জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) আবাসিক হলগুলোতে ‘গণরুম’ ও ‘গেস্টরুম’ শব্দ দুটি ছিল ভয় ও আতঙ্কের প্রতীক। নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় জীবন মানেই ছিল অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে টিকে থাকার সংগ্রাম।
রাত হলেই গণরুমে চলত তথাকথিত ‘শৃঙ্খলা শিক্ষা’, দাঁড়িয়ে থাকা, কান ধরে ওঠবস করা বা অপমানজনক আচরণের মতো অভিযোগও ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে। ফলে প্রথম বর্ষের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন ছিল আনন্দের বদলে ভয় ও চাপের অভিজ্ঞতা।
গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতির অবসান
দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক পরিবেশে বড় পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে হল দখল করে রাখা “মেয়াদোত্তীর্ণ” শিক্ষার্থীদের সিট ছাড়ার ফলে কৃত্রিম আবাসন সংকট অনেকটাই কমেছে।
বর্তমানে অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিজস্ব সিটে থাকতে পারছেন। গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতিও আগের মতো সক্রিয় নেই। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতভর র্যাগিং বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের পরিবেশ এখন অনেকটাই কমে গেছে।
শহীদ সালাম-বরকত হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আগে হলে থাকতে ভয় লাগত। এখন সেই পরিবেশ আর নেই।’ হল প্রশাসনও নিয়মিত সিট বণ্টন ও তদারকি করছে বলে জানিয়েছে শিক্ষার্থীরা।
নারী নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ
গণরুম আতঙ্ক কমলেও নতুন করে নারী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি ক্যাম্পাসে এক নারী শিক্ষার্থীর ওপর ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক তৈরি করে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, রাতে ক্যাম্পাসে চলাফেরার সময় নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। অনেক সময় হয়রানি, কটূক্তি বা অনুসরণের অভিযোগও পাওয়া যায়।
এক নারী শিক্ষার্থী বলেন, ‘রাতে ক্যাম্পাসে এখন স্বস্তি নেই, কখন কী ঘটে যায় বলা যায় না।’
মোরাল পুলিশিং ও গোপন ভিডিও ধারণ
শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করছেন, ক্যাম্পাসে ‘মোরাল পুলিশিং’ বেড়েছে। ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে বসলে কটূক্তি, অনুসরণ বা ভিডিও করার ঘটনা ঘটছে।
পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে গোপনে ছবি ও ভিডিও ধারণের অভিযোগও পাওয়া গেছে। এতে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসাসেবা ও ডাইনিং সংকট
বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্র নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে। আগে সীমিত ওষুধ দেওয়ার কারণে এটিকে ‘নাপা সেন্টার’ বলা হতো।
এখন ওষুধের সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও সমস্যা রয়ে গেছে। বিশেষ করে নারী চিকিৎসকের স্বল্পতা বড় সমস্যা বলে শিক্ষার্থীরা মনে করেন।
এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘রাতে অসুস্থ হলে নারী ডাক্তার পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।’
অন্যদিকে ডাইনিংয়ের খাবারের মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের মতে, কম দামে খাবার মিললেও তা পুষ্টিকর নয়।
শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষক সংকট
অনেক বিভাগে শ্রেণিকক্ষ সংকট রয়েছে। ফলে এক ব্যাচ ক্লাস করলে অন্য ব্যাচকে অপেক্ষা করতে হয় বা দাঁড়িয়ে ক্লাস করতে হয়।
এছাড়া শতাধিক শিক্ষক পদ শূন্য থাকায় একাধিক কোর্স একজন শিক্ষককেই নিতে হচ্ছে, যা শিক্ষার মানে প্রভাব ফেলছে।
প্রশাসনিক জটিলতা
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সনদ উত্তোলন, ফি জমা বা প্রশাসনিক কাজ করতে দীর্ঘ সময় লাগে। একাধিক দপ্তরে ঘুরতে হয়, ফলে ভোগান্তি বাড়ে।
চাঁদাবাজি কমলেও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ
আগে ক্যাম্পাসে চাঁদাবাজি ও দখলদারির অভিযোগ ছিল। বর্তমানে তা অনেকটাই কমেছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
তবে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি আবার সক্রিয় হয়েছে। বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে মতপার্থক্য ও প্রতিযোগিতাও দেখা যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একদিকে পুরোনো আতঙ্ক, গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি অনেকটাই কমেছে। অন্যদিকে নতুন সমস্যা হিসেবে নারী নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও খাবারের সংকট, শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষক ঘাটতি এবং প্রশাসনিক জটিলতা সামনে এসেছে।
/এসএকে