যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের লাখ লাখ যুবকের কাছে ভবিষ্যৎ গড়ার একমাত্র স্বপ্ন এখন প্রতিবেশী সৌদি আরব। যুদ্ধ ও চরম দারিদ্র্য এড়াতে বৈধ উপায়ে সৌদিতে কাজের সন্ধান করতে প্রয়োজন অন্তত আড়াই হাজার মার্কিন ডলার, যা সাধারণ ইয়েমেনিদের নাগালের বাইরে। আর এই মরিয়া পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বিপজ্জনক পেশা হিসেবে রূপ নিয়েছে ‘কাত’ (এক ধরনের মাদকজাতীয় উদ্দীপক পাতা) চোরাচালান। ইয়েমেন সীমান্তে এখন একটাই নীতি— হয় যুদ্ধ করো, না হয় জীবন বাজি রেখে মাদক পাচার করো।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট আই’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে ইয়েমেনি যুবকদের এই করুণ ও ভয়াবহ জীবনচিত্র উঠে এসেছে। সৌদিতে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও মাদক পাচার করতে গিয়ে প্রতি নিয়ত সৌদি সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে প্রাণ হারাচ্ছেন শত শত ইয়েমেনি যুবক।
৩৫ বছর বয়সী ইয়েমেনি শেফ আহমেদ ছিলেন দুই সন্তানের জনক। বৈধভাবে সৌদিতে কাজের ভিসা না পেয়ে ২০২৪ সালের শেষের দিকে অবৈধভাবে সৌদির জাজান প্রদেশের একটি রেস্তোরাঁয় কাজ শুরু করেন। কিন্তু সৌদি কর্তৃপক্ষের হাতে ধরা পড়ে দুই দুইবার ইয়েমেনে ডিপোর্ট (বহিষ্কার) হন তিনি।
আহমেদের স্ত্রী ওয়াফা জানান, দেশে ফিরে কোনো কাজ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত আহমেদ সীমান্ত দিয়ে সৌদিতে ‘কাত’ পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেন। প্রথম দফায় চার মাস পাচার করে প্রচুর অর্থ নিয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি। দুই মাস রাজার হালে থাকার পর নিজের একটি বাড়ি কেনার স্বপ্ন নিয়ে দ্বিতীয় দফায় সীমান্তে যান আহমেদ। কিন্তু এবার আর ভাগ্য সহায় হয়নি। মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় ওয়াফা খবর পান, সৌদি সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে আহমেদ নিহত হয়েছেন।
ওয়াফা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, যাওয়ার আগে সন্তানদের দুটো সাইকেল কিনে দেওয়ার কথা বলেছিল। আজ সাইকেলও নেই, বাড়িও নেই। অথচ অনুন্নত দুই সন্তানকে এখনো বাবার মৃত্যুর কথা জানাতে পারিনি। ওরা জানে ওদের বাবা এখনো সৌদিতে কাজ করছে।
২০২৬ সালের জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয়কের তথ্যমতে, ইয়েমেনের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ (প্রায় ২ কোটি ২৩ লাখ) বর্তমানে তীব্র মানবিক সংকটে রয়েছেন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধ, অর্থনৈতিক ধস এবং আন্তর্জাতিক তহবিলের অভাবে যুবসমাজের সামনে আয়ের কোনো বৈধ পথ খোলা নেই।
৪৫ বছর বয়সী খালিদ নামক এক ইয়েমেনি জানান, যুদ্ধে যোগ দিয়ে অস্ত্র ধরা অথবা কাত চোরাচালান— ইয়েমেনে এখন এই দুটি পথেই কেবল বড় অঙ্কের টাকা আয় সম্ভব। খালিদ বেছে নেন চোরাচালান। তার ভাষায় এটি একটি ‘মৃত্যুযাত্রা’। প্রায় ২০ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পিঠে ৪০ কেজি ওজনের কাতের বস্তা নিয়ে হাঁটতে হয়। সফলভাবে সৌদিতে পৌঁছাতে পারলে এক চালানেই মেলে ৫ হাজার সৌদি রিয়াল (প্রায় ১,৩৩৩ ডলার)।
খালিদ সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, একদিন আমরা ১০ জন কাতের ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ দূর থেকে গুলি শুরু হলো। আমরা যে যার মতো ছুটলাম। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৬ জন সুস্থভাবে পৌঁছাতে পেরেছিলাম। বাকি ৪ জন মারা গেছে, নাকি ধরা পড়েছে, আজো জানি না। তবে খালিদ এখন সেই অন্ধকার জগৎ ছেড়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে নিজ দেশে একটি মুদি দোকান দিয়েছেন।
সৌদি আরবে ‘কাত’ একটি সম্পূর্ণ অবৈধ এবং নিষিদ্ধ মাদক। দেশটির মাদকবিরোধী আইন অনুযায়ী, কাত চোরাচালানের অপরাধে সর্বনিম্ন ৫ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার রিয়াল জরিমানার বিধান রয়েছে। অপরাধের গুরুত্ব ও পুনরাবৃত্তির ওপর ভিত্তি করে এই সাজা ২৫ বছর কারাদণ্ড থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। বিদেশিদের ক্ষেত্রে সাজা ভোগের পর স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়। এত কঠোর আইন এবং সীমান্তে দেখামাত্র গুলির নির্দেশ থাকার পরও পেটের দায়ে ইয়েমেনি যুবকেরা এই ঝুঁকি নিচ্ছেন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক সমীর আল-ধোবানি বলেন, ২০১১ সালের পর থেকে ইয়েমেনে নতুন গ্র্যাজুয়েটদের জন্য সরকারি চাকরি প্রায় বন্ধ। ২০১৫ সাল থেকে পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হয়েছে। নিরাপদ ও বৈধ কাজের সুযোগ থাকলে কোনো ইয়েমেনি এভাবে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে সীমান্তে যেত না। এই সংকট বন্ধ করতে হলে ইয়েমেনি সরকারকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও যুবসমাজের জন্য বেসামরিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।
আহমেদের বিধবা স্ত্রী ওয়াফার শেষ কথাটিই যেন বর্তমান ইয়েমেনের প্রকৃত বাস্তবতা ফুটিয়ে তোলে, দিনে একবেলা খেয়ে স্বামীর সাথে বেঁচে থাকা দিনগুলো আজকের এই প্রাচুর্যের চেয়ে কোটি গুণ ভালো ছিল। পরিবারের সবাই একসাথে থাকার চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই হতে পারে না, যা হারালে আর ফিরে পাওয়া যায় না।
/কহু