ঈদুল আজহার আর মাত্র কয়েক দিন বাকি, কিন্তু ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানী কলকাতার উপকণ্ঠে ধুলাগড় গরুর হাটে এবার দেখা যাচ্ছে এক অস্বাভাবিক ও নীরব পরিবেশ। সাধারণত এই সময়ে যেখানে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়ে বাজার জমজমাট থাকে, সেখানে এবার ক্রেতার উপস্থিতি একেবারেই কম। ফলে বহু গবাদিপশু অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে।
কলকাতা থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই হাটে প্রায় ২০০টিরও বেশি গরু বিক্রির জন্য আনা হয়েছে। খোলা মাঠে বাঁশের খুঁটিতে বাঁধা অবস্থায় পশুগুলো গরম সহ্য করে অপেক্ষা করছে, আর ব্যবসায়ীরা টিনের ছায়ায় হতাশ মুখে সময় কাটাচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক গবাদিপশু বিক্রেতা জানান তিনি ঈদ মৌসুমকে সামনে রেখে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে গরু কিনেছিলেন। কিন্তু এবার ক্রেতা না থাকায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছেন তিনি। তার ভাষায়, গরু কে কিনবে? মানুষ আতঙ্কের মধ্যে আছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শুধু অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নয়, রাজনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও বাজারে প্রভাব ফেলছে। অনেক ক্রেতা প্রকাশ্যে পশু কেনা বা বড় লেনদেনে অংশ নিতে দ্বিধা করছেন বলে জানান তারা।
ধুলাগড় হাটে দীর্ঘদিন ধরেই হিন্দু বিক্রেতা এবং মুসলিম ক্রেতাদের মধ্যে ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে পশু কেনাবেচা হয়ে আসছিল। ঈদের আগে মুসলিম পরিবারগুলো সাধারণত একত্রে গরু বা ছাগল কিনে কোরবানির জন্য প্রস্তুতি নেয়, যা এই বাজারকে প্রতিবছরই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত করত।
তবে এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে চাহিদা হঠাৎ কমে যাওয়ায় তাদের অনেকেই ঋণের চাপ ও লোকসানের আশঙ্কায় আছেন।
এদিকে, পশ্চিমবঙ্গে পশু জবাই সংক্রান্ত ১৯৫০ সালের একটি আইন থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে তা বাস্তবায়নে শিথিলতা ছিল, যার কারণে রাজ্যটি ঐতিহ্যগতভাবে গরুর মাংসভিত্তিক খাবারের একটি বড় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আইন প্রয়োগ ও সামাজিক পরিবেশে পরিবর্তন আসায় এই বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
ফলে এবারের ঈদুল আজহা ঘিরে ধুলাগড়সহ আশপাশের পশু বাজারগুলোতে স্বাভাবিক প্রাণচাঞ্চল্য না থাকায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
কিন্তু ৬ মে যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসে, তখন পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।
নির্বাচনের এক সপ্তাহ পর রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ১৯৫০ সালের আইনটি কঠোরভাবে প্রয়োগের নির্দেশ দেন। ওই আইনে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মকর্তার ‘বৈধ প্রশংসাপত্র’ছাড়া কোনো গবাদিপশুকে জবাইয়ের উপযুক্ত ঘোষণা করা যাবে না। কসাইখানায় জবাই কেবল পৌরসভা-অনুমোদিত কসাইখানা বা স্থানীয় প্রশাসনের নির্ধারিত স্থানে করা যাবে। এছাড়া আইনে আরও বলা আছে, জবাইয়ের জন্য ব্যবহৃত পশুর বয়স ১৪ বছরের বেশি হতে হবে।
অনেক হিন্দু গরুকে পবিত্র প্রাণী হিসেবে মানেন এবং ভারতের বেশিরভাগ রাজ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে, বিজেপি-সমর্থিত স্বঘোষিত গরু রক্ষাকারীরা গরুর মাংস বহন বা খাওয়ার সন্দেহে দেশজুড়ে কয়েক ডজন মুসলিম ও হিন্দু গবাদিপশু ব্যবসায়ী ও খামারিকে গণপিটুনিতে হত্যা করেছে।
‘বার্গারের কোনো ধর্ম নেই’
রাজ্যে বিজেপির নির্বাচনী জয়ের পর পশ্চিমবঙ্গজুড়ে গরুর মাংস ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মাংস বিক্রেতা, রেস্তোরাঁ মালিক এবং রাস্তার খাবার বিক্রেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অনিশ্চয়তার কারণে বিক্রয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
কলকাতার একটি জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ ‘বার্গার শপ’ জানিয়েছে, তারা তাদের পরিচিত গরুর মাংসের বার্গার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। রেস্তোরাঁটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছে, আমাদের বার্গারের কোনো ধর্ম নেই, তবে রাজনীতি অবশ্যই আছে।
রেস্তোরাঁর সহ-স্বত্বাধিকারী আল জাজিরাকে বলেন, ১৪ মে আমরা জানতে পারি আমাদের গরুর মাংস সরবরাহকারী দোকানটি বন্ধ করে দিয়েছে। স্থানীয় থানায় তাকে ডেকে সাময়িকভাবে ব্যবসা বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল। আমরা দ্রুত বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজে পাইনি, তাই বাধ্য হয়ে গরুর মাংসের বার্গার বন্ধ করতে হয়েছে।
তিনি আরও জানান, এই সিদ্ধান্তে তাদের নিয়মিত গ্রাহকেরা হতাশ হয়েছেন এবং এটি তাদের ব্যবসার একটি বড় অংশকে প্রভাবিত করেছে।
এদিকে, অনেক মাংস বিক্রেতা—বিশেষ করে মুসলিম ব্যবসায়ীরা অস্থির পরিবেশের কারণে দোকান বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন বলে দাবি করেছেন। ফলে বাজারে সরবরাহ কমে গেছে এবং গরুর মাংসের দামও অস্বাভাবিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।
কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার এক অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হাসিম (৬৫) বলেন, আমরা ৬০ বছর ধরে বৈধ লাইসেন্স নিয়ে এই ব্যবসা করছি। এত বছর এখানে শান্ত পরিবেশ ছিল। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
তিনি আরও বলেন, সরবরাহকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এবং ছোট খাবারের দোকানগুলোও গরুর মাংস কেনা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে বিক্রি অনেক কমে গেছে এবং দোকানদাররা আগেভাগেই ব্যবসা বন্ধ করছেন।
একই বাজারের আরেক লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী হায়দার আলী জানান, ভয়ের কারণে অনেক রেস্তোরাঁ ও খাবারের দোকান তার কাছ থেকে কাঁচামাল নিচ্ছে না।
ফলে ঈদকে কেন্দ্র করে যেই সময়টিতে সাধারণত গরুর মাংসের চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে, এবার সেই বাজারে এক ধরনের স্থবিরতা ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
‘উচ্চ ক্ষতি’
ধুলাগড় গরুর বাজারে তিনজন হিন্দু বিক্রেতা তাদের আর্থিক ক্ষতির কথা তুলে ধরেন। তারা জানান, সামান্য কিছু গরু বিক্রি করতে পারলেও বেশিরভাগ পশু অবিক্রিত থাকায় বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।
একজন বিক্রেতা বলেন, প্রতিটি অবিক্রিত গরুর জন্য তাদের প্রায় ৫,০০০ টাকা ক্ষতি হচ্ছে। তিনি জানান, বছরের বাকি সময় তারা মূলত নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন, তাই ঈদ মৌসুমের আয়ের ওপরই তাদের জীবিকা অনেকটা নির্ভরশীল।
