কোরবানি ঈদের নাম শুনলেই আমাদের সবার আগে গরুর কথা মনে পড়ে। গরুর মাংস পছন্দ করেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু মাংস খাওয়ার আগে জেনে নেওয়া প্রয়োজন সুস্থ বা মানসম্মত গরু কীভাবে কিনবেন, কীভাবে গরুর যত্ন নেবেন কিংবা গরুর মাংস সঠিকভাবে সংরক্ষণ করার নিয়ম।
গরু কেনার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পশুটি সুস্থ কি না, তা নিশ্চিত হওয়া। সুস্থ গরুর চোখ সাধারণত উজ্জ্বল ও পরিষ্কার থাকে। চোখে অতিরিক্ত পানি, ঘোলা ভাব বা লালচে রং থাকলে সতর্ক হতে হবে। মুখ দিয়ে অতিরিক্ত লালা ঝরা বা দুর্গন্ধ থাকা রোগের লক্ষণ হতে পারে। গরু যদি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারে, দাঁড়িয়ে থাকতে পারে এবং স্বতঃস্ফূর্ত আচরণ করে, তবে সেটি সাধারণত সুস্থ। খুঁড়িয়ে হাঁটা, বারবার বসে পড়া বা অতিরিক্ত দুর্বলতা ভালো লক্ষণ নয়। পাঁজর অতিরিক্ত বের হয়ে থাকলে গরু দুর্বল হতে পারে। শরীরে ক্ষত, ফোলা বা চাকা আছে কি না দেখুন। চামড়া উজ্জ্বল ও মসৃণ হলে ভালো হয়। লেজের নিচে অতিরিক্ত ময়লা বা পাতলা পায়খানার চিহ্ন থাকলে রোগ থাকতে পারে। দ্রুত শ্বাস নেওয়া, কাশি বা নাক দিয়ে ঘন সর্দি পড়া শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। সুস্থ গরুর শ্বাস স্বাভাবিক ও শান্ত থাকে। এ ছাড়া কিছু অসাধু ব্যবসায়ী স্টেরয়েড বা ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহার করে গরু দ্রুত মোটা করে। এসব গরু এড়িয়ে চলাই নিরাপদ।

সুলভ মূল্যে পাওয়ার জন্য অনেকে শেষ সময়ে গরু কেনেন। তবে, ঈদের ৭–১০ দিন আগে কিনলে ভালো হয়। এই সময়ে গরু কিনলে বাজারে তুলনামূলক বেশি বিকল্প পাওয়া যায়, গরুর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা যায়। এমনকি গরুটিও নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সময় পায়। এতে গরুটি অনেকটা স্বতঃস্ফূর্ত থাকে। একেবারে শেষ মুহূর্তে কিনতে গেলে বাজারে ভিড় বেশি থাকে, তাড়াহুড়ায় অসুস্থ গরু কেনার ঝুঁকি বাড়ে, সঙ্গত কারণে দামও কখনও কখনও বেড়ে যায়, এমনকি পরিবহণেও সমস্যা হতে পারে। তবে, আপনার বাসায় যদি পর্যাপ্ত জায়গা, খাবার ও পরিচর্যার ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে আগে গরু কিনবেন না। কেননা, সঠিক যত্ন না পেলে গরু অসুস্থ হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তে কেনাটাই তুলনামূলক নিরাপদ।
গরু কেনার পর সঠিক যত্ন নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দিনের অবহেলাও ক্ষতির কারণ হতে পারে। গরুর জন্য পরিষ্কার ও নিরাপদ স্থান নিশ্চিত করা জরুরি। যেখানে গরু রাখা হবে, সেখানে যেন পর্যাপ্ত আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকে। এ ছাড়া প্রয়োজনে মেঝেতে খড় বা বালু ব্যবহার করুন। কাঁচা ঘাস, খড়, ভুসি, পরিমিত দানাদার খাবার ও পর্যাপ্ত পরিষ্কার পানি খেতে দিন।
পচা বা বাসি খাবার কখনোই দেবেন না, অতিরিক্ত খাবারও খাওয়াবেন না, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বা ইনজেকশন ব্যবহার করবেন না। অনেক শিশু বা কৌতূহলী মানুষ গরুকে বিরক্ত করে। এতে গরু আতঙ্কিত হতে পারে এবং আঘাত পাওয়ারও ঝুঁকি বাড়ে। তাই গরুকে শান্ত পরিবেশে রাখার চেষ্টা করুন। যদি দেখেন গরু খাবার খাচ্ছে না, অতিরিক্ত হাঁপাচ্ছে বা অন্য অন্য কোনো অসুস্থতার লক্ষণ চোখে পড়ে, তাহলে দ্রুত পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

গরু কোরবানির পর নিরাপদভাবে মাংস সংরক্ষণ করা জরুরি। বিশেষ করে গরমের মৌসুমে একটু অসতর্ক হলে দ্রুত মাংস নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কোরবানির পর গরম মাংস সঙ্গে সঙ্গে ফ্রিজে না রাখাই ভালো। কিছু সময় বাতাসে রেখে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আনতে হবে। তবে দীর্ঘ সময়ও বাইরে রাখা যাবে না। একসঙ্গে বড় পরিমাণ মাংস ফ্রিজে রাখলে ভেতর পর্যন্ত দ্রুত ঠান্ডা হয় না। তাই পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী ছোট প্যাকেটে ভাগ করুন এবং পরিষ্কার পলিথিন বা বক্স ব্যবহার করুন। ১–২ দিনের মধ্যে রান্নার পরিকল্পনা থাকলে সাধারণ ফ্রিজে রাখা যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করতে চাইলে অবশ্যই ডিপ ফ্রিজে রাখতে হবে। সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে কয়েক মাস পর্যন্ত মাংস ভালো থাকে। আরেকটা কথা, কাঁচা মাংস কখনোই রান্না করা খাবারের সঙ্গে রাখবেন না। এ ছাড়া স্বাস্থ্যসম্মতভাবে মাংস খেতে চাইলে পরিষ্কার ছুরি ব্যবহার করুন, হাত ভালোভাবে ধুয়ে কাজ করুন, কাটার বোর্ড পরিষ্কার রাখুন, মাছি ও ধুলাবালি থেকে দূরে রাখুন।
কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং মানবিক দায়িত্ববোধেরও শিক্ষা দেয়। সুস্থ পশু নির্বাচন, যথাযথ যত্ন এবং নিরাপদভাবে মাংস সংরক্ষণ করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে।
/ইউএমএইচ