কোরবানির ঈদের আগে এমন থমথমে অবস্থা কখনো দেখিনি। অন্যান্য বছর এই সময়ে এখানে পা ফেলার বা দাঁড়ানোর জায়গা থাকত না,— এক বুক হাহাকার নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ট্যাংরা অঞ্চলের বাসিন্দা মুহাম্মদ জাভেদ। কলকাতা পৌরসভার অধীনে ‘ট্যাংরা স্লটার হাউজ অ্যান্ড লাইভ স্টক’ বা কসাইখানার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে সেখানে কাজ করা এই প্রবীণ কর্মীর আক্ষেপ করে বলেন, বকরি ঈদের আগে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত এখানে, উপচে পড়া ভিড় হতো। এবার পরিস্থিতি বড় খারাপ। আজ দেখে মনেই হচ্ছে না যে বকরি ঈদ আসছে।
পবিত্র ঈদুল আজহার (যা ভারতে বকরি ঈদ নামেও পরিচিত) আর মাত্র বাকি কয়েকটা দিন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা তথা সমগ্র রাজ্যের পশুর হাটগুলোতে এবার একেবারেই চেনা আমেজ নেই। রাজ্য সরকারের কড়া আইনি নজরদারি, আদালতের সবুজ সংকেত এবং আন্তঃরাজ্য গরু পরিবহনে তৈরি হওয়া নানা ঝামেলার কারণে এবার গরুর জোগান প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। ফলে এক প্রকার বাধ্য হয়েই সিংহভাগ মুসলিম পরিবার এবার গরুর পরিবর্তে খাসি বা দুম্বা কোরবানির দিকে ঝুঁকছেন।
পশ্চিমবঙ্গ সরকার সম্প্রতি ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইন কানুন কড়াভাবে মেনে চলার নির্দেশ জারি করেছে। এই আইনে গরু, মহিষ, ষাঁড় বা বলদ জবাইয়ের ক্ষেত্রে পশুর বয়স ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সরকারি শংসাপত্র (সার্টিফিকেট) থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি, প্রশাসন নির্ধারিত কসাইখানা ছাড়া প্রকাশ্যে বা খোলা জায়গায় পশু জবাইয়ের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যদিও এই আইনে সরাসরি গরু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়নি, কিন্তু এই কড়া নিয়মকানুনের বেড়াজাল ডিঙিয়ে কোরবানি দেওয়ার প্রক্রিয়া ক্রেতা ও বিক্রেতা— উভয়পক্ষের জন্যই অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এই সরকারি বিজ্ঞপ্তির বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে একাধিক মামলা হলেও, শেষ পর্যন্ত আদালত সরকারি নির্দেশনাই বহাল রাখার রায় দেয়।
আইনি জটিলতার চেয়েও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিন রাজ্য থেকে পশুর জোগান বন্ধ হওয়া। ট্যাংরার কসাই জাভেদ জানান, কোরবানির গরুর একটা বড় অংশ আসত উত্তর প্রদেশ বা অন্যান্য প্রতিবেশী রাজ্য থেকে। কিন্তু গত প্রায় দু-মাস ধরে রাস্তায় গরু বোঝাই গাড়ি আটকে নানা হয়রানি ও ঝামেলা করা হচ্ছে। রাস্তায় এত ঝামেলা হচ্ছে যে অনেকে গরু আনা প্রায় বন্ধই করে দিয়েছেন। ট্যাংরার বাসিন্দা মোহাম্মদ ফারুক বলেন, সরকার কোরবানি দিতে মানা করেনি ঠিকই, কিন্তু বাজারে সাপ্লাই কম। তার ওপর কোনো ব্যবসায়ী বা ক্রেতা এই মুহূর্তে আইনি বা সামাজিক রিস্ক (ঝুঁকি) নিতে চাইছেন না। তাই বাজারে গরু মিলছে না।
