মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করার লক্ষ্যে একটি শান্তি চুক্তির বিষয়ে ‘সমঝোতায়’ পৌঁছেছে। তিন মাস ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে এই ঘোষণা পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, সম্ভাব্য এই চুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেওয়া হবে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ বন্ধ থাকায় ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত শুরুর পর থেকে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। তবে চুক্তির বিস্তারিত বিষয়ে তিনি কিছু জানাননি।
শনিবার (২৩ মে) ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, চুক্তির চূড়ান্ত দিক ও বিস্তারিত নিয়ে বর্তমানে আলোচনা চলছে এবং খুব শিগগিরই তা ঘোষণা করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত এই চুক্তিতে যুদ্ধ বন্ধ, দ্রুত নৌপথ পুনরায় চালু এবং ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের একটি কাঠামো অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এছাড়া ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিয়ে ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারত সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, রোববার আরও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির খবর আসতে পারে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হরমুজ প্রণালী নিয়ে ‘সুখবর’ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের একটি জ্যেষ্ঠ সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ যদি এই সমঝোতা স্মারক অনুমোদন করে, তবে তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেনির কাছে পাঠানো হবে।
তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ট্রাম্পের ‘হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া’ সংক্রান্ত দাবির বিরোধিতা করেছে। সূত্রগুলো আলোচনার অগ্রগতিকে ‘উৎসাহজনক’ বললেও জানিয়েছে, এখনো বেশ কিছু জটিল বিষয় রয়ে গেছে।
তবে ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, চুক্তির একটি বা দুটি ধারা নিয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে। একটি সূত্রের বরাত দিয়ে সংস্থাটি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি বাধা সৃষ্টি করতে থাকে, তাহলে চূড়ান্ত সমঝোতা সম্ভব হবে না।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে
একটি স্থিতিশীল যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে পারলে বাজারে স্বস্তি ফিরতে পারে, তবে এতে তাৎক্ষণিকভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট দূর হবে না। এই সংকটের কারণে জ্বালানি, সার ও খাদ্যের দাম বেড়ে গেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি এডিএনওসির প্রধান গত সপ্তাহে বলেন, যুদ্ধ এখনই শেষ হলেও হরমুজ প্রণালী দিয়ে পূর্ণমাত্রায় তেল পরিবহন ২০২৭ সালের প্রথম বা দ্বিতীয় প্রান্তিকের আগে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে না।
শনিবার রাতে অ্যাক্সিওস জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। খসড়া চুক্তি অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর কোনো টোল আরোপ করা হবে না এবং ইরান স্বাধীনভাবে তেল বিক্রি করতে পারবে।
এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেবে এবং ইরানের তেল খাতের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে বলে এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে অ্যাক্সিওস।
খসড়া চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেবে।
সংঘাত চলাকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতেই যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে।
অন্যদিকে, ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না। দেশটি বলছে, বেসামরিক উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের রয়েছে। তবে তারা যে মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে, তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।
ইরানের বার্তা সংস্থা ফারস জানিয়েছে, খসড়া চুক্তিতে আরও উল্লেখ রয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরান বা তাদের মিত্রদের ওপর হামলা চালাবে না। এর বিনিময়ে ইরানও আগাম হামলা না চালানোর প্রতিশ্রুতি দেবে।
এদিকে, বিশিষ্ট ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ বেনি গ্যান্টজ বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তির অংশ হিসেবে লেবাননে যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়া ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত ভুল হবে। বর্তমানে ইসরায়েল সেখানে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
/ইউএমএইচ