বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামি শিক্ষা বাধ্যতামূলক না হওয়ায় অধিকাংশ মুসলমান দ্বীনি জ্ঞান থেকে বঞ্চিত, ফলে তাদের মধ্যে ধর্মীয় সচেতনতার অভাব দেখা যায়। অনেকেই নিজেদের ও সন্তানদের জন্য ইসলামি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না।
এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অভিভাবকদের দ্বীনি জ্ঞানের ঘাটতি, প্রাথমিক শিক্ষায় ধর্মীয় শিক্ষকের অভাব, ইসলামিয়াত বিষয়টি ঐচ্ছিক করা, সংবিধানে ইসলামি শিক্ষার অনুপস্থিতি এবং রাজনৈতিক নেতাদের দ্বিচারিতা।
রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের আগে ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করলেও ক্ষমতায় গিয়ে তা বাস্তবায়ন করে না। বর্তমানে সরকার কওমি শিক্ষাকে সংস্কারের নামে মূলধারার সঙ্গে একীভূত করার পরিকল্পনা করছে, যেখানে কারিগরি শিক্ষা সংযোজন ও সনদের স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
কিন্তু এভাবে কওমি শিক্ষাকে সনদনির্ভর ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হলে এর স্বকীয়তা ও বিশেষায়িত চরিত্র ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই যেকোনো সংস্কারের আগে কওমি ঘরানার আলেম, মুহাক্কিক ও স্বীকৃত বোর্ডগুলোর মতামত নেওয়া অপরিহার্য।
কওমি শিক্ষার বিরুদ্ধে অপপ্রচার বন্ধ করা জরুরি। বাস্তবে কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক হিফজ প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন করে দেশের সুনাম বাড়াচ্ছে। আলেমরা সমাজে নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক গড়ে তুলছেন। তারা মসজিদ-মাদরাসা প্রতিষ্ঠা, ইমামতি, বিয়ে, দাফন-কাফনসহ সামাজিক দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মৃতদের দাফন সম্পন্ন করেছেন।
কওমি মাদরাসাগুলো মূলত দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক শিক্ষা প্রদান করে, যেখানে খাদ্য, বই ও অন্যান্য সুবিধা বিনামূল্যে দেওয়া হয়।
শিক্ষকরা অল্প সম্মানীতে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন এবং কোনো সরকারি অনুদান ছাড়াই জনসাধারণের দান-জাকাতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতদের জন্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা, উচ্চ বেতন, পেনশনসহ নানা সুবিধা থাকলেও তারা সবসময় জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ আচরণ করেন না।
আলেমদের অবদান কেবল পার্থিব নয়, আখেরাতের কল্যাণের সঙ্গেও জড়িত। তাই কওমি শিক্ষার মর্যাদা রক্ষা ও উন্নয়নের জন্য কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
যেমন সংবিধানে ইসলামি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, শিক্ষার সব স্তরে ধর্মীয় শিক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া, কওমি শিক্ষার জন্য আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা, জাতীয় শিক্ষানীতিতে আলেমদের অন্তর্ভুক্ত করা, কওমি সনদের স্বীকৃতি বজায় রাখা এবং মাদরাসাগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সহায়তা প্রদান করা।
অর্থাৎ দ্বীনের সঠিক চর্চা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ঈমান-আকিদা রক্ষার জন্য মক্তব-মাদরাসা সম্প্রসারণ, দাওয়াতি কার্যক্রম জোরদার এবং জনমত গড়ে তোলা খুবই জরুরি। আর এ জন্য আলেমদের মতামত গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক : সভাপতি, কওমি মাদরাসা শিক্ষক পরিষদ
/এসএকে