কলকাতার খিদিরপুর, মোমিনপুর, ইকবালপুরসহ বিভিন্ন মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় যেখানে আগে কোরবানি উপলক্ষে বিশাল অস্থায়ী পশুর হাট বসত, এবার সেখানে গরুর কোনো চিহ্ন নেই। উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা, বর্ধমান, বীরভূম ও মুর্শিদাবাদের মতো জেলাগুলোর পশুর হাটেও এবার একই ছবি ধরা পড়েছে। মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা ও ওমরপুর হাটের এক হিন্দু বিক্রেতা আক্ষেপ করে বলেন, এবারে বাজারের অবস্থা একেবারে ভালো ছিল না। আশা করেছিলাম এই সময় গরু বিক্রি করে আগের দেনা-পাওনা মেটাব, কিন্তু সব আশায় জল।
গরুর জোগান না থাকায় কলকাতার নারকেলডাঙার ‘বকরি মার্কেট’সহ বিভিন্ন অস্থায়ী হাটে ছাগল ও খাসির চাহিদা এখন তুঙ্গে। আর চাহিদার সাথে পাল্লা দিয়ে হু হু করে বেড়েছে দাম। উত্তর প্রদেশ থেকে ছাগল নিয়ে আসা বিক্রেতা নিলু সিং জানান, রাস্তায় কড়াকড়ি হলেও ছাগলের গাড়িতে পুলিশ বা অন্য কেউ ঝামেলা করছে না, একবার তল্লাশি করেই ছেড়ে দিচ্ছে। ফলে বাজারে ছাগলের দাম এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি।
অবশ্য অনেকে বিষয়টিকে কিছুটা ইতিবাচক ও রসিকতার ছলে দেখছেন। শেখ জাহিদ নামে এক ক্রেতা রসিকতা করে বলেন, একদিক থেকে ভালোই হয়েছে, একটা গরু কিনতে গেলে এক লাখ টাকা বা তার বেশি লাগত, খাসির দাম বিশ হাজারেই হয়ে যাচ্ছে। খিদিরপুরের বাসিন্দা আব্দুল সায়েদ জানান, সিপিএম বা তৃণমূলের সময় অন্য নিয়ম ছিল, এখন অন্য নিয়ম। সরকার যা বলবে তাই হবে। আমাদের কোরবানি দেওয়া নিয়ে কথা, সেটা ছাগল দিয়েই হোক না কেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কলকাতার বিখ্যাত নাখোদা মসজিদের ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ শফিক কাসমি আগেই মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি গরু কোরবানি না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, বড় আকারের পশুর জবাইয়ের আগে সার্টিফিকেট জোগাড় করার যে নিয়ম কার্যকর করা হচ্ছে, সেই সার্টিফিকেট দেওয়ার দায়িত্ব তো সরকারের। তাদের উচিত ছিল আগে সমস্ত ব্যবস্থা করে তারপর এই আইন বলবৎ করা। আমি রাজ্যের সব মুসলিমদের বলব, আপনারা এবার গরু জবাই করবেন না, বরং ছাগল কিনুন। কারণ গরু বিক্রি করেন মূলত হিন্দু ভাইয়েরা, ফলে এই মন্দায় তাদেরই লোকসান হচ্ছে। আর ছাগল কিনলে মুসলিম খামারিরা লাভবান হবেন।
নাখোদা মসজিদের আরেক ইমাম মোহাম্মদ নূর আলম জানান, রাজ্যের মুসলমানরা এই সরকারি নিয়ম মেনেই চলছেন। তবে এতে ঈদের উদযাপনে কোনো কালো ছায়া পড়বে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের চিন্তাধারা অত্যন্ত সেকুলার (ধর্মনিরপেক্ষ)। এই একটা নিয়মের কারণে মানুষের ঈদ উদযাপনে বা মানসিকতায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আমার মনে হয় না।
সূত্র : বিবিসি বাংলা
/কহু