জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে অনেকেই ভালোবাসেন, শ্রদ্ধা করেন। কিন্তু এই বিদ্রোহী কবিকে যারা ভীষণভাবে অন্তরে ধারণ করতে পেরেছেন, যাদের জীবন ও যাপনের সবচেয়ে বড় অংশ হয়ে আছেন নজরুল, তাদেরই একজন রত্না দাস। তিনি বাংলাদেশের জনপ্রিয় নজরুল সংগীতশিল্পী। জাতীয় কবির ১২৭তম জন্মজয়ন্তীতে তার সঙ্গে কথা বলেছেন বন্যা নাসরিন
‘তখন আমি দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। আমার মা খুব ভালো গান গাইতেন, সেই সময় তার কাছেই আমার গান শেখার হাতে খড়ি। আমাদের দুই বোনকে বাবা নাচ শেখাতে নিয়ে যেতেন। নাচ শিখতে গিয়ে নজরুলের কিছু গানে যখন নাচ করতাম, তখন মনে হতো গানগুলো যদি গাইতে পারতাম! সেই ইচ্ছের কথা একদিন বাবাকে জানালামও। আমার শিক্ষক বাবা সোজা জানিয়ে দিলেন, গান ও নাচ দুটো একসঙ্গে হবে না, যেকোনো একটা বেছে নাও। তারপর গানটাকেই গ্রহণ করলাম, নাচটা হারিয়ে গেল জীবন থেকে।’ গান ভালোবাসা ও জীবনে ধারণ করার শুরুর গল্পটা এভাবেই জানালেন রত্না দাস।
রত্না দাসের জন্ম নরসিংদী জেলায়। মা কনা দাস ও বাবা রনজিৎ কুমার দাসের বড় মেয়ে তিনি। তার ছোট বোন সম্পা দাসও নজরুল শিল্পী। এ ছাড়া তার একটি ভাইও রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেওয়া শিল্পী রত্না দাস ছায়ানট থেকে নজরুল ও উচ্চাঙ্গ সংগীতে পাঠ নিয়েছেন। দুটোই শিখেছেন ওনার গুরু মানস কুমার দাস, নিলুফার ইয়াসমিন, খায়রুল আনাম শাকিল, সুমন চৌধুরির কাছ থেকে। ব্যক্তিজীবনে তিনি বহু বছর চাকরি করেছেন নেদারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান প্ল্যান বাংলাদেশে। একপর্যায়ে যখন দেখলেন গান, সংসার, চাকরি সব একসঙ্গে হচ্ছে না, তখন চাকরি ছেড়ে দিয়ে গান বেছে নিলেন।
নজরুল শিল্পী হওয়াটা তো সহজ নয়, কীভাবে এই কঠিনকেই ভালোবাসলেন, এ প্রশ্নের জবাবে রত্না দাস বলেন, ‘এটা আসলেই দুঃসাহসিক কাজ। আমাদের দেশে রবীন্দ্র-নজরুলের গানের জন্য কোনো স্পন্সর পাওয়া যায় না। তাই নজরুলের গানকে পেশা হিসেবে নেওয়াটা একপ্রকার অসাধ্য সাধন করার মতো কাজ। আমি বা আমার মতো আরও যারা রবীন্দ্র-নজরুলকে নিয়ে কাজ করে থাকেন, তারা কেবলমাত্র ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থেকেই করেন।’

রত্না দাসের ভাঙা গলা টের পেয়ে জানতে চাইলাম, নজরুলের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে নিশ্চয়ই খুব চাপ যাচ্ছে আপনার? তিনি দুঃখপ্রকাশ করে বললেন, ‘সারা বছর কারও কোনো মাথাব্যথা থাকে না নজরুলকে নিয়ে, যখনই জন্মজয়ন্তী বা মৃত্যুবার্ষিকী আসে, তখন একসঙ্গে সবাই প্রোগ্রাম ও সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকে। গান গাইতে ও কথা বলতে বলতে গলা ভেঙে যায়। নজরুলের মতো কবিকে আমরা দিবসভিত্তিক করে ফেলেছি, এটা খুবই দুঃখজনক। নজরুলকে তো আমাদের প্রতিনিয়ত চর্চায় রাখার কথা। তিনি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে আছেন। প্রেম, বিদ্রোহ, বিচ্ছেদ, ইসলামি বা শ্যামা সংগীত কোথায় নেই তিনি! টিভি ও পত্রিকাগুলোর উচিত আমাদের এই জাতীয় সম্পদকে নিয়ে আরও বেশি প্রোগ্রাম করা, তাকে নিয়ে কথা বলা, তার দর্শন সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া।’
হতাশা প্রকাশ করার পর কিছু আশা জাগানিয়া কথাও বলেন রত্না। বর্তমান প্রজন্মের যারা নজরুল সংগীত নিয়ে কাজ করছেন, তাদের প্রতি সন্তুষ্টির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নজরুলকে নিয়ে এখন ভালো ভালো কাজ হচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম ভিন্ন ধাঁচে চেষ্টা করছে। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা না জানালেই নয়। নজরুলের গানের বাণী এবং আদি সুর ঠিক রেখে গায়কি পরিবর্ধন, পরিমার্জন করে দারুণভাবে উপস্থাপন করছেন তারা। তবে, নজরুল তার বাণীতে কী বার্তা দিতে চেয়েছেন, তা ভালোভাবে বুঝে, অন্তরে ধারণ করে গানের চর্চাটা করলে আরও ভালো হবে।’
কথাপ্রসঙ্গে আবারও তার কণ্ঠে দুঃখ প্রকাশ পেল। বাংলাদেশে নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত জায়গাগুলো ঠিকমতো সংরক্ষণ করা হচ্ছে না, নজরুলকে নিয়ে এখন অবধি পর্যাপ্ত কাজ হচ্ছে না, তা নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করলেন। বললেন, ‘নজরুলকে এখনও আমরা দুখু মিয়াই বানিয়ে রেখেছি। তার দুঃখে জর্জরিত জীবন আমরা কেউ ঘুচাতে পারলাম না। তাকে পৌঁছে দিতে পারলাম না বিশ্ব দরবারে। একজন নজরুল কর্মী হিসেবে তাকে নিয়ে ভীষণ বেদনা অনুভব করি। জানি না, কীভাবে সেই বেদনা ব্যাখ্যা করব, কতটা বললে আমার বেদনা শেষ হবে। ব্রিটিশ বেনিয়াদের জন্য তিনি জেল খেটেছিলেন, কারার ওই লৌহ কপাট লিখেছিলেন, তিনি মাঝি-মল্লারের জন্য গান গেয়েছেন, তার প্রিয়াকে জ্যোৎস্নার চন্দন দিয়ে সাজাতে চেয়েছেন। ওনার মতো বহুমুখী একজন শিল্পীকে আমরা কি প্রাপ্য সম্মানটা দিতে পেরেছি? আমরা জাতি হিসেবে অক্ষম, তাকে মূল্যায়ন করতে পারছি না। নজরুলকে নিয়ে যে পরিমাণ গবেষণা বা আলাপ আলোচনার দরকার, তা আজও আমাদের দেশে হয় না। নজরুল ইনস্টিটিউট চেষ্টা করছে কবিকে নিয়ে কাজ করার, নজরুল গানের আদি সুর সংরক্ষণ করার, সবার মাঝে তাকে ছড়িয়ে দেওয়ার। কিন্তু এ কাজটা করা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, আমাদের সবারই দায়িত্ব।’
নজরুলকে নিয়ে মানুষের ভেতর নানান মতভেদ আছে, চিন্তাভাবনার সীমাবদ্ধতা আছে, তা নিয়েও ব্যথিত রত্না দাস। বললেন, ‘নজরুলকে কেউ হিন্দুদের কবি বলেন, কেউ মুসলমানের কবি বলেন। আমার কাছে তিনি মানবতার কবি। তিনি লিখেছেন— ‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলিম’। এই চরণেই তার জীবনধর্ম, মানবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাকে কোনো গণ্ডিতে আবদ্ধ করার সুযোগ নেই আসলে।’

নজরুলের গান নিয়ে ভবিষ্যতে কী করার ইচ্ছে রয়েছে জানতে চাইলে রত্না একটু পেছনে ফিরে বলেন, ‘ভবিষ্যৎ বলা একটু কঠিন। আমি বর্তমানটা বলতে পারি। নজরুলের গানের যাত্রাটা আমার শুরু হয়েছিল খুব ছোটবেলায়, যেটা প্রথমেই বলেছি। সেই যাত্রা থেকেই আমি একটু যখন বড় হয়েছি, তখন ছায়ানটে যুক্ত হই। ছায়ানট থেকে উচ্চাঙ্গসংগীত এবং নজরুলসঙ্গীত করে পরবর্তীতে হিমাচলে চলে যাই। ওখানে গিয়ে আমি শ্রীমতী সর্বানী হোমে গুরুর কাছে গান শিখেছি। এই ছিল আমার একটা পরিক্রমা। কিন্তু সব শিক্ষাকেই তো আসলে চর্চা করতে হয়। নজরুলের গান, উচ্চাঙ্গ সংগীত নির্ভর গানকে অত্যন্ত গভীরে রেখে অনুশীলন করতে হয়। নজরুলকে ধারণ করবার একটি ব্যাপার রয়েছে। সেই ধারণাটা আমার কেমন করে যেন ছোটবেলা থেকেই হয়ে গিয়েছিল। আমার জীবনের বহু পাওয়া, না পাওয়া সকল কিছুতে নজরুলই আমার একমাত্র আশ্রয়। তখন থেকেই আমি নজরুলকে নিয়ে কাজ করে যাই। অন্য কোনও দিকে আমি তাকানোর প্রয়োজন মনে করিনি। অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেছে, আপনি মৌলিক গান কেন করছেন না? আমি তাদের উত্তর দিয়েছিলাম, নজরুল এত বহুমুখী একজন শিল্পী যে উনার মধ্যে প্রেম রয়েছে, বিরাহ রয়েছে অভিমান রয়েছে, দ্রোহ রয়েছে। দ্রোহ হচ্ছে ওনার একটিমাত্র অংশ, এ ছাড়া নজরুল হচ্ছে প্রেমের কবি, অভিমানের কবি, দেশাত্মবোধের কবি, ইসলামের কবি এবং ব্যাপকভাবে বিরহের কবি। সকল কিছুর এই কবিকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে, গাইতে গিয়ে, পাঠ করতে, জানতে বা বুঝতে গিয়ে আমার মনে হল, উনাকে বাদ দিয়ে কোনো মৌলিকত্ব আর হতে পারে না। তাই আমি ওনার গানে নিবেদিত থাকার চেষ্টা করেছি এবং শিখেছি। সেই শিক্ষা আমার আমৃত্যু থাকবে। কারণ সংগীতকে ভালোবেসে চর্চা না করলে, সংগীত ধরা দেয় না। সংগীত গুরুমুখী বিদ্যা, সেই চর্চাটি আমার থাকেই সবসময়। আমরা পৃথিবীতে আসি আবার চলে যাই, এটা তো হতে পারে না। সেই দিক থেকে চেষ্টা করছি, আমার ছাত্রদের মধ্যে যেন আমার শিক্ষাটুকু ছড়িয়ে দিতে পারি। আমার একটা অ্যাকাডেমি আছে এবং বহু অ্যাকাডেমির সঙ্গে আমি যুক্ত। বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী রয়েছে আমার। সেই হিসেবে আমি শিক্ষক, গান তো করিই, ইদানীং গবেষণাও শুরু করেছি। এখন পর্যন্ত নিজস্ব উদ্যোগে ৮০ টি নজরুল সংগীতের মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করেছি। এই যে আমি নির্মাণটা করলাম, আমার ভালোবাসার জিনিসটি দিলাম, কেন দিলাম? এটি দিলাম এজন্য, আমি না থাকলেও আমার পরবর্তী প্রজন্ম যেন আমার এই কাজগুলোর মাধ্যমে সঠিক নির্দেশনা পায়, এটাই আমার চাওয়া।’
রত্না দাসের প্রথম গান ছিল ‘ধানে ভরা, গানে ভরা আমারি দেশ ভাই’। প্রথম অ্যালবাম ছিল ‘কী ব্যথা প্রাণে বাজে’। তারপর বেলা অনেক গড়িয়েছে। দেশে, বিদেশে অনেক গান করেছেন তিনি। এ বছর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে নতুন দুটো গানের মিউজিক ভিডিও করেছেন এই গুণী শিল্পী। প্রথম গানটি ‘নূপুরের ছন্দ’ আজ ২৫ মে তার নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল, স্পটিফাই, সিটি বিবিসহ আরও কিছু ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ পাবে। এ ছাড়া ‘আবার ভালোবাসার সাধ জাগে’ দুদিন পরেই মুক্তি পাবে। গান দুটো শোনার ও মতামত জানানোর জন্য সবাইকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন শিল্পী।
বর্তমান প্রজন্মের অনেক ছেলেমেয়ে রবীন্দ্র-নজরুল বিমুখ কিংবা সুস্থ ধারার শিল্প-সাহিত্য চর্চা থেকে দূরে, এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই দোষটা ছেলে মেয়েদের নয়, বরং মা-বাবাদের। আমরা কেন সন্তানদের মাঝে সুস্থ ধারার শিল্প সংস্কৃতি, রবীন্দ্র-নজরুলের চেতনা ছোটবেলা থেকে ছড়িয়ে দিতে কাজ করিনি? এরজন্য যেমন নতুন প্রজন্মকে ভুগতে হবে, তেমনই আমাদেরও দায় নিতে হবে।’
আলাপ প্রায় শেষের দিকে। জানতে চাইলাম, তাহলে নতুন প্রজন্মের ভেতর কীভাবে নজরুলকে ছড়িয়ে দেওয়া যায়? তিনি বললেন, ‘নজরুলকে আজ অবধি আমরা সম্প্রসারিত করতে পারিনি। নজরুল আজও অনাবিষ্কৃত আমাদের কাছে। নজরুলকে যদি আমরা সম্প্রসারণ করতে চাই এবং সাধারণের মধ্যে পৌঁছে দিতে চাই, তাহলে কিন্তু আজকের যে ছেলেটি বা মেয়েটি তার কাছে নজরুলকে উপস্থাপন করতে গেলে আধুনিক করেই করতে হবে। কারণ আমরা মিলিনিয়ামে রয়েছি। আমরা এআইতে রয়েছি। আমার মনে হয় নজরুল যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তিনিও নিশ্চয়ই এই ঘরানার মধ্যেই আসতেন। চাইতেন, আধুনিক করে নির্মাণ হোক আমার শিল্প। সুতরাং সেটি আমি করেছি আজকালকার ছেলেমেয়ের জন্য।’
রত্না দাস আরও বলেন, ‘আমি ফলোয়ারের জন্য গান করি না। আমার গান কেউ না শুনুক, আমার শুনে যদি আমার ভালোলাগে, ওখানেই সার্থকতা। আমি মনে করি মানুষের শিক্ষা, অর্জন, শিল্প সত্তা কখনোই এগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না যে আমি কত বড় বা ছোট হয়ে গেলাম। বড়-ছোট খুবই আপেক্ষিক শব্দ। এটা দিয়ে মানুষ পূর্ণ হয় না, মানুষ পূর্ণ হয় তার সৌন্দর্যে ও নান্দনিকতায়।’
/মহু