বিধিনিষেধের দোলাচলে এবার কতটা অন্যরকম ছিল কলকাতায় কোরবানির ঈদ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এবার এক সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতিতে উদযাপিত হলো পবিত্র কোরবানির ঈদ। রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকারের একাধিক

2026-05-29T17:16:38+00:00
2026-05-29T17:29:31+00:00
 
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
বিধিনিষেধের দোলাচলে এবার কতটা অন্যরকম ছিল কলকাতায় কোরবানির ঈদ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬, ৫:১৬ পিএম  আপডেট: ২৯.০৫.২০২৬ ৫:২৯ পিএম
বৃহস্পতিবার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে নামাজ পড়ার দৃশ্য। সংগৃহীত ছবি
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এবার এক সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতিতে উদযাপিত হলো পবিত্র কোরবানির ঈদ। রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকারের একাধিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং কড়া বিধিনিষেধের কারণে এবারের ঈদের চিরচেনা চিত্রে বেশ কিছু বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। 

দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ভেঙে কলকাতার প্রাণকেন্দ্র রেড রোডের পরিবর্তে এবার ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে।  

বৃহস্পতিবার (২৮ মে) ঘড়ির কাঁটায় ঠিক সকাল সাড়ে আটটায় ব্রিগেডে ঈদের প্রধান নামাজ শুরু হয়। তীব্র গরমের মাঝে ছায়ায় বসে জিরিয়ে নেওয়ার সময় কলকাতার প্রবীণ বাসিন্দা মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তার ছোটবেলার স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‘১০ বছর বয়স থেকে বাবার সাথে রেড রোডে নামাজ পড়তে আসতাম। এবার জায়গা বদলে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে আসতে হলো। এখানে জায়গা অনেক বড় ঠিকই, কিন্তু রেড রোডের নামাজটা অভ্যাসের মতো হয়ে গিয়েছিল।’

স্থান পরিবর্তনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া   

পৌরসভা বা প্রশাসনের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে কলকাতা পুলিশ এবার আয়োজক সংগঠন ‘ক্যালকাটা খিলাফত কমিটি’কে বিকল্প জায়গা খোঁজার অনুরোধ জানিয়েছিল। পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর অনুমতি সাপেক্ষে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডকে বেছে নেওয়া হয়। খিলাফত কমিটির সভাপতি ও তৃণমূল কংগ্রেস নেতা জাভেদ আহমেদ খান জানান, পর্যাপ্ত পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবীর উপস্থিতিতে নিয়ম মেনেই সবকিছু ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে। 

তবে কমিটির সদস্য মোহাম্মদ খলিল বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার উপস্থিতি কিছুটা কম। জায়গা পরিবর্তনের কারণে অনেকে হয়তো বিভ্রান্তিতে পড়েছেন, আবার কঠোর আইনের কারণে কোরবানি দিতে পারবেন না ভেবে কেউ কেউ ঈদের আগেই অন্যত্র চলে গেছেন।’

নিরাপত্তা ও নস্টালজিয়া নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাধারণ মুসল্লিরাও। ঝাড়খণ্ড থেকে ২৫ বছর আগে কলকাতায় আসা তালতলার বাসিন্দা মোহাম্মদ সোহেল জানান, রেড রোড থেকে ঈদ জামাত সরানোর খবরে মন খারাপ হওয়ায় তিনি এবার পাড়ার মসজিদেই নামাজ পড়েছেন। 

নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফারুক অবশ্য ইতিবাচক দিক দেখছেন। তার মতে, ব্রিগেডে জায়গার সংকট না থাকায় গাড়ি চলাচল বা তড়িঘড়ি করে জায়গা ধরার কোনো ঝামেলা ছিল না। নাইজেরিয়া থেকে এসে কলকাতায় পদার্থবিদ্যায় পিএইচডি করা উসমান শেখ জানান, গত তিন বছর ধরে এই বিশাল জমায়েতে অংশ নিতে তার খুব ভালো লাগে। 

কঠোর আইন ও পশুর হাটে মন্দা

রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এবার ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইন কঠোরভাবে বলবৎ করা হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী— গরু, মহিষ ও ষাঁড় জবাইয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বয়স ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সরকারি শংসাপত্র (সার্টিফিকেট) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি, প্রকাশ্য স্থানে পশু জবাই নিষিদ্ধ করে কেবল প্রশাসন নির্ধারিত কসাইখানায় কোরবানি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। রাস্তা আটকে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান করার ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, যা নিয়ে ঈদের আগে কলকাতায় বিক্ষোভও হয়েছিল। 

এই কড়াকড়ির সরাসরি প্রভাব পড়েছে পশুর হাটে। ব্যবসায়ী ও ক্রেতা উভয়েই জানান, আইনি জটিলতা ও আতঙ্কের কারণে এবার গরু বেচাকেনায় চরম মন্দা দেখা গেছে। অনেকেই এবার গরু কিনতে সাহস পাননি। 

ধর্মীয় পরিসরে রাজনীতি 

বিগত তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীকে নিয়মিত রেড রোডের ঈদের মঞ্চে দেখা যেত। সেখান থেকে তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তার পাশাপাশি রাজনৈতিক বক্তব্যও দিতেন। তবে এবার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের ঈদ জামাতে কোনো শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা-মন্ত্রীকে বক্তব্য দিতে দেখা যায়নি। 

বর্তমান ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী দু'জনেই এবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানিয়েই দায়িত্ব পালন করেছেন। ঈদ জামাতে এক মুসল্লি বিজেপিপন্থী স্লোগান তোলার চেষ্টা করলেও আয়োজকরা দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে ধর্মীয় পবিত্রতা বজায় রাখার অনুরোধ জানান। দক্ষিণ ২৪ পরগনার খলিল আহমেদ একে ইতিবাচক উল্লেখ করে বলেন, ‘সবাই তো নামাজ আর কোরবানির কথা বলছে, এই প্রথম ঈদের নামাজকে কেউ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেনি— এটি একটি বড় পজিটিভ পরিবর্তন।’

মসজিদের বাইরে কড়া পুলিশি পাহারা

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কলকাতার টিপু সুলতান মসজিদসহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপক পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী (সিআরপিএফ) মোতায়েন ছিল। নরেন্দ্রপুরের বাসিন্দা মহিউদ্দিন লস্কর জানান, সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সিআরপিএফ জওয়ানদের টহল তিনি এর আগে কখনো দেখেননি। মল্লিক বাজারের বাসিন্দা মোহাম্মদ হুসেনের মতে, রাস্তাঘাট ফাঁকা ও যানজটমুক্ত হলেও অনেক বেশি বিধিনিষেধের কারণে ঈদের চিরচেনা আনন্দ এবার কিছুটা ম্লান মনে হয়েছে।

তপসিয়ায় বিষাদের ছায়া

অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে কলকাতার তপসিয়ার টালিখোলা মসজিদ সংলগ্ন এলাকার চিত্র ছিল আরও করুণ। সম্প্রতি ওই এলাকার একটি চামড়ার ব্যাগ কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে দুজন কর্মীর মৃত্যু হয়। এরপর ভবনটি অবৈধ ঘোষণা করে সরকার সেটিসহ সংলগ্ন ইমারত ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দিলে বাসিন্দারা ঘরছাড়া হন। বর্তমানে হাইকোর্টের নির্দেশে ভাঙার কাজ স্থগিত থাকলেও ঘরহারা মানুষেরা ঈদে এক প্রকার গৃহহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। 

স্থানীয় আতর ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জুনেইদ ও একজন রিকশাচালক আফসোস করে বলেন, ‘অন্যান্য বছর এই রাস্তায় ঈদের দিনে উৎসবের আমেজ থাকতো। কিন্তু এবার পরিবেশ শান্ত হলেও যাদের মাথার ছাদ চলে গেছে, তাদের ঈদ কাটছে এক বুক কষ্ট নিয়ে।’ 

সময়ের আলো/জেডি 
  বিষয়:   বিধিনিষেধ  কলকাতা  কোরবানির ঈদ 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: