফরের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাইওয়ান ইস্যুতে মস্কো প্রকাশ্যে বেইজিংয়ের পাশে দাঁড়িয়েছে। চীন দ্বীপটিকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে, যদিও তাইওয়ান কার্যত একটি স্বশাসিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট অবস্থান বজায় রেখেছে। তবে ওয়াশিংটন তাইওয়ানের প্রধান অনানুষ্ঠানিক সমর্থক এবং অস্ত্র সরবরাহকারী।

শি জিনপিং ট্রাম্পকে স্পষ্ট করে বলেন, তাইওয়ানই দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি সতর্ক করেন, এই ইস্যু ভুলভাবে সামলানো হলে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘাত তৈরি হতে পারে। ট্রাম্প সফরকালে প্রকাশ্যে তাইওয়ান নিয়ে কথা বলেননি। তবে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার পথে তিনি তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রিকে চীনের সঙ্গে আলোচনার ‘খুব ভালো দরকষাকষির হাতিয়ার’ বলে মন্তব্য করেন। এতে দ্বীপটিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়।

কিন্তু পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে তাইওয়ান ইস্যুতে কোনো মতপার্থক্যের ইঙ্গিতই দেখা যায়নি। যৌথ ঘোষণায় রাশিয়া আবারও ‘যেকোনো ধরনের তাইওয়ান স্বাধীনতার’ বিরোধিতা করে এবং চীনের সার্বভৌমত্ব ও ‘জাতীয় পুনঃএকত্রীকরণ’ প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন জানায়।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশ জাপানের ‘দ্রুত পুনরায় সামরিকীকরণ’ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে তাইওয়ান ঘিরে চীন-জাপান সম্পর্কের টানাপোড়েনের পটভূমিতে এই মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

/কেএইচও


  বিষয়:   মার্কিন  রুশ প্রেসিডেন্ট  চীন সফর  ট্রাম্প  আনুষ্ঠানিকতা  পুতিন  অংশীদারত্ব 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: