গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর গত অক্টোবর মাসে একটি ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তি হলেও, এবারের পবিত্র ঈদুল আজহায় আনন্দের লেশমাত্র নেই ফিলিস্তিনিদের মনে। অবরুদ্ধ এই জনপদে ঈদ এসেছে এক বুক হাহাকার, চরম দারিদ্র্য আর স্বজন হারানোর তীব্র বেদনা নিয়ে। ইসরায়েলি আগ্রাসনে তছনছ হয়ে যাওয়া গাজায় এবার ঐতিহ্যবাহী কোরবানির চেনা আমেজ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
বিগত বছরগুলোতে ঈদের দিনে গাজা সিটির শাতি শরণার্থী শিবিরের বারুদ পরিবার ভোরের আলো ফুটতেই উৎসবে মেতে উঠত। আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি যাওয়া, কোরবানির মাংস ভাগাভাগি করা এবং সবশেষে একটি বাৎসরিক যৌথ ছবি তোলা ছিল তাদের অবধারিত নিয়ম। কিন্তু এবারের ঈদে সেই স্মৃতিটাই সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবারের সদস্য ওয়ালা বারুদ আল-জাজিরাকে জানান, গত বছর ঈদে যে ২২ জন সদস্য নিয়ে তারা পারিবারিক ছবি তুলেছিলেন, তাদের মধ্যে ১৩ জনই আজ বেঁচে নেই। একের পর এক ইসরায়েলি বিমান হামলায় তাদের বর্ধিত পরিবারের ৮০ জনেরও বেশি সদস্য নিহত হয়েছেন। এবার ঈদের আনন্দ করা তো দূরের কথা, যুদ্ধবিরতির মাঝেই কয়েক দিন আগে নিহত হওয়া ভাই বাহা বারুদের লাশের জন্য শোকের তাঁবুতে বসে কাঁদছেন তারা।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনীর দীর্ঘকালীন এই গণহত্যায় এ পর্যন্ত প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ঘরবাড়ি হারিয়ে রাস্তার পাশে কাপড়ের ছাউনি দেওয়া ছোট তাঁবুতে সপরিবারে বাস করছেন হাজ্জা শামা আল-জোরবাতলির মতো হাজারো বিধবা নারী। আল-জাজিরাকে তিনি অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, ঈদ কখনো এই পলিথিন আর কাপড়ের তাঁবুতে প্রবেশ করে না। বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট বা টেলিভিশনহীন এই তাঁবুতে তিনি এতটাই বিচ্ছিন্ন যে, আজ যে ঈদের দিন, সেটিও তিনি জানতেন না।
গাজায় দাতব্য সংস্থা ‘রুয়া ফাউন্ডেশন’-এর কোরবানি প্রকল্পের সমন্বয়ক কারাম খালেদ জানান, সীমান্ত পারাপারগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ থাকা এবং গবাদিপশুর তীব্র সংকটের কারণে এবার গাজায় জীবন্ত পশু কোরবানি দেওয়া অলীক কল্পনায় পরিণত হয়েছে। যুদ্ধের আগে তাদের সংস্থা যেখানে প্রতি মৌসুমে ৩০০ থেকে ৪০০টি গরু ও দুম্বা কোরবানি করত, এবার তা সম্পূর্ণ বন্ধ। যুদ্ধের আগে যে একটি দুম্বার দাম ছিল মাত্র ৩৫০ ডলার, স্থানীয় বাজারে বর্তমানে সেটির দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার ডলারে (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা)। এছাড়া এক কেজি ভেড়ার মাংসের দাম ঠেকেছে ৩০০ শেকেলে (প্রায় ১০৫ ডলার)। ফলে সাধারণ মানুষ বা কোনো সংস্থার পক্ষে জীবন্ত পশু কিনে কোরবানি দেওয়া আর্থিকভাবে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এই চরম সংকট মোকাবিলায় বিকল্প হিসেবে জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ১০ টন (১০ হাজার কেজি) ‘ফ্রোজেন’ বা হিমায়িত মাংস বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে দাতব্য সংস্থাগুলো, যাতে ঈদের দিনে অবরুদ্ধ মানুষের পাতে অন্তত এক টুকরো মাংস তুলে দেওয়া যায়। গাজার মাংস ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আল-নাজ্জার জানান, গাজার বাজারে থাকা ফ্রোজেন মাংসের ৮০ শতাংশই ইসরায়েল হয়ে আর্জেন্টিনা বা উরুগুয়ে থেকে আসে এবং বাকি ২০ শতাংশ বড় বড় টুকরো আকারে মিসর সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে, যা মূলত ব্রাজিলের।
ঈদের এই মৌসুমে গাজার প্রধান বাণিজ্যিক সড়ক ও রিমাল এলাকার কাপড়ের দোকানগুলোতে পোশাক, খেলনা বা মিষ্টির পসরা সাজানো হলেও ক্রেতার দেখা নেই। তীব্র কর্মসংস্থান সংকট আর নগদ টাকার অভাবে মানুষ নতুন জামাকাপড় কেনার সামর্থ্য হারিয়েছে।
রিমাল এলাকার এক শিশু পোশাক ব্যবসায়ী আমজাদ আকরাম জানান, গাজায় পণ্য আমদানির শিপিং বা পরিবহন খরচ আগের চেয়ে প্রায় আট গুণ বেড়েছে। যুদ্ধের আগে যেখানে এক বক্স পোশাক আনতে ২৫০ শেকেল (৮৮ ডলার) খরচ হতো, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার শেকেলে (৭০৫ ডলার)। ফলে খুচরা বাজারে কাপড়ের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ক্রেতারা দোকানে এসে দাম শুনেই আঁতকে উঠছেন এবং কিছু না কিনেই ফিরে যাচ্ছেন।
/কহু