প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ব্যক্তিগত কথোপকথনে তার ঘনিষ্ঠদের কাছে স্বীকার করেছেন যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইসরায়েলের প্রভাব খুবই সীমিত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ঘিরে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা ও সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে তেল আবিবে উদ্বেগ বাড়ছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সূত্রগুলো।
সোমবার (২৫ মে) জেরুজালেমে রয়টার্সকে দুই ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক ঘিরে উদীয়মান নতুন কূটনৈতিক কাঠামো নিয়ে নেতানিয়াহু উদ্বিগ্ন। তাদের মতে, এই মুহূর্তে ইসরায়েলি নেতার কাছে ট্রাম্পকে প্রভাবিত করার মতো কার্যকর কোনো কৌশল নেই।
সূত্রগুলো আরও জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান পরোক্ষ আলোচনা থেকে ইসরায়েল অনেকটাই বাদ পড়েছে। ফলে যুদ্ধ-পরবর্তী বা যুদ্ধ-নিয়ন্ত্রণমূলক সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইসরায়েলের ভূমিকা সীমিত হয়ে গেছে।
ইসরায়েল বলছে, তারা লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে কথিত হুমকির বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যেতে চায়। তবে যদি ইরান দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান পুরোপুরি বন্ধের শর্ত তোলে, তাহলে তা সম্ভাব্য কোনো চুক্তিকে ভেঙে দিতে পারে।
আমি যা চাইব, নেতানিয়াহু তাই করবে : ট্রাম্প
নেতানিয়াহুর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে এমন এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেছেন, ইসরায়েলি নেতা বর্তমানে যে সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলছে তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দুইটি সূত্র তাদের নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যক্তিগত কথোপকথনের বিষয়ে তথ্য দিয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের বিনিময়ে ইরান হরমুজ প্রণালী খুলে দেবে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরোক্ষ আলোচনায় বসছে।
ইরানি সূত্র বলছে, ভবিষ্যতে জাতিসংঘের পারমাণবিক সংস্থার নজরদারিতে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কমিয়ে আনা বা নিয়ন্ত্রণ করার মতো একটি সমাধান খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও মজুদ নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগ তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান না করা সত্ত্বেও, নেতানিয়াহু স্বীকার করেছেন যে ইসরায়েলের এই মুহূর্তে প্রেসিডেন্টকে প্রভাবিত করার কোনো কৌশল নেই।
তবে নেতানিয়াহুর কার্যালয় তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চুক্তি করতে তাড়াহুড়ো করছেন না, তিন মাসের যুদ্ধে আসন্ন সাফল্যের আশাকে খাটো করে দিয়েছেন।
ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে কমপক্ষে তিনবার ফোনে কথা বলেছেন। এই সময়ের মধ্যে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলেছিলেন যে দেশটি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথ বিমান হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছে।
মঙ্গলবার রাতে ট্রাম্পের তিনটি কথোপকথনের পর সাংবাদিকরা তাকে জানতে চান, নেতানিয়াহুকে তিনি কী বলেছেন।
ট্রাম্প বলেন, তিনি খুব ভালো মানুষ, আমি তাকে যা করতে বলি, তিনি তাই করবেন।
শুক্রবার রাতে দু’জনের মধ্যে আবার কথা হয়। শনিবার ট্রাম্প ইরান আলোচনার অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করতে উপসাগরীয় দেশ, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে যৌথ বৈঠক করার পর ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু তৃতীয়বারের মতো কথা বলেন।
ওই ফোনালাপের পর নেতানিয়াহু ইরানের সঙ্গে কোনো উদীয়মান চুক্তির বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। এক বিবৃতিতে তিনি ও ট্রাম্প বলেন, তারা হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার সমঝোতা স্মারক এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে আসন্ন আলোচনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
নেতানিয়াহু বলেছেন, তিনি ও ট্রাম্প একমত হয়েছেন যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করতে হবে এবং ওইসব সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদান ইরানের এলাকা থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে।
পাশাপাশি ট্রাম্প ইসরায়েলের অধিকারকে সমর্থন করেছেন— অর্থাৎ লেবাননসহ যেকোনো দিক থেকে আসা হুমকির বিরুদ্ধে ইসরায়েল নিজের নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি বিস্তৃত যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর ১৬ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ চলমান রয়েছে। ইসরায়েলি সেনারা দক্ষিণ লেবাননের কিছু অংশে অবস্থান করছে এবং হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালাচ্ছে, অন্যদিকে হিজবুল্লাহও ইসরায়েলি সেনা ও উত্তরাঞ্চলীয় শহরগুলোতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
নির্বাচনের আগে চাপের মধ্যে নেতানিয়াহু
এই কূটনৈতিক অগ্রগতি এমন এক সময়ে এসেছে যখন নেতানিয়াহু রাজনৈতিকভাবে চাপের মুখে রয়েছেন এবং নির্বাচনে পরাজয়ের ঝুঁকির কথাও আলোচনা হচ্ছে। যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় বিরোধীরা তাকে কঠোর সমালোচনা করছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েলি অভিযানের শুরুতে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ইসরায়েলের লক্ষ্য ছিল ইরানের ধর্মীয় সরকারকে দুর্বল করা, তাদের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং পুরো অঞ্চলে শক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা সীমিত করা।
তিনি দাবি করেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে লক্ষ্য করে যৌথ হামলার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে তিনি বোঝানোর পরই যুক্তরাষ্ট্র অভিযান শুরু করে। প্রথম হামলাতেই খামেনি নিহত হন বলে উল্লেখ করা হয়।
এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ লক্ষ্য কিছুটা ভিন্ন হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র মূলত হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার দিকে মনোযোগ দেয়, যা যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল।
চলতি মাসে সিবিএস টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, ইরান থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরানো, আঞ্চলিক প্রক্সিদের সমর্থন বন্ধ করা এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন থামানো নিশ্চিত করতে আরও পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, …এখনও কাজ বাকি আছে।
/ইউএমএইচ