ধুলাগড় হাটের আরেক ব্যবসায়ী সুন্দর জানান, তিনি ঈদের মৌসুমে গরু কেনার জন্য তার মায়ের গয়না বন্ধক রেখে প্রায় এক কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। কিন্তু এবার বাজারে চাহিদা না থাকায় তিনি মারাত্মক উদ্বেগে রয়েছেন।
তিনি বলেন, একটি পরিবার হিসেবে আমরা উৎসব মৌসুমে প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা আয় করি। কিন্তু এই বছর আমি আমার ২৫টি গরুর মধ্যে একটিও বিক্রি করতে পারিনি। এখন আমি কী করব? আমি সত্যিই ভয় পাচ্ছি। গত বছর তিনি প্রায় ১০০টি গরু বিক্রি করেছিলেন বলেও জানান।
এদিকে, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-এর মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার আল জাজিরাকে বলেন, আগে যে আইনগুলো কার্যকর করা হতো না, এখন সেগুলো কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
ভারতের প্রাণী কল্যাণ বোর্ডের সাবেক সদস্য ও আইন বিশেষজ্ঞ জয়সিমহা নুগেহাল্লি বলেন, গবাদিপশু জবাই সংক্রান্ত আইনগুলো প্রায়ই প্রাণী সুরক্ষার নামে উপস্থাপিত হলেও বাস্তবে এগুলো অনেক বেশি জড়িত পরিচয়, বাণিজ্য এবং গ্রামীণ জীবিকার সঙ্গে।
তিনি আরও বলেন, পশ্চিমবঙ্গসহ কিছু রাজ্যে গরু ও মাংস নিয়ে যে নিয়ম-কানুন বা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, সেটা শুধু সাধারণ আইন বা নিরাপত্তার বিষয় না। এটা এখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ও ক্ষমতার লড়াইয়ের একটা অংশ হয়ে গেছে।
রাস্তায় নামাজ পড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা
ঈদুল আজহার আগে শুধু গরুর মাংসের ব্যবসা বা ভোগের ওপর সরকারি কড়াকড়িই নয়, পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে আরও নানা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
রাজ্যের বিভিন্ন মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার বাসিন্দারা জানান, নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়করা নাকি রাস্তায় দাঁড়িয়ে নামাজ বা দৈনন্দিন প্রার্থনা না করার নির্দেশ দিয়েছেন। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক অঞ্চলে মসজিদে জায়গা সংকুলান না হলে, বিশেষ করে শুক্রবার বা ঈদের নামাজের সময় রাস্তায় নামাজ পড়ার প্রচলন রয়েছে।
কলকাতার ঘনবসতিপূর্ণ মল্লিক বাজার ও পার্ক সার্কাস এলাকায়, যেখানে ঈদের আগে মুসলিমদের আনাগোনা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে, স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান এবার সেখানে ক্রেতার সংখ্যা খুবই কম।
একজন লুঙ্গি ব্যবসায়ী, যিনি নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশ করেননি, বলেন, বাজার একেবারেই ফাঁকা।
এই পরিস্থিতি নিয়ে বিশিষ্ট অধিকারকর্মী ও লেখক হর্ষ মন্দার আল জাজিরাকে বলেন, বিজেপি একটি আদর্শিক প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, আরএসএস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ) দীর্ঘদিন ধরে এমন এক ধারণা পোষণ করে এসেছে, যেখানে মুসলমানদের সমান নাগরিকত্বের ধারণার সঙ্গে তারা কখনোই আপস করেনি।
মন্দারের মতে, বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থান এই আদর্শিক কাঠামোরই ধারাবাহিকতা।
তিনি বলেন, তারা স্পষ্ট করেছে— মুসলমানদের হয় দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে সীমিত অধিকার নিয়ে থাকতে হবে, নয়তো অন্য কোথাও সরে যেতে হবে। এখন যা ঘটছে, তা সেই এজেন্ডারই বাস্তবায়ন।
/ইউএমএইচ