ত্রিশালে কবি নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত দুই বাড়ি

ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি

ফিচার

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে আজও আলো ছড়াচ্ছেন। তৎকালীন ভারতের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম হলেও

2026-05-21T18:17:50+00:00
2026-05-21T18:21:42+00:00
 
  শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬,
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
ফিচার
ত্রিশালে কবি নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত দুই বাড়ি
ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ৬:১৭ পিএম  আপডেট: ২১.০৫.২০২৬ ৬:২১ পিএম
ত্রিশালের নামাপাড়া গ্রামের বিচ্যুতিয়া ব্যাপারী বাড়ি। ছবি : সময়ের আলো
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে আজও আলো ছড়াচ্ছেন। তৎকালীন ভারতের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম হলেও বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক চির অমলিন। এখানে কেটেছে কবির জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সময়। সেই সময়ের সাক্ষী হয়ে আছে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার দুটি বাড়ি। বর্তমানে সেখানে চলছে কবির ১২৭ তম জন্মজয়ন্তীর প্রস্তুতি।

শৈশব ও কৈশোরজুড়ে দুঃখ-দারিদ্র্যের সঙ্গে বড় হওয়া এই কবি খুব অল্প বয়সেই হারান মা-বাবাকে। জীবিকার তাগিদে কখনও মুয়াজ্জিনের কাজ, কখনও লেটো দলে গান লেখা, আবার কখনও রুটির দোকানে শ্রমিক হিসেবেও কাজ করতে হয়েছে তাকে। ভারতের আসানসোলের একটি রুটির দোকানে কাজ করার সময় তার অসাধারণ প্রতিভায় মুগ্ধ হন দারোগা রফিজউল্লাহ। ১৯১৪ সালে তিনি কিশোর নজরুলকে নিজের সঙ্গে ময়মনসিংহের ত্রিশালে নিয়ে আসেন। সেই থেকেই ত্রিশালের মাটিতে শুরু হয় কবির জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। 


ত্রিশাল উপজেলার কাজীর শিমলা গ্রামে অবস্থিত দারোগা রফিজউল্লাহর বাড়িই ছিল কবি নজরুলের প্রথম আবাসস্থল। এখানেই তিনি নতুনভাবে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। তাকে ভর্তি করানো হয় দরিরামপুর ইংরেজি হাইস্কুলে, যা বর্তমানে নজরুল একাডেমি নামে পরিচিত। কাজীর শিমলা গ্রাম থেকে দরিরামপুরের দূরত্ব ছিল প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। প্রতিদিন সেই পথ হেঁটে স্কুলে যেতে হতো কিশোর নজরুলকে। বর্ষাকালে কাদাময় রাস্তায় চলাচল হয়ে উঠত দুর্বিষহ। কবির কষ্টের কথা বিবেচনা করে দারোগা রফিজউল্লাহ তাকে ত্রিশালের নামাপাড়া গ্রামে কাজী হামিদুল্লাহর বাড়িতে জায়গীর রাখেন। হামিদুল্লাহ ছিলেন অত্যন্ত গম্ভীর ও ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি। নজরুলের স্বাধীনচেতা স্বভাব এবং সৃজনশীল মনোভাব তাকে বিরক্ত করত। ফলে সেখানে তার অবস্থান কঠিন হয়ে ওঠে এবং একসময় তিনি আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে নজরুল আশ্রয় নেন ত্রিশালের নামাপাড়া গ্রামের বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়িতে। বাড়ির পূর্বপাশে পুকুরের ধারে ছোট্ট একটি ঘরে থাকতেন তিনি। 

দুই বাড়ি মিলিয়ে প্রায় এক বছর অবস্থান করেছিলেন নজরুল। এই স্বল্প সময়েই তিনি ত্রিশালের মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেন। শতাধিক বছর পেরিয়ে গেলেও- ত্রিশালের বাতাসে আজও যেন ভেসে বেড়ায় বিদ্রোহী কবির স্মৃতি। নজরুল ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বাড়ি দুটিকে সংরক্ষণ করে গড়ে তোলা হয়েছে নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র। প্রতিষ্ঠানটির তত্ত্বাবধানেই তা পরিচালিত হচ্ছে। 

কাজীর শিমলা গ্রামে দারোগা রফিজউল্লাহর বাড়িতে সংরক্ষিত সেই ঐতিহাসিক খাট।

কাজীর শিমলা গ্রামে দারোগা রফিজউল্লাহর বাড়িতে সংরক্ষিত সেই ঐতিহাসিক খাট।


কাজীর শিমলার দারোগা বাড়িতে নজরুল স্মৃতিকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, দ্বিতল ভবনের নিচতলায় সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে কাঠের তৈরি একটি খাট, যেখানে থাকতেন কবি। একই তলায় রয়েছে একটি ছোট মিলনায়তন এবং ওপরতলায় গড়ে তোলা হয়েছে পাঠাগার। সেখানে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন বই ও কবির বংশধরদের ছবি। 

স্মৃতিকেন্দ্রের গ্রন্থাগারিক রাসেল হোসেন বলেন, ‘প্রত্যন্ত এলাকায় হওয়ায় দর্শনার্থীর সংখ্যা খুবই কম। কেন্দ্রটিকে আরও আধুনিক করা গেলে মানুষের আগ্রহ বাড়বে।’

অন্যদিকে, নামাপাড়া গ্রামের বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়ির স্মৃতিকেন্দ্রে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। সেখানে তিনতলা ভবনের নিচতলায় রয়েছে মিলনায়তন, দ্বিতীয় তলায় দাপ্তরিক কার্যক্রম এবং তৃতীয় তলায় গড়ে তোলা হয়েছে স্মৃতিকেন্দ্র ও গ্রন্থাগার। কবির একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে একটি পুরোনো গ্রামোফোন। দেয়ালজুড়ে কবির নানা ছবি এবং তার হাতের লেখা কবিতা বাঁধাই করে টাঙানো রয়েছে। মূল ভবনের পাশেই রয়েছে কবির থাকার সেই ঐতিহাসিক ঘর। মূল কাঠামো ঠিক রেখে নতুনভাবে টিনের ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া চারপাশজুড়ে সবুজ গাছপালা ও শানবাঁধানো পুকুরঘাট মায়াময় পরিবেশ তৈরি করেছে।


বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়ির বংশধর মো. আবুল কাশেম বলেন, ‘প্রতিবছর কবির জন্মদিনে এখানে বড় আয়োজন করা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গুণিজনেরা আসেন। দিনটি আমাদের পরিবারের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের।’

কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইফতেখার রনি বলেন, ‘কাজির শিমলায় প্রতিষ্ঠিত স্মৃতিকেন্দ্রে নজরুলের জীবনী ও কর্মজীবনের তথ্যসমৃদ্ধ গ্যালারি, কবির ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও দুর্লভ ছবির প্রদর্শনী, অডিও-ভিডিও কর্নার, যেখানে নজরুলসংগীত ও কবিতা আবৃত্তি শোনা যাবে- এমন আয়োজন থাকা প্রয়োজন ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘দর্শনার্থীদের জন্য বিশ্রামাগার ও বসার সুন্দর ব্যবস্থা, নিরাপদ পানীয়, পরিচ্ছন্ন টয়লেট, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রতিবন্ধীদের চলাচলের সুবিধা এবং ফ্রি ওয়াই-ফাই ও ডিজিটাল তথ্যসেবা চালু করা জরুরি।’

কবি নজরুল বাল্যকালে নামাপাড়ার যে বটগাছে বসে বাঁশি বাজাতেন।

কবি নজরুল বাল্যকালে নামাপাড়ার যে বটগাছে বসে বাঁশি বাজাতেন।


স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার মাস্টার বলেন, ‘সংরক্ষণের অভাবে নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থান ও স্মৃতিচিহ্ন ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কবির স্মৃতিধন্য শুকনি বিলসহ অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান অযত্নে হারিয়ে যাচ্ছে। এমনকি যে বটবৃক্ষের নিচে বসে কবি সাহিত্যচর্চা করতেন, সেটিও এখন অবহেলায় পড়ে আছে।’

স্মৃতিকেন্দ্রের সহকারী পরিচালক মো. ফয়জুল্লাহ রোমেল বলেন, ‘বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়ি থেকেই দুটি স্মৃতিকেন্দ্রের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বর্তমানে দুই কেন্দ্রেই শিশুদের জন্য নজরুল সংগীত প্রশিক্ষণ চালু রয়েছে। বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়িতে ৩২ জন এবং দারোগা বাড়িতে ৩১ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। সপ্তাহে দুই দিন এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ভবিষ্যতে আবৃত্তি ও নৃত্য প্রশিক্ষণ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে ।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবছর কবির জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দুই স্মৃতিকেন্দ্রেই আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।’

নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত এই দুটি বাড়ি শুধু স্থাপনা নয়, এগুলো বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির এক গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষী। কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে প্রায় দুই যুগ পর জাতীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠান হবে। শনিবার (২৩ মে) থেকে তিন দিনব্যাপী চলবে সেই আয়োজন। নজরুল একাডেমী মাঠে বসবে মেলা। সাংস্কৃতিক কর্মীবৃন্দরা এ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

শুক্রবার, শনিবার ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত স্মৃতিকেন্দ্র দুটি দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে।

/মহু






  বিষয়:   কবি  নজরুল  কাজী  ত্রিশাল  ময়মনসিংহ  জন্মজয়ন্তী 